বিজলি একদৃষ্টে পলাশের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনেছিলেন। তারপর তাকান তপতীর দিকে। মাথা নামিয়ে ছিল মেয়েটা, মাথা—ভরতি ঘন চুলের মধ্যিখানে সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর, হাতে শাঁখা লোহা পলা। মেয়েটা একবার মাথা তুলে তাকায় বিজলির দিকে, ভীত ত্রস্ত চাহনি। বিজলি জিজ্ঞাসা করেন, ‘ভাত খেয়েছিস?’
তপতী চুপ করে থাকে।
‘পদ্ম ভাত চড়া।’ বিজলি চেঁচিয়ে ওঠেন। তারপর পলাশের দিকে তাকান। ‘বল এবার আমাকে কী করতে হবে?’
‘পাড়ার সব বাড়িতেই আপনি যান, সব বাড়িকেই ইলেকট্রিক অফিসে বিল জমা দিতে হয়, টেলিফোন আছে তেরোটা বাড়িতে তাদেরও বিল জমা দিতে হয়। পোস্টাপিসে টাকা তোলা জমা দেওয়া অনেককেই করতে হয়। কর্পোরেশন ট্যাক্সও সবাইকে দিতে হয়। যা সব বললুম সবগুলোতেই লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। তপুকে যদি চারটে করে টাকা দেয় তা হলে আর লাইনে দাঁড়াতে হবে না, লাইন দিয়ে কাজটা ওই করে আসবে। আপনি যদি ওকে নিয়ে বাড়িগুলোয় একটু ঘোরেন। আমিও এটা করতে পারতুম তবে আমাকে তো বিশ্বাস করবে না, আপনাকে কিন্তু করবে।’
সেই দিনই বিকেল থেকে বিজলি জয় দত্ত স্ট্রিটের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবেদন জানিয়েছিলেন পদ্ম আর তপতীকে সঙ্গে নিয়ে। ‘গরিব মেয়ে, স্বামীর রোজগার নেই, খেটেখুটে ক—টা টাকা আয় করতে চায়। ওকে আপনারা একটু দেখুন না। আমি ওকে চিনি, এই অ্যাতোটুকু বয়স থেকে দেখে আসছি। আপনারা নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে ওর হাতে টাকা দিতে পারেন আমি জামিন থাকব।’
দু—দিনেই পাড়ার পঁচাত্তর শতাংশ পরিবার তপতীর খদ্দের হয়ে যায়। পদ্ম একবার বলেছিল, ‘মাসিমা তুমি বললে কী করে মিথ্যে কথাটা, তপুকে অ্যাতোটুকু বয়স থেকে দেখে আসছি, ওকে তো সেদিনই প্রথম দেখলে।’
‘মিথ্যে কথা বলেছি তো কী হয়েছে?’
‘মিথ্যে বললে পাপ হয় না?’
‘হয় তো হোক। শ্রীধর জানেন আমি কেন কীজন্য বলেছি, আমি মানুষ চিনি। তোর মতো রাস্তার চাপাকল থেকে জল এনে বলি না গঙ্গা থেকে নিয়ে এলুম।’ বলেই পদ্মর সামনে থেকে দ্রুত পা চালিয়ে নীচে নেমে এসে অলকাদের বাড়ি চলে যান।
‘পদ্মকে খেপিয়ে দিয়েছি এখন আধঘণ্টা বাড়ি ঢুকতে পারব না।’ বলে সময় কাটাতে বকরাক্ষসের গল্প শোনাতে শুরু করেন বাচ্চচু আর মিঠুকে।
বিজলি একা শুয়ে হাসির এক্সরে করা এবং তার ফলাফল তাকে না জানানোয় মাথা গরম করে যখন নিজের উপর বিরক্ত সেই সময় ‘দিদিমা’ বলে তপতী হাজির হল।
‘এত রাত্রে কী ব্যাপার, হাতে ওটা কী?’
‘নিমপাতা, আপনি নিমের ঝোল খেতে ভালোবাসেন বলেছিলেন। আমাদের সামনের বাড়িতে নিমগাছ আছে। মাঝেমাঝে ডাল ছাঁটে আজ ছাঁটছিল আমি সেখান থেকে দুটো কঞ্চি নিয়ে রেখেছি আপনার জন্য।’
‘ভালো রেখে যা। কাজকম্মো কেমন চলছে, খদ্দের বাড়ল?’
‘বাড়ছে আর কই, সবাই বলে আমাদের বিল দেবার লোক আছে। ওই তো আপনার সামনের বাড়ির শঙ্করবাবু, আজ গেছিলুম, অন্নপূর্ণাদি বলল, টেলিফোনের বিল আর তোমাকে দিতে হবে না। ব্যাঙ্কের সঙ্গে ব্যবস্থা হয়েছে, তারাই টেলিফোন অফিসে টাকা পাঠিয়ে দেবে।’ তপতী হতাশ চোখে তাকাল। ‘এরপর তো অন্যরাও একই পথ ধরবে।’
‘তোর বর করছে কী?’
‘বাঁ হাত দিয়ে যতটা পারে চেষ্টা করছে। একজন বলেছে নকল হাত করালে কাজ করতে সুবিধে হবে। সেও তো কত টাকার ব্যাপার!’
‘কত টাকার খোঁজখবর নিয়েছিস?’
তপতী কিন্তু কিন্তু করে বলল, ‘হাজার পাঁচ—ছয় পড়বে বলেছে।’
‘পাঁচ—ছ—হাজার বলে হাত আটকে থাকবে?’ ধমক দিয়ে বিজলি কড়া চোখে তাকালেন, ‘একটা হাতের গুরুত্ব মানুষের জীবনে কত তা কি তুই বুঝিস? এখনও কত বছর বাঁচবে, তোর বর, সে কি ওই নুলো হয়ে? এরপর ছেলেপুলে হবে, রোজগারপাতি বাড়াতে হবে, দুটো হাত, তা যেমন তেমনই হোক না, থাকলে তো সুবিধেই হবে। আমার তো তিনকাল গিয়ে এককাল ঠেকেছে, এই খোঁড়া হয়ে শুয়ে রয়েছি, জানি না জীবনে আর ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারব কিনা, তবু তো আমার ইচ্ছে করে তোদের মতো হাঁটতে ফিরতে চলতে।’ দ্রুত কথাগুলো বলে বিজলি তাকিয়ে রইলেন। মাথা নীচু করে বসে তপতী, মুখটি শুকিয়ে করুণ।
‘কবজি থেকে চেটো নেই জেনেই বিয়ে করেছিস?’
‘হ্যাঁ।’ ক্ষীণস্বরে তপতী বলল।
‘কেন?’
‘আমার ভালো লেগেছিল ওকে।’ আরও ক্ষীণ গলায় বলল।
‘কেন ভালো লাগল?’
‘জানি না দিদিমা।’ তপতী মাথা নাড়ল, ‘আমি জানার চেষ্টাও করিনি। ও বারণ করেছিল, বলেছিল, তোমাকে কষ্ট করে থাকতে হবে। আমি বলেছিলুম সীতা যদি স্বামীর সঙ্গে বনে গিয়ে কষ্ট করে থাকতে পারে তা হলে আমিও পারব।’
বিজলি চুপ করে রইলেন। তপতী লক্ষ করল দিদিমার চোখ বোজা মুখখানি ফেরানো রয়েছে ঠাকুরের সিংহাসনের দিকে। মুখটি মমতায় মায়ায় কোমল।
‘টাকার ব্যাপারটা খোঁজ নে। হাজার পাঁচেকের মধ্যে হলে আমাকে বলিস। আর শোন সেলাই জানিস?’
‘না।’
‘বরকে বল খোঁজ নিতে কাছাকাছি কোথায় সেলাই শেখবার ইস্কুল আছে, ভরতি হয়ে যা। বাড়িতে বসেই জাঙিয়া, ফ্রক, সায়া, ব্লাউজ তৈরি করতে পারবি। পাঁচ নম্বর বাড়ির দুর্গাচরণ হাওড়ার মঙ্গলাহাটে এইসব বিক্রি করে। ওকে আমি বলব তোকে যেন অর্ডার টর্ডার দেয়। লোকটা ভালো।’
‘দিদিমা আমার তো সেলাই মেসিন নেই। কী করে জাঙিয়া, ফ্রক করব?’
‘আহহ এই হল তোদের দোষ।’ বিরক্তিতে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন বিজলি। ‘ধৈর্য বলে কোনো পদার্থ আজকাল ছোঁড়াছুঁড়িদের নেই। ভালো লেগেছে তো পট করে বিয়ে করে ফেলল। আগে গাছে তো ওঠ তারপর তো এককাঁদি পাবি। সেলাই কাটা কাঁচি ধরা এসব আগে শেখ তারপর তো মেসিন লাগবে। চোদ্দো নম্বর বাড়ির দোতলার ভাড়াটেবউ একটা নতুন মেসিন কিনেছে তাতে এমবয়ডারি করা যায়। কথায় কথায় আমাকে বলেছিল পুরোনোটা বিক্রি করে দেবে দু—হাজার টাকা পেলে। এক্ষুনি গিয়ে দ্যাখ ওটা আছে না বিক্রি হয়ে গেছে। থাকলে বলবি আমি কিনব, মানে তুই কিনবি। চিনিস তো বাড়িটা? রাস্তার আলো যে—বাড়িটার গায়ে লাগানো, দোরগোড়ায় একটা টিউয়েল ছিল।’
