হাসি বলল, ‘যা ভয় ভয় করছিল, মাসিমা আমি ঠিকমতো পড়েছি তো?’
‘বললুম তো সুন্দর পড়েছ, তোমার গলার স্বরটা তো খুব মিষ্টি, গানের মতো লাগছিল। পদ্ম, ভুটুকে এলাচদানা দে, কীরকম চুপ করে ব্যাটা মায়ের পড়া শুনছিল! ক—টা বছর যাক, বই পড়তে শিখুক, তখন ওকে দিয়ে পাঁচালি পড়াব। জানো হাসি তোমার মেসোমশাই তখন দশ বছরের, আমার শাশুড়ি ওকে দিয়ে বেস্পতিবারে পাঁচালি পড়াতেন।’
হাসি একটা বাতাসা মুখের মধ্যে দিয়ে চিবোতে থাকল। পদ্ম নীচু গলায় বলল, ‘আগে কপালে ঠেকিয়ে তবে মুখে দেবে।’
আর একটা বাতাসা রেকাবি থেকে তুলে কপালে ঠেকিয়ে মুখে পুরে হাসি বলল, ‘এবার হয়েছে? কত যে নিয়মকানুন। মাসিমা আপনার এখানে কত দেবদেবী আছেন বলুন তো? এ তো প্রায় একটা মিউজিয়াম। পাথরের মূর্তি পেতলের মূর্তি, ছবি। এত জনকে আপনি সামলান কী করে?’ সিংহাসনের সামনে লাল কাপড় মোড়া লম্বা কাঠের পাটাতনটা সে দেখাল।
পদ্ম বলল, ‘রোজ সকালে এক ঘণ্টা ধরে তো মাসিমা ওদের নিয়েই থাকে। আমাকে তো ছুঁতে দেয় না।’
‘সব না হলেও বেশিরভাগই আমার কেনা।’ বিজলি উৎসাহভরে নড়ে উঠেই সতর্ক হলেন পায়ের কথা ভেবে।
‘পদ্ম পিঠের বালিশটা ঠিক করে দে।’ হাসির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই যে নারায়ণ শিলা দেখছ ওটা দিয়েছেন আমার শাশুড়ি। তিনিও পেয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ির কাছ থেকে। ওই যে কৌটোটা ওটা হল গাছকৌটো, কিনেছিলুম কালীঘাট থেকে। দ্বিতীয় বার পুরী গিয়ে কিনেছিলুম পাথরের জগন্নাথ সুভদ্রা বলরামের ওই মূর্তি। তারকেশ্বরের থেকে কিনেছি পাথরের তারকনাথ।’
বিজলি তিন ইঞ্চি উঁচু একটি শিবলিঙ্গ তর্জনী বাঁকিয়ে দেখালেন। ‘একটু সরে বোসো, এবার দ্যাখো ওই যে পঞ্চমুখী একরত্তি মূর্তিটা উনি হলেন গায়ত্রী দেবী। ওঁর পাশে গণেশবাবাজি। তোমার ছেলের ভীষণ পছন্দ ওঁকে। বালগোপাল দেখেছ? ওই যে ওখানে তারা মায়ের ছবির নীচে হামা দিচ্ছেন। ওই ছবিটা তো নিশ্চয় চেনো, তিরুপতি নাথ।’ বিজলি থামলেন। কল্পনার কোল থেকে নেমে ভুটু দাঁড়িয়ে উঠে খাটটা ধরে বিজলির সাদা প্লাস্টারে চাপড় বসিয়েছে।
‘ধর কল্পনা ধর।’ হাসি ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। ‘লেগেটেগে যাবে, একটু হুঁশ রাখবি তো?’
বিজলি বললেন, ‘হাসি, এটা পাথরের মতো শক্ত, দ্যাখো ওর হাতে ব্যথা লেগেছে কিনা।’
দুরন্ত ছেলেকে এই ঘরে আর রাখতে না চেয়ে হাসি ভুটুকে নিয়ে নীচে চলে গেল। যাবার আগে বলে গেল, ‘কাপড়টা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
‘একদম কিছু জানে না হাসিদি।’ পদ্ম বলল, ‘শুধু লেখাপড়াই করেছে। তবে হ্যাঁ গলাটা খুব মিষ্টি, পড়েছেও বেশ পষ্ট করে।’
‘তা তো বুঝলুম। তোকে যে বললুম রাধাকে গিয়ে বলে আসতে আমার পা ভেঙেছে বলেছিস?’ বিজলি চড়া গলায় বললেন।
‘ওই দ্যাখো! একদম ভুলে গেছি। এখুনি যাচ্ছি।’ পদ্ম জিভ কেটে ছুটে বেরিয়ে গেল।
বিজলি এখন একা এবং একা হলেই নানান কথার বিষয় তাঁর মাথায় ভিড় করে। প্রথমেই মনে হল হাসি কাল এক্সরে করাতে গেছিল, ওকে তো জিজ্ঞাসা করা হল না কী পাওয়া গেল ছবিতে? শ্রীধর, খারাপ কিছু যেন ছবিতে না বেরিয়ে আসে। বিজলি মুখ ফিরিয়ে পিতলের রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজলেন। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে বিড়বিড় করলেন, ‘আচ্ছা মেয়ে তো, বলবে তো আমায় ছবিতে কী পাওয়া গেল। যেচে যেচে আমাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। কেন?’ এই কেনর সন্ধান করতে গিয়ে বিজলি ক্রমশ নিজের উপর বিরক্ত হতে থাকলেন। ‘যত উটকো ঝামেলা নিয়ে মাথা ঘামানো।’
এই সময় ‘দিদিমা আসব?’ দরজার কাছ থেকে ডাক শুনে বিজলি তাকালেন এবং বললেন, ‘আয়, তপতী। আমার ইলেকট্রিক বিল কিন্তু এখনও আসেনি।’
তপতী, আঠারো—উনিশ বয়সি বউ। তার পরনের সস্তা শাড়ি, রুক্ষ গাত্রত্বক এবং আভরণহীনতা বুঝিয়ে দেয় দারিদ্র্যের কিনার ঘেঁষে সে জীবনযাপন করে। লাজুক কোমল স্বভাবের মেয়েটিকে এক দুপুরে পলাশই পরিচয় করাতে বিজলির কাছে এনেছিল।
‘দিদিমা এই হচ্ছে তপতী, আমার বন্ধু দুলাল, তাকে চেনেন তো, না চিনলেও নামটা তো শুনেছেন, এ হচ্ছে দুলালের বউ। দুলাল ওয়াটার পোলো খেলত হেদোয় সেন্ট্রাল ক্লাবে, খুব ভালো প্লেয়ার ছিল, বেঙ্গলে খেলেছে, ইস্টার্ন রেলে চাকরি প্রায় হয়েই গেছিল। কিন্তু—।’
‘কিন্তু কী? আমি শুনেছি বোমা বাঁধতে গিয়ে ডান হাতটা কবজি থেকে উড়ে গেছে।’ বিজলি কঠিন কর্কশ স্বরে পলাশকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন। ‘যারা বোমাটোমা নিয়ে কারবার করবে তারা বিয়ে করে কেন বল তো? দ্যাখ তো এই একরত্তি মেয়েটা বিয়ে করে কী বিপদে পড়ল। স্বামীর হাত নেই। রোজগার করার জন্য একমাত্র তো সম্বল ছিল ওই হাত, এবার খাবে কী? বিয়ে দেবার আগে বাপ—মা কি একটু খোঁজখবরও নেয় না, কেমন ছেলের হাতে মেয়েকে দিচ্ছে।’
‘দিদিমা, বাপমা বিয়ে দেয়নি, তপু নিজেই বিয়ে করেছে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে। দুলাল কিন্তু বাজে ছেলে নয়। বাড়ির বড়ো ছেলে, গরিব, মাধ্যমিক পাশ। বাবা খবরের কাগজ বিক্রি করে। তাই দিয়ে বাড়িভাড়া মিটিয়ে সাতটা লোকের সংসার চালানো যায় না। দুলাল কার জন্য কাদের জন্য বোমা বাঁধত সে প্রশ্ন করবেন না। দিদিমা এই মেয়েটা দাঁড়াতে চায় একে একটু সাহায্য করুন।’
