কাপড়টা নিয়ে হাসি বেরিয়ে যাবার পর পদ্ম বলল, ‘দেখলে মাসিমা বাসি কাপড় গায়ে রেখো না বলায় ওর মুখখানা কেমন হয়ে গেল।’
‘অল্পবয়সি মেয়ে, লেখাপড়া করা, বাইরে যায়, এরা কি চট করে গা—গতর আঢাকা করতে পারে? আমি যা পারি হাসির পক্ষে তা কি করা সম্ভব? মেয়েটা খুব সভ্য। বাড়ির শিক্ষা থেকেই এসব পায়, বুঝলি রে! ধুনুচিতে আর দুটো কাঠকয়লা দে, পিদিমটা এবার জ্বালা। আসনটা গুটিয়ে আছে কেন ঠিক করে পাত। রেকাবিতে শুধু বাতাসা! এলাচদানাও রাখ, ভুটু আছে না! পাঁচালি বইটা বার করে আমায় দে, হাসিকে দেখিয়ে দিতে হবে কোথা থেকে কোথা পর্যন্ত পড়বে।’
বালিশে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে বিজলি ঘরের কোণে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে একে একে নির্দেশ দিয়ে গেলেন। ঠাকুরের ছোটো আলমারি থেকে পাঁচালির বইটা বার করে পদ্ম বিজলির হাতে দিল।
‘মাসিমা বইটা এবার গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে নতুন একটা কেনো, পাতাগুলো ঝুরঝুর করছে। এই দ্যাখো দ্যাখো পাতাটা খসে গ্যালো।’ পদ্মর হাতে পাতলা বইটা থেকে একটা পাতা ঝরে পড়ল মেঝেয়। সে সেটা তুলে বিজলির হাতে দিল।
‘থাক না রে। গোটা আলমারি তো দখল করে নেই, বিসর্জন দেব কেন।’
খসে—পড়া পাতাটা সযত্নে পাঁচালি বইয়ের মধ্যে তিনি ঢুকিয়ে রাখলেন। ‘আট বছর আগে কেনা বইটা বুড়ো হয়ে গেছে, দেখেছিস কেমন পাকা চুলের মতো কাগজের রং, দাঁত পড়ার মতো খসে পড়ছে পাতা, চোখের নজরের মতো আবছা হয়েছে অক্ষর। বুড়ো হলেই কি গঙ্গায় পাঠিয়ে দিতে হয়, এই সময়ই তো যত্ন করতে হয়, সেবা করতে হয়।’ বিজলির স্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে অদৃশ্য হল।
হাসি ঘরে ঢুকল, তার পিছনে ভুটুকে কোলে নিয়ে কল্পনা। হাসি আষ্টেপৃষ্ঠে গরদের থানটা শরীরে জড়িয়েছে। বিজলি মুচকি হাসলেন।
‘অত লজ্জা কীসের? ঘোমটা দিয়ে আঁচলটা গলায় জড়িয়ে নাও। এবার ধরো পাঁচালি বইটা, আমি পাতাটা খুলেই রেখেছি দশ—বারো পাতা। বেশি নয় আধঘণ্টার মধ্যেই পড়া হয়ে যাবে।’
বইটা হাতে নিয়ে হাসি ছেঁড়া মলাটের দিকে তাকিয়ে রইল। শিরোনামে রয়েছে ‘প্রতি বৃহস্পতিবারের শ্রীশ্রী লক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা ও পাঁচালি’। লেখার নীচে লক্ষ্মীদেবীর রঙিন ছবি, সিংহাসনে বসে কোলে ঝাঁপি, মাথায় মুকুট, দুই পা পদ্মফুলের উপর রাখা। তাঁর দুই পাশে নতজানু হয়ে প্রণাম জানাচ্ছে এক সধবা ও এক পুরুষ। বোধহয় স্ত্রী ও স্বামী। হাসি কৌতূহলভরে কিছুক্ষণ ছবিটা দেখে বলল, ‘মাসিমা ব্রতকথার শুরুতে যে বাংলায় চারলাইন সংস্কৃত কথা রয়েছে ও আমি পড়তে পারব না। ভুলভাল উচ্চচারণ করে শেষে অমঙ্গল ডেকে আনব!’
বিজলি ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘না না ওসব না পড়লেও চলবে। আমিও তো উচ্চচারণ করতে পারি না বলে বাদ দিয়ে পড়ি। তুমি ওইখান থেকে পড়বে। এই বলে তিনি সুর করে মুখস্থ বলে গেলেন—’দোল পূর্ণিমানিশি নির্মল আকাশ। মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস।। লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ। করিতেছে নানা কথা সুখে আলাপন।।’ যাও ওই আসনে বসে কোষাকুষি থেকে গঙ্গাজল হাতের চেটোয় নিয়ে মুখে দাও, হাতটা মুছে নাও মাথায় তারপর প্রণাম করে শুরু করো।’
হাসি কম্বলের আসনে বসে হাতজোড় করে লক্ষ্মীর বাঁধানো ছবিকে প্রণাম করে যেভাবে বিজলি সুর করে চার লাইন মুখস্থ বলেছিলেন সেই ভাবে পড়তে শুরু করল। তার পাশে বসে পদ্ম। ধুনুচিতে ধুনোর গন্ধে ম ম করছে সারা ঘর। একগোছা ধূপও জ্বলছে পটের সামনে। ভুটুকে কোলে নিয়ে কল্পনা খাটের ধারে মেঝেয় বসল। দুই দেওয়ালে দুটি নিয়ন আলোয় ঘর উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। বিজলি বুকের উপর দুই কর রেখে আধবোজা চোখে হাসির দিকে তাকিয়ে। পাকা সোনার মতো প্রদীপ শিখার কাঁপা আলো হাসির শ্যামবর্ণ গালে কপালে নাকের ডগায় কানের লতিতে যেন চামর বুলিয়ে চলেছে। বিজলির মনে হল, মন্দ মন্দ মলয় বাতাস যেন হাসির মুখের উপর দিয়ে বহিতেছে।
সারা পাঁচালিটা গত পঁয়তাল্লিশ বছরে অন্তত দু—হাজার বার বিজলি পড়েছেন। এখন তাঁকে আর বই দেখে পড়তে হয় না, মুখস্থ বলে যান। হাসির পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে তিনিও পড়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ হাসি পড়া থামিয়ে বইয়ের উপর ঝুঁকে পড়ল।
‘কী হল?’ ব্যস্ত হয়ে বিজলি জানতে চাইলেন।
‘মাসিমা এ জায়গাটায় পড়া যাচ্ছে না, অক্ষরগুলো মুছে গেছে।’
‘আগের লাইন দুটো বলো।’
হাসি পড়ল,
‘সহিতে না পারি আর সংসার যাতনা।
ত্যজিব জীবন আমি করেছি বাসনা।।’
হাসি শেষ করা মাত্র বিজলি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘নারায়ণী বলে শুনো আমার বচন। আত্মহত্যা মহাপাপ নরকে গমন।। অবন্তী নগরের লক্ষপতি ধনেশ্বর রায়ের বিধবা ছেলে বউদের অত্যাচারে ঘরে তিষ্টোতে না পেরে বনে চলে গেল মরবে বলে। এমন সময় নারায়ণী সেখানে ছদ্মবেশে হাজির হয়ে ওকে কথাগুলো বললেন। নাও পড়ো এবার, যাও সতী গৃহে গিয়ে কর লক্ষ্মীব্রত—।’
হাসি আবার পড়া শুরু করল। পাঁচালির সুর অন্যের মুখে বিজলি বহু বছর পর শুনছেন। শুনতে শুনতে একটা ঘোর তাঁকে আচ্ছন্ন করতে লাগল। শাঁখের আওয়াজ তাঁর ঘোর কাটিয়ে জানিয়ে দিল পাঁচালি পড়া শেষ হয়েছে।
‘এই তো কী সুন্দর পড়লে! এবার প্রসাদ মুখে দাও।’ বিজলি স্মিত মুখে বললেন।
