টাকা হাতে উঠে দাঁড়িয়ে পলাশ ঠোঁট টিপে হেসে বলল, ‘দিদিমা এবার সত্যি কথাটা বলি, লোটাসের মালিককে বলেছি দিদিমা এত টাকা দিতে পারবেন না, তিনশো কমিয়ে দেড় হাজার করুন। তাই করে দিল। বিলটা আপনি ভালো করে তো দেখলেনই না। লেস থ্রি হান্ড্রেড তা হলে চোখে পড়ত।’
‘তাই তো!’ বিজলি অবাক হয়ে বিলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‘এক কথায় তিনশো টাকা কমিয়ে দিল?’
‘দেবে না মানে? কত হাজার টাকা বাঁচিয়ে দিয়েছি। যখন লোটাসের দুটো কর্মচারীকে গাফিলতির জন্য বরখাস্ত করে তখন কর্মচারীরা গেট বন্ধ করে দিয়ে ধর্মঘট শুরু করেছিল, মেরে সরিয়ে দিয়েছিল তো আমাদের ছেলেরাই, মালিক তো সেটা মনে রেখেছে। তবে দিদিমা এবার নাতির একটা আবদার রাখতে হবে।’ জিজ্ঞাসু চোখে বিজলি তাকাতে সে বলল, ‘ছেলেরা অনেকদিন পেট ভরে মাংস খায়নি।’
‘ঠিক আছে ঠিক আছে, ও টাকা আর আমাকে ফেরত দিতে হবে না। অনেকগুলো ছেলে, মাংসের দাম যা হয়েছে, তিনশো টাকায় কি হবে?’
‘হবে না। আরও অন্তত দুশো চাই।’ পলাশ পরিষ্কার দাবি জানাল।
বিজলি আবার পুঁটলি খুলে দুশো টাকা দিতেই পলাশ নাটকীয়ভাবে কপালটা বিজলির পায়ের প্লাস্টারে ঠেকিয়ে ‘লং লিভ দিদিমা।’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বিজলি মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘কাণ্ড দ্যাখো আমাকে জক দিয়ে গ্যালো।’
পদ্ম বলল, ‘কিন্তু বাপু তোমার জন্য করেছেও অনেক। ওরা না থাকলে কী আতান্তরে যে পড়তুম ভগবানই জানেন।’
‘ওদের জন্যই তো নিশ্চিন্তে আছি, মরলে শ্মশানে ঠিক পৌঁছে যাব। তুই আমার শ্রাদ্ধে ওদের ভালো করে খাওয়াস।’
‘আমার টাকা কোথায় যে ওদের খাওয়াব,’ ঠোঁট ফুলিয়ে পদ্ম বলল।
বিজলি অবাক হয়ে বললেন, ‘টাকা কোথায় মানে? আলমারিতে এখনও বারো হাজার রয়েছে, সব তো তোর জিম্মায়।’
‘বারো হাজার টাকায় তোমার ছেরাদ্দ? মাথা খারাপ হয়েছে তোমার। গোটা পাড়ার লোককে না খাওয়ালে তোমার মান থাকবে, তোমাকে মনে রাখবে? লোকে বলবে মাসিমা কেমন ছিল, দায়সারা করে কাজ সেরেছে আর সবাই দুষবে আমাকে। না বাপু আমাকে এর মধ্যে জড়িয়ো না।’
‘তার মানে তুই বলছিস আমার শ্রাদ্ধ হবে না! আমার আত্মার গতি হবে না? আমি প্রেত হয়ে ঘুরে বেড়াব?’ বিজলি উত্তেজিত হয়ে গলা চড়িয়ে বললেন।
সন্ত্রস্ত হয়ে পদ্ম বলল, ‘এই দ্যাখো তোমার ছেরাদ্দ হবে না কখন বললুম! বারো হাজারে ক—টা লোক খাওয়াব বলো? আমাদের বস্তিতে কনকের বিয়েতে শুধু ভাত ডাল মাছ আর রসগোল্লা খাওয়াতেই পাঁচ হাজার টাকা গলে গেল। আর এপাড়ায় তিরিশ—চল্লিশ ঘর লোক, তার মানে দেড়শো—দুশো মুখ। নিয়মভঙ্গে তুমি তো চাইবে শুধু মাছ নয় সঙ্গে মাংসও। তারপর মিষ্টি, এখন হিসেব করো কত খরচ হবে। এরপর আছে প্যান্ডেল, কেত্তন, ফুল, বামুনকেও কত কী দান করতে হবে। না মাসিমা বারো হাজারের মধ্যে আমি নেই। আমাকে মাপ করো তুমি অন্য লোক দ্যাখো।’
বিজলি গম্ভীর হয়ে গেলেন। ‘লোকে বলবে মাসিমা কেপ্পন ছিল’ পদ্মর এই কথাটা তাঁর মনের গভীরে নাড়া দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত লোকে কি তাঁকে এইভাবেই মনে রাখবে? ভাবতেই তাঁর চেতনায় ছড়িয়ে পড়ল ভয়, বিস্মরণে চলে যাবার ভয়।
‘পদ্ম, পোস্টাপিসে আর ব্যাঙ্কে যত টাকা আছে সব আমি তুলে তোর কাছে রাখব। তুই আমার শ্রাদ্ধটা ভালো করে করিস, কোনো কার্পণ্য করবি না কথা দে আমায়।’
হতভম্ব পদ্ম। বিজলির পায়ের প্লাস্টারে হাত রেখে বলল, ‘মাসিমা তুমি বলছ কী? আমি টাকা গুনতে পারি না। অত টাকা হাতে পেলে তো আমার মাথা ঘুরে যাবে। তুমি বরং নীচের দাদাকে ডেকে কথা বল।’
‘পদ্ম একটা কথা দে, গয়ায় গিয়ে আমার পিণ্ডি দিবি। নয়তো আমার মুক্তি ঘটবে না রে, আবার তা হলে আমাকে জন্মাতে হবে!’
‘আবার জন্মালে কী এমন ক্ষতি হবে?’
‘ওরে কী হয়ে জন্মাব তা তো আমি জানি না, কুকুর হয়ে জন্মাতে পারি ছারপোকা হয়ে জন্মাতে পারি রাজার ঘরেও জন্মাতে পারি, আবার দুঃখ কষ্ট লাঞ্ছনা ভোগ করা, তার থেকে একেবারে মুক্তি পেয়ে যাওয়া অনেক ভালো, তুই আমার মুক্তির ব্যবস্থা করবি, কথা দে।’
বিজলির দু—চোখ দিয়ে নামা জলের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে পদ্মর বুকের মধ্যে কেমন যেন হতে থাকল। সে দু—হাত বাড়িয়ে প্রায় ছুটে এসে বিজলিকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল। ‘মাসিমা তুমি অমন করে বোলো না, আমি কথা দিচ্ছি যে—করেই হোক গয়ায় গিয়ে তোমার পিণ্ডি দেব, মুক্তির ব্যবস্থা করব। কুকুর ছারপোকা হয়ে তোমাকে জন্মাতে না হয় সেই পাত্থনা শ্রীধরের কাছে আমি রোজ করব।’
তিন
‘এই গরদের থানটা নাও। নীচে তোমার ঘরে গিয়ে পরে এসো। ভেতরে বাসি—পরা কাপড় কিছু রেখো না। আমি পুজো শুরু করি শাশুড়ির লালপাড় গরদের শাড়ি পরে সেটার তো তখন কুটিকুটি অবস্থা, গা ঢাকব কী! এদিক ছেঁড়া ওদিক পেঁজা। তাই পরেই ক—টা বছর চালালুম, বিধবা হবার পর এই থানটা কিনলুম। যাও পরে এসো।’
বিজলি তাঁর এগারো বছরের পুরোনো বস্ত্রটি এগিয়ে ধরলেন। হাসি সেটা হাতে নিয়ে ইতস্তত করে বলল, ‘বাসি—পরা কাপড় রাখব না মানে!’
পদ্ম হেসে ফেলল। ‘মানে সায়া বেলাউজ আর বেচিয়ার গায়ে রাখবে না, আমরা তো দুটো মেয়েমানুষ। বাড়িতে এখন ব্যাটাছেলে বলতে তো ভুটু। লজ্জা করার কিছু নেই। যাও সব ছেড়ে থানটা পরে এসো।’
