কৃষ্ণকিশোর মিতব্যয়ী ছিলেন কিন্তু কঞ্জুস নন। ব্যবসা থেকে সঞ্চিত টাকা ও অবসর গ্রহণকালে অফিস থেকে প্রাপ্য টাকা ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্ত্রীর নামে গচ্ছিত করেন ডাকঘরের টাকা দ্বিগুণ করা জাতীয় সঞ্চয় সার্টিফিকেটে এবং ব্যাঙ্কে। সেই টাকার পরিমাণ এখন দুই লক্ষাধিক। বিজলিবালাকে কদাচিৎ হাত দিতে হয়েছে ডাকঘরের টাকায়। কেন না হুগলি জেলার ভেনিয়াপুকুরে তাঁর বাবা মহিমারঞ্জন হালদারের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেকের উত্তরাধিকারী হন তিনি বাবার মৃত্যুর পর। বিজলির অসীম সৌভাগ্য স্নেহময় বিবেকবান সৎ সীতেশরঞ্জনকে দাদা পাওয়ায়। প্রতি বছর জমির ফসল বিক্রির, পুকুর ও আমবাগান জমা দেওয়ার টাকার ভাগ তিনি একমাত্র বোনের কাছে নিয়মিত নিজে পৌঁছে দিয়ে যান। সেই টাকার পরিমাণ বছরে পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হয়।
বিজলির একতলা দীর্ঘ দিন খালি পড়ে থাকে তাঁর পছন্দের ভাড়াটিয়া না পাওয়ার জন্য। কয়েকজন দালালকে প্রত্যাখান করেছেন, দু—হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়ার প্রস্তাবও নাকচ করেছেন। তিনি চান ভদ্র শিক্ষিত মার্জিত এবং কম লোকের এমন পরিবারকে যারা ঝগড়া করবে না নোংরা করবে না এবং ভাড়া ফেলে রাখবে না। প্রতিবেশীরা বলল, আজকের দিনে এমন শর্ত পূরণ করার মতো ভাড়াটিয়া পাওয়া কঠিন। অবশেষে ভাড়াটিয়া এনে দিল পলাশ।
‘দিদিমা দিদিমা শুনুন।’ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন বিজলি। পলাশের ডাক শুনে দাঁড়ালেন। সত্যর চায়ের দোকান থেকে ছুটে এল পলাশ।
‘আপনার একতলার জন্য ভাড়াটে পেয়েছেন?’
‘না।’
‘আমার পিসতুতো দাদার বন্ধু, যাদবপুরে ওর সঙ্গে এম এসসি পড়েছে। এখন স্কুলমাস্টার, হাজার চোদ্দো—পনেরো মাইনে, বউও চাকরি করে। একটা শুধু বাচ্চচা মাস ছয়েক বয়স। দু—জনেই ভদ্রলোক, দু—জনেই রোজগেরে, ভাড়া ঠিক সময়ে পেয়ে যাবেন। আপনি যে ভয় পাচ্ছেন ছ্যাঁচড়া হবে কিনা, দাদা বলল অত্যন্ত ঠান্ডা নিরীহ ছেলে। বউও খুব পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন। গড়িয়ায় থাকে এদিকে বাসা পেলে দু—জনেরই সুবিধা হয়। আমি বলেছি আমাদের পাড়ায় দুটো বড়ো বড়ো ঘর আছে একতলায়, ওরা রাজি, দেবেন ভাড়া?’
বিজলি কথাগুলো শুনে বলেন, ‘জাত কী?’
‘বামুন বামুন, এই দ্যাখো আসল কথাটাই বলা হয়নি, চক্রবর্তী, জ্যোতির্ময় চক্রবর্তী।’
ভুটুকে নিয়ে জ্যোতির্ময় আর হাসি এসে দেখা করে বিজলির সঙ্গে। একপলক দেখেই দু—জনকে তাঁর ভালো লেগে যায়। ভুটুকে কোলে নেওয়ার এক মিনিটের মধ্যে সে হিসি করে দেয় বিজলির কাপড়ে। সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হয়ে বিজলি বলে ওঠেন, ‘ব্যাটা ঠিক চিনেছে আমাকে। কোলে উঠেই জানিয়ে দিল তোমাকে জ্বালাতন করব। এ তো আমার গোপাল ঠাকুর গো। সামনের পয়লা তারিখেই তোমরা চলে এসো, কত ভাড়া দেবে বল?’
জ্যোতির্ময় ভয়ে ভয়ে বলেছিল, ‘আটশো টাকা পর্যন্ত দিতে পারি।’
‘ঠিক আছে চলে এসো, তবে বাপু ভাড়া ঠিক পয়লা তারিখে দিতে হবে আর লোক এলে সদর দরজা খুলে দেবে, রোজ সকালে জমাদার এলে উঠোন ধোয়ার জল দেবে, আর স্বামী—স্ত্রীর ঝগড়া যেন আমার কানে না পৌঁছায়। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ, শান্তি ভঙ্গ করলে কিন্তু আমি অন্য মানুষ, ঝেঁটিয়ে তোমাদের তাড়াব এটা মনে রেখো।’
সন্ধ্যা নামার মুখে এল পলাশ। ভুটুকে তখন খাটে বসিয়ে একহাতে জড়িয়ে ধরে বিজলি বোতলে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন।
‘এসো পলাশ, কই টাকাপয়সার কথা তো কিছু বলল না ওরা?’ বিজলি অস্বস্তিভরে বলে ভুটুকে কল্পনার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এবার তুই খাওয়া।’
‘বলেনি আমি বারণ করেছিলুম বলে। বলেছিলুম বিল আগে আমাকে দেবেন। দিদিমা, এরা অনেক কিছু বাড়িয়ে দেয়। যে—ওষুধ কেনা হয়নি তার দাম ধরে দেয়, যে—অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়নি সেটাও বিলে ঢুকিয়ে দেয়, আয়া না রাখলেও বলবে রাখা হয়েছে। এসব তো আপনি ধরতে পারবেন না। তাই বলে রেখেছিলুম আগে আমি বিল চেক করব।’
‘চেক করে দেখলে?’
‘না কোনো কারচুপি করেনি। করবে না অবশ্য জানতুম।’ পলাশ পকেট থেকে বার করল লোটাস নার্সিংহোমের খাম। তার থেকে বার করল চারটে বিল। তার তিনটি সূর্য মেডিক্যাল হলের।
‘দিদিমা সব মিলিয়ে মোট আঠারোশো টাকা। আজকেই দেব বলেছি।’ পলাশ খাটের তলা থেকে টুল টেনে বার করে বসল। ‘যন্ত্রণাটন্ত্রণা হচ্চেচ? হলে যে ক্যাপসুল খেতে বলে দিয়েছে খাবেন। ডাক্তার বলেছে খুব শক্ত ধাতের মহিলা, এই বয়সেও শরীর খুব মজবুত।’
‘তা তো বুঝলুম কিন্তু বিলটাও তো বেশ জম্পেশ।’ বিজলি চোখ পিটপিট করে বিল তুলে ধরে বললেন। ‘জগন্নাথদেবের আশীর্বাদ এটা।’
পদ্ম বলল, ‘আর কখনো রিকশায় চেপো না এটাই বলে দিলেন জগন্নাথ।’
‘পা—টা তো ভাঙলি তুই। হুড়মুড়িয়ে পড়লি আমার পায়ের ওপর অমনি মট করে শব্দ হল। এখন দে আঠারোশো টাকা।’ বিজলি ছদ্মকোপ দেখিয়ে বললেন।
‘আহাহা আমি কি ইচ্ছে করে তোমার পায়ের ওপর পড়েছি নাকি? টাকা তোমার বালিশের নীচে রাখা আছে।’
বিজলি বালিশের তলা হাতড়ে টাকার ছোট পুঁটুলিটা বার করলেন। দাদার দিয়ে যাওয়া নগদ টাকা তিনি ঘরেই রাখেন, কখন কীজন্য হঠাৎ টাকার দরকার পড়ে কে বলতে পারে। পুঁটলির গেরো খুলে গুনে গুনে আঠারোশো টাকা বার করে দিলেন পলাশকে।
