অলকা মুখ তুলে কড়িকাঠ দেখে নিয়ে বলল, ‘আমার কাছে বিভূতিভূষণের বই আছে। আপনাকে দিয়ে যাব, পড়ে দেখুন ভালো লাগবে। জেঠিমা এখন চলি, যখন যা দরকার হবে বলবেন।’
‘আর দরকার।’ বিজলি দীর্ঘশ্বাসের মতো করে বললেন। ‘আমার আবার দরকার কী, বিছানায় এইভাবে যাকে কাটাতে হবে তার কিছুর কি আর দরকার হয়? পদ্মই এখন আমার চোখকান, হাত পা। ওর দয়া নিয়ে এখন আমায় বাঁচতে হবে।’ বলে মিটিমিটি হেসে পদ্মর দিকে বিজলি তাকালেন।
‘কী যে বলেন মাসিমা।’ লজ্জা ও পুলকে জর্জরিত পদ্ম আদুরে স্বরে ধমক দিল।
অলকা চলে যাবার পর পদ্ম বলল, ‘মাসিমা তখন বললেন পুজো করে দেবার জন্য হাসিদি ছাড়া আর বলার মতো কেউ নেই। কেন অলকা বউদিই তো রয়েছে, ওকে বললেই তো পারতেন। বউদি খুব ভালো লোক, আপনি বললে না করবেন না।’
বিজলি মাথা নেড়ে বললেন, ‘নারে পদ্ম ওকে পুজো করতে বলা যায় না, অলকারা ব্রাম্মো।’
পদ্ম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, ‘বামুন তো! তবে?’
‘বামুন বামুন ব্রাহ্মণ নয়রে ব্রাম—হো। ওরা ঠাকুর দেবতা মানে না, পুজোআচ্চচা করে না, ওদের ধর্ম আমাদের মতো নয়। ওদের বিয়েতে হোম যজ্ঞটজ্ঞ হয় না, পিণ্ডি দেয় না শ্রাদ্ধে। এবার বুঝলি কেন ওকে বলিনি।’
‘বউদির কথাবার্তা চলনবলন তো আমাদের মতো!’ পদ্মর বিস্ময়ের ঘোর এখনও কাটেনি। ‘পুজোর সময় তো নতুন শাড়ি পরে ঠাকুর দেখতে বেরোয়, তা হলে?’
‘ঠাকুর দেখতে বেরোয় কিন্তু প্রতিমা নমস্কার করে কি? অলকা সিঁদুর দেয় না শাঁখা পরে না সেটা লক্ষ করেছিস?’
‘শাখা নোয়া তো কত এয়োই পরে না, সিঁদুরও দেয় না।’ পদ্ম ক্ষীণ একটা তর্ক জোড়ার উদ্যোগ নিল। ‘বাসন মাজতে গিয়ে আরতির দু—দুটো শাঁখা ভাঙতে ও আর শাঁখা পরে না, বলে অত শাঁখা কেনার পয়সা কোথায়। সবাই বলল না পরলে স্বামীর অমঙ্গল হবে। কই কিছুই তো হয়নি শ্যামলের, আগেও যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে।’
‘এসব হল হিন্দুদের আচার প্রথা নিয়ম।’ বিজলি গলা নামিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘হাজার হাজার বছর আগে মুনিঋষিরা এসব বিধান দিয়ে গেছেন। ওনারাই ঠিক করে দিয়েছেন সমাজে কারা উঁচু কারা নীচু, সেইভাবেই মানুষ ভাগ করা।’ কথাগুলো বলে বিজলি দেখলেন পদ্মর চোখে আরও বিস্ময়। ‘দেবতার পুজো তাই যাকে তাকে দিয়ে করা যায় না। এসব তুই বুঝবি না। দ্যাখ তো ছাদে ভুটু কান্নাকাটি করছে কিনা। ভিজে ছাদ, কোল থেকে নামালে ঠান্ডা লেগে যাবে। কল্পনা তো ওকে বেশিক্ষণ কোলে রাখতে পারে না।’
পদ্ম ঘর থেকে বেরোচ্ছে বিজলি ডাকলেন, ‘রাধাকে গিয়ে বলে আয় দিদির ঠ্যাং ভেঙেছে এখন তোমার মতোই অবস্থা, যতদিন না জোড়ে বিছানায় পড়ে থাকতে হবে। অনেক দিন ওকে দেখতে যেতে পারব না। বেচারা, একজনও কেউ গিয়ে ওর সঙ্গে দুটো কথা বলে আসে না। কথা বলবেই বা কী, লোকে তো বিরক্ত হয়ে যায়।’ বিজলি রাধার কথা ভেবে বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। ‘আর শোন কাল তো সন্ধে দেখাসনি। আজ একটু ভালো করে গঙ্গাজলের ছড়া দিস। ভুটুর দুধ খাওয়ার টাইম হয়েছে, কল্পনা ওকে খাওয়াতে পারে না, ওকে বল আমার কাছে দুধটা দিয়ে যেতে, আমি খাইয়ে দোব।’
বালিশে পিঠ রেখে পা ছড়িয়ে বিজলি তাঁর স্বভাবমতো নিজেকে ব্যস্ত করে তোলার জন্য কাজের খোঁজ শুরু করলেন। তাঁর জন্য নানারকমের কাজ ছড়িয়ে থাকেও। শুধু সেগুলো সংগ্রহ করা আর পদ্মকে নির্দেশ দেওয়া। একটা কাজ শেষ হতেই মনে পড়ে যায় আর একটার কথা। যেমন পদ্ম ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই মনে পড়ল মোমবাতি আনিয়ে রাখতে হবে। লোডশেডিং আবার শুরু হয়েছে। তারপর মনে পড়ল ঘড়ায় গঙ্গাজল কতটা আছে দেখা দরকার। ইলেকট্রিক বিল আসার তারিখ তো হয়ে গেছে, পদ্মকে রোজ বলতে হয় লেটার বক্সটা দেখতে, বিলের টাকা দেবার তারিখ পেরিয়ে গেলে রিবেট পাওয়া যাবে না এটা ওর মাথায় কিছুতেই ঢোকানো গেল না।
বই পড়ে বা টিভি দেখে অলকা কথিত ‘বোরড ফিল’ করা থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো দরকার বোধ করছেন না বিজলি। নানান ভাবনায় তাঁর মন সারাদিনই ভরে থাকে। এগারো বছর আগে বিধবা হবার পর নিঃসন্তান বিজলি বাড়িতে খুবই একা বোধ করেছিলেন। তখনই তিনি পাড়ায় এবাড়ি ওবাড়ি গিয়ে সুখদুঃখের গল্প করা শুরু করেন। বিজলি কোনো বাড়িতে গিয়ে পরচর্চা করেন না এবং সুরসিকা, কথা বলতে পারেন মজা করে তাই সব বাড়িতেই তিনি স্বাগত। জয় দত্ত স্ট্রিটে সব থেকে পরিচিত মানুষ, সাতচল্লিশের বি নম্বরের বাড়ির বিজলিবালা ভট্টাচার্য। তিনি একাধারে দিদিমা ঠাকুমা মাসিমা জেঠিমা এবং বউদিও। তাঁর আপশোস তাঁকে কাকিমা বলার লোক এখনও খুঁজে পাননি।
বিজলির স্বামী কৃষ্ণকিশোর ছিলেন পিতামাতার একমাত্র সন্তান। বিলাতি সওদাগরি অফিসে একটি বিভাগের বড়োবাবু ছিলেন। হিসেবি ও গোছানে লোক। তাঁর অফিসের নানান ধরনের ব্যবসার একটি ছিল খয়ের উৎপাদনের ও সারা ভারতে বিক্রির। বড়ো সাহেবের প্রিয় পাত্র কৃষ্ণকিশোর স্ত্রীর নামে বিহার ও ওড়িশায় খয়ের বিক্রির এজেন্সি নেন। জৌনপুর থেকে চটের মোড়কে খয়ের আসত, বাড়ির একতলার ঘরে বস্তাগুলি রাখা হত আবার তা চলে যেত পুরী কটক পাটনা গয়া প্রভৃতি স্থানে মহাজনদের কাছে। এই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় সাহেবরা যখন ভারতীয়দের কাছে তাদের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেশে ফিরে গেল। তত দিনে কৃষ্ণকিশোর হাজার পঞ্চাশ টাকা উপার্জন করে ফেলেছেন। রক্তে শর্করাধিক্যের রোগে তিনি মারা যান চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার তিন মাস পরেই।
