‘বউমা অনুর বাবা মাকে অশিক্ষিত বলছ কী, ওরা দু—জনেই গ্র্যাজুয়েট!’
‘জানি জেঠিমা। কেন মেয়েকে লেখাপড়া শেখাচ্ছে সেটাই তো ওরা জানে না। একদিন কথায় কথায় ওর মা বলেছিল মেয়েকে কম্প্যুটার সায়ান্স পড়াবে, কুড়ি—পঁচিশ হাজার টাকার চাকরি বাঁধা। এটাই হল ওদের লেখাপড়া শেখাবার লক্ষ্য, একটা সম্পূর্ণ মানুষ গড়ে তোলার কথা ওরা ভাবে না, ওদের অশিক্ষিত বলব না তো কাকে বলব?’
বিজলি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন তখনই হাসি এল। তার পোশাক দেখেই বোঝা যায় বাইরে কোথাও যাবে।
‘মাসিমা এসেছেন অথচ একতলা থেকে উঠে এসে একবার দেখা পর্যন্ত করতে এলুম না, নিজেকে কী যে অপরাধী লাগছে। আসলে কাল ডাক্তার দেখিয়ে আসার পর থেকে মনটা এত খারাপ হয়ে গেছিল যে বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা ছিল না।’ হাসি ক্ষীণ ভাবে হাসল। ‘বলুন এখন কেমন আছেন?’
হাসির প্রশ্নটা অগ্রাহ্য করে বিজলি শঙ্কিত গলায় বললেন, ‘ডাক্তার খারাপ কিছু বলেছেন নাকি?’
‘না না খারাপ কিছু নয়। বললেন এক্স রে করাতে, এখন সেটাই করাতে যাব।’ হাসির উত্তরটা প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার মতো। বিজলি বুঝলেন কিছু একটা চেপে যাচ্ছে হাসি। তিনি আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে বললেন, ‘কাল বেস্পতিবার আমি তো নড়াচড়া করতে পারব না। তুমি সন্ধেবেলায়লক্ষ্মীপুজোটা করে দিতে পারবে? পুজো মানে পাঁচালিটা পড়া; আমার গরদের কাপড় রয়েছে পরে নেবে, শাঁখটা পদ্মই বাজাবে। আমি সব বলে বলে দেব। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না।’
‘মাসিমা আমি কিন্তু কখনো পাঁচালি পড়িনি, আর কাউকে বলুন না।’ হাসি সংকুচিত হয়ে বলল।
‘এ বাড়িতে আর কে আছে বল যাকে দিয়ে পুজো করাতে পারি? তুমি বামুন, উঁচু জাত, পদ্মকে দিয়ে তো করাতে পারব না আর পাঁচালিও পড়তে পারবে না। দেখি আর কে সময় দিতে পারবে, কাউকে না পেলে পুজো বন্ধ রাখতে হবে।’ বিজলির চোখে হতাশা, কণ্ঠস্বরে বেদনা।
‘আমি কাল সন্ধেবেলায় আসব মাসিমা। এখন যাই।’ হাতঘড়ি দেখে হাসি উঠে দাঁড়াল, ভুটু দু—হাত বাড়াল মায়ের দিকে। ছেলেকে কোলে নিয়ে হাসি বলল, ‘এখন কিছুক্ষণ ঠাম্মার কাছে থাকো, আমি ফিরে এসে নিয়ে যাব। কল্পনা লক্ষ রাখিস কিছুতে হাতটাত যেন না দেয়।’ অলকার দিকে তাকিয়ে মাথা হেলিয়ে হেসে বেরিয়ে গেল হাসি।
ভুটু কান্না জুড়ল মা চলে যেতেই। বিজলি বললেন, ‘কল্পনা ওকে নিয়ে ছাদে যা। একটু ঘোরাঘুরি করে ভুলিয়ে রাখ।’
কল্পনা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর অলকা বলল, ‘জেঠিমা বিছানায় একা একা এ ভাবে থাকতে হলে তো আপনিও বোর ফিল করবেন।’
‘তা একটু করব, ওই পদ্মর সঙ্গে কথা বলে যতটা পারি সময় কাটাব, ভুটু আছে, ওর মা হাসি আছে। ওর বাবা জ্যোতিকে অবশ্য চোখে দেখি না ছুটির দিন ছাড়া। স্কুলে বেরোয় আটটায়, উলটোডাঙা থেকে ট্রেন ধরে হাবড়ায় পৌঁছোয় পৌনে দশটায়, ছুটির পর ওখানেই একটা বাড়িতে গিয়ে পড়ায় হপ্তায় একদিন করে ছ—টা ছেলেমেয়েকে, সায়েন্সের মাস্টার, খুব যত্ন করে পড়ায় তাই টানাটানি ওকে নিয়ে। হাসির কিন্তু প্রচণ্ড আপত্তি। একেই জ্যোতির দুবলা শরীর, খাওয়াদাওয়া একদমই হয় না, সারা দিনে একফোঁটা বিশ্রাম নেই। সেই সকালে বাজার করে এসে নাকে মুখে দুটো গুঁজেই বেরিয়ে গিয়ে রাত ন—টা—সাড়ে ন—টায় বাড়ি ফেরা—এতে কি শরীর থাকে? হাসি একদিন বলছিল, একটা লোক ঘুম থেকে উঠে টানা চোদ্দো ঘণ্টা যদি বসে আর দাঁড়িয়ে কাটায় আধপেটা থাকে তা হলে সে তো যে—কোনো দিন কঠিন অসুখে পড়ে যাবে। হাসি বলে বলে ওর টিউশনি করা বন্ধ করেছিল, ভুটু হবার পর আবার ধরেছে। ছেলের খাওয়া পরা, ছেলেকে ধরার জন্য লোক রাখার খরচ মেটাতে নাকি টাকার দরকার!’
অলকা বলল, ‘হাসিও তো চাকরি করছে, তা হলে?’
‘মাইনে খুব কম, আড়াই হাজার টাকা মাত্র। ওইটুকু ছেলেকে ফেলে রেখে তোমার দরকার কী বাপু চাকরি করার, একথা বলতেই বলল, লেখাপড়া শিখে ঘরে বসে থাকব আর স্বামী মুখের রক্ত তুলে উদয়াস্ত খেটে সংসার চালাবার জন্য টাকা রোজগার করবে তাই কখনো হয়?’
অলকা বলল, ‘আমার পড়াতে যাওয়া নিয়ে শ্বশুর—শাশুড়ি দু—জনেরই আপত্তি ছিল তবে অন্য কারণে। ঘরের বউ চাকরি করবে এটা নাকি লজ্জার ব্যাপার, পরিবারের মাথা হেঁট হয়। উনি কিন্তু বাবামা—র আপত্তি গ্রাহ্য করেননি, আমাকে বলেন করো চাকরি। ক—টা মাস মন কষাকষি চললে তারপর ঠিক হয়ে যায়। জেঠিমা আমি কিন্তু ইচ্ছে করলেই টিউশানি করতে পারতাম, করিনি। ওই সময়টা, আমার মনে হল ক—টা টাকা পাওয়ার বদলে বাচ্চচু আর মিঠুকে দিলে অনেক বেশি লাভ করব।’
‘খুব ভালো করেছ বউমা, বাপমায়ের কাছে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের থেকে বড়ো ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না। হাসির কথা শুনেও মনে হয় হাসি চাকরি করে ঠিকই করেছে, স্বামীর ভালোমন্দও তো বউয়ের দেখা উচিত। এখন ভাবি আমার অল্পবয়সে তোমাদের মতন এমন করে চিন্তা করার কোনো সুযোগই ছিল না। থাকলে সেকেন্ড ক্লাস পর্যন্ত না পড়ে আরও পড়তুম।’
অলকা বলল, ‘আপনি তো সময় কাটাবার জন্য বইটই পড়তে পারেন।’
‘পারিই তো। একসময় খুব পড়তুম। উনি কিনে দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্রের বই। বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী। শরৎবাবুর লেখা কী ভালো যে লাগত। ‘দত্তা’ চার বার—পাঁচ বার পড়েছি। আবার পেলে আবার পড়ব। বছর দশেক আগে ঘরে উই লাগল। একশো বছরের পুরোনো বাড়ি তো, দেওয়ালে ড্যাম্প। সব বই উইয়ে খেয়ে ফেলল,’ বিজলি ফিকে হাসলেন। চোখ তুলে মোটা মোটা কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই দ্যাখো এখনও দাগ রয়েছে উইয়ের বাসার।’
