সেই সময় গৌরীকে ছুটে গাড়ি বারান্দার নীচে আসতে দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল। বোধ হয় বাস থেকে নামল। অনন্তকে দেখতে পায়নি। ওর কপাল, গাল, বাহু, থুতনি বেয়ে জল ঝরছে। আঙুল দিয়ে টেনে কপাল থেকে জল মুছে গৌরী পিছনে তাকাল।
‘আরে!’
অনন্ত হাসল। সামান্য ইতস্তত করে গৌরীর পাশে এল। চোখে পড়ল গলার সবুজ মালাটা। গলা থেকে কোমর পর্যন্ত ফ্রকটা লেপটে রয়েছে। স্তনের ডৌল এমনকী বোঁটাও ব্রেসিয়ারের মধ্য দিয়ে এত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে অনন্তের মনে হল ওর সর্বাঙ্গে যেন কোনো আবরণ নেই।
অনুও বড়ো হয়ে উঠেছে। তেরো বছরের হল। গৌরীর মতো এমন ভাপিয়ে ওঠা শরীর নয় তবু ওর বুক চোখে পড়ে। কয়েকদিন আগে সে ঘরের মধ্যে হঠাৎ ঢুকে পড়েছিল। অনুর পরনে তখন শুধুমাত্র সায়া, একটা হাত সবে ব্লাউজের মধ্যে গলিয়েছে। তাকে দেখেই কুঁকড়ে তাড়াতাড়ি পিছনে ফিরে যায়। ছি ছি কী ভাবল। অপ্রতিভ হয়ে সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে মা—র সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে।
‘এখানকার কাজটা ছেড়ে দেব ভাবছি।’
‘কেন!’
‘দূর, এসব কাজ শিখে কি উন্নতি করা যায়! পঁচিশ—তিরিশ বছর কাজ করছে এক—একজন আর মাইনে কিনা দুশো—আড়াইশো।’
‘তা হলে কী করবি?’ ভয়ে ভয়ে মা বলেছিল। ‘তবু কয়েকটা টাকা তো আসছে।’
‘চল্লিশ আবার টাকা নাকি? গয়নাগুলোর কিছুই তো আর রইল না, এরপর…’
‘পোস্টাপিসের কাগজ না ভাঙালে আর তো কোনো উপায় নেই। দাসেদের বাড়িতে কাজটা নিলে তবু…এখন আর অত মানসম্মান দিয়ে কী লাভ? ভগবান যখন যে—অবস্থা দেবেন সেইভাবেই তখন চলতে হবে।’
‘টাকাটা অনু—অলুর বিয়ের জন্য।’
‘বারবার তুই ওই বলিস। খেতে—পরতে পাচ্ছি না আর বিয়ের জন্য টাকা রেখে দেওয়া। রাখোতো ওসব কথা। যেমন ভাগ্য করে এসেছে তেমনি বিয়ে হবে। কবে তুই আয় করবি, অমর করবে, তার জন্য অপেক্ষা করে কি সংসার চলবে? অনুকে স্কুল ছাড়িয়ে দেব, মিছিমিছি টাকা নষ্ট করা। ও নিজেও আর পড়তে চাইছে না।’
‘সে কী, ছেড়ে দেবে পড়া?’
অনন্ত মর্মাহত হয়েছিল। অনু তখন শাড়ি পরে এসে দাঁড়িয়েছে।
‘আর পড়বি না?’
‘না।’
অনুর স্বরে জেদ ছিল। সংসারকে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু ক—টা টাকাই বা তাতে বাঁচবে? ভালো ঘর—বর পাবার কোনো যোগ্যতাই ওর নেই। সাদামাটা, স্বাস্থ্য নেই, চটক নেই, লেখাপড়াও ক্লাস সিক্স। শুধু অনু নয়, অলুরও বিয়ে দিতে হবে কিন্তু কীভাবে যে পারবে তা সে জানে না। অমর নাকি দুটো টিউশনি করছে। ষাট—সত্তর টাকা নিশ্চয় হয়। কাউকে কিছু বলেনি, কিছু চায়ও না। কলেজের মাইনে, বইপত্র, বা জামাপ্যান্ট কেনার জন্য হাত পাতে না। কিন্তু তাতেও কি কোনো সাশ্রয় হচ্ছে। শুধু আধ—পেটা খেয়ে থাকতেই তো কম করে মাসে দেড়শো—দুশো টাকা দরকার। সার্টিফিকেটগুলো না ভাঙালে উপোস দিয়ে মরতে হবে।
দমকা বাতাস গাড়ি বারান্দার নীচে দাঁড়ানো লোকগুলোকে বৃষ্টির ছাঁট ভিজিয়ে দিল। গৌরী সরে এল তার গা ঘেঁষে।
‘তুমি এখানে কোথা থেকে?’
‘একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলুম, পেলুম না।’
‘মনে হল তুমি বাস থেকে নামলে।’
‘না তো, এতক্ষণ ওধারে মুদি দোকানের সামনে একটা ছোট্ট বারান্দার নীচে দাঁড়িয়েছিলুম। দেখছ কীরকম ভিজে ঢোল হয়ে গেছি!’
‘জ্বর হতে পারে।’
‘আমার অভ্যেস আছে ভেজার।’
অনন্ত আড়চোখে দেখল কয়েকজনের নজর গৌরীর বুকের উপর গেঁথে রয়েছে। সে একটু সরে গৌরীকে আড়াল করল।
‘তোমাকে আর দোকানে দেখি না যে?’
‘ভালো লাগে না তাই যাই না।’
‘তোমার নাকি বিয়ে?’
‘কে বলল?’
‘তোমার ভাই।’
‘অ।’
দু—জনেই চুপ করে রইল। রাস্তার আলোয় বৃষ্টিকণা বরফের মতো ঝলসে উঠছে। অনন্তের গায়ে কাঁটা দিল ঠান্ডা বাতাসে। গৌরী লেপটানো ফ্রক দেহ থেকে ছাড়ানোয় ব্যস্ত। রাস্তার মাঝে গোছ ডুবে যাওয়ার মতো জল জমে গেছে। গাড়ি চলে যাওয়ামাত্র ঢেউ এসে ফুটপাথের উপর ভাসিয়ে দিচ্ছে। ওরা পিছিয়ে বাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল।
‘জোর করে বিয়ের ব্যবস্থা করেছে।’
‘এত তাড়াতাড়ি?’
‘আমিও তো তাই বলেছি। বাবা—ই শুনছে না…বোধ হয় আঁচ পেয়েছে।’
‘কীসের?’
‘রমেনদার সঙ্গে আমার ব্যাপারটা।’
‘কী ব্যাপার?’
‘থাক, আর ন্যাকামোয় দরকার নেই। ব্যাপার কাকে বলে যেন উনি জানেন না!’
অনন্ত কথা বলল না। গৌরীর ভিজে চুল থেকে সে নারকেল তেলের গন্ধ পাচ্ছে। তার কনুইয়ের সঙ্গে দু—বার ছোঁয়া লাগল গৌরীর বাহুর। মা বা বোনেদের ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ের এত কাছে সে দাঁড়ায়নি। অদ্ভুত ধরনের একটা প্রফুল্লতা আর সাহস তার ভিতরে তৈরি হয়ে যাচ্ছে অথচ সে জানে গৌরীর মনে তার জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। নেহাতই রোজ দেখা হতে হতে যতটুকু আলাপ। তাদের বয়সটা কাছাকাছি। গৌরী স্বভাবে খোলামেলা, কথা বলতে ভালোবাসে। বোধহয় লেখাপড়া একদম করেনি।
বৃষ্টি ধরে আসছে। অনেকেই হাত বাড়িয়ে দেখে নিচ্ছে কতটা কমেছে। কয়েকজন গাড়িবারান্দা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। জায়গাটা ফাঁকা হয়ে আসছে দেখে অনন্ত অস্বস্তিবোধ করে বললে, ‘তুমি তো এবার বাড়ি যাবে?’
‘হ্যাঁ যাব, তুমিও তো যাবে।’
‘আমার খুব একটা তাড়া নেই। আমি এ—রাস্তা ও—রাস্তা করে বাড়ি যাই।’
‘বাড়িতে কে কে আছে?’
‘মা আর দুই বোন। একটা ভাই ছিল সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। তোমায় তো বলেইছি আমার বাবা নেই…বাস চাপা পড়ে মারা গেছে।’
