‘জেঠিমা কবে প্লাস্টার কাটবে?’ অলকা বলল পরিবেশটা বদলাবার জন্য।
‘বলেছে তো একমাস নড়াচড়া নয়। পায়ে কোনোরকম চাপ পড়ে এমন কিছু করা নয় তার মানে ডান পায়ে ভর দিয়ে কিছু করা চলবে না।’
‘তার মানে ঠাকুমার হাঁটা চলা বন্ধ। শুয়ে শুয়ে এবার কড়িকাঠ গোনো। আচ্ছা তুমি তো বারান্দায় চেয়ারে বসে রাস্তার লোকজন দেখতে পারো। বেস্ট হয় এবার যদি একটা টিভি কিনে ফ্যালো। এইভাবে পা ছড়িয়ে বসে হাতে রিমোট কন্ট্রোলটা নিয়ে পর পর শুধু হিন্দি বাংলা সিরিয়াল দেখে যাবে।’
‘রক্ষে কর, সিরিয়ালে আমার দরকার নেই, টিভি দেখতে হয় তোরা দ্যাখ। রাধুকে দেখতে গিয়ে একদিন ওর ঘরে বসে টিভি দেখলুম। হিন্দি একটা সিনেমা হচ্ছিল। সে কী বেলেল্লা নাচ একঝাঁক ছেলেমেয়ের। রাধুকে বললুম তুমি এই সব বসে বসে দ্যাখো? বলেই কিন্তু মনে হল, বেচারা আর করবেই বা কী? ও এমনভাবে তাকিয়ে রইল যে আমার বুকে মোচড় দিল।’
রাধু অর্থাৎ রাধাকিঙ্করী সামনের বাড়ির বউ, বিজলির থেকে বছর পনেরোর ছোটো। আট বছর আগে এক পাওয়ার কাট হওয়ার রাত্রে রাধাকিঙ্করী দোতলার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে একতলায়। আশপাশের বাড়ির অনেকের ধারণা বা দৃঢ় বিশ্বাস শঙ্কর চাটুজ্যে বউকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। উদ্দেশ্য আবার বিয়ে করা। রাধাকিঙ্করী মরেনি তবে মরলেই ভালো হত। ওর শিরদাঁড়ার মাঝখানটা ভেঙে যায় এবং স্নায়ুকেন্দ্রে যে আঘাত লাগে তাতে তার নিম্নাঙ্গ সাড় হারায়, জিহ্বারও কথা বলার ক্ষমতা নষ্ট হয় প্রায় পঞ্চাশ ভাগ। তার জড়ানো অস্পষ্ট কথা শুধু বুঝতে পারে বাড়ির দু—তিনজন আর বিজলিবালা।
শঙ্কর চাটুজ্যে পঙ্গু বউয়ের পরিচর্যার জন্য দিনরাতের এক দাসী রেখেছে। মধ্য ত্রিশের বিধবা দুই সন্তানের মা অন্নপূর্ণা বা অন্ন দুর্ভাগ্যক্রমে প্রখর যৌবনা, বুদ্ধিমতী এবং সুশ্রী। অতএব আশপাশের বাড়ি দ্রুত এই সিদ্ধান্তে আসে অন্নপূর্ণা দিনে গৃহিণীর সেবায় নিয়োজিত থাকে রাত্রে গৃহস্বামীর। শঙ্কর চাটুজ্যে সফল ব্যবসায়ী, চার পুরুষ এই পাড়ায় বসবাস করছে। একটি মোটরগাড়ি এবং দুটি ঘরে এয়ারকুলার ও টিভি আছে। ব্যবসার কাজে ভারতের নানান শহরে যেতে হয়। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন নিউ জার্সিতে কর্মরত সফটওয়্যার পারদর্শী বর্ধমানের ছেলের সঙ্গে। বিয়েতে তিনি জয় দত্ত স্ট্রিটের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে নিমন্ত্রণ করেন। মেয়ের বিয়ের পরের বছরই রাধাকিঙ্করী পঙ্গু হয়। গত আট বছর শুধু বিজলিবালাই তাঁর এই পঙ্গু বান্ধবীকে নিয়মিত দেখতে যান, যথাসাধ্য কথা বলার ও শোনার চেষ্টা করেন। রাধাকিঙ্করী হুইলচেয়ারে বসে থাকে, অন্নপূর্ণা টিভি চালিয়ে দেয়। সে বসে দেখে এবং শুধু চোখ মারফত বুঝিয়ে দেয় তার ভালো লাগা মন্দ লাগা।
‘ক—টা দিন তো পা ছড়িয়ে বসে থাকব তারপর আগের মতো যে কে সেই। রাধুর মতো পঙ্গু হলে নয় টিভি কেনার কথা ভাবব। এই দ্যাখো, কল্পনা সেই যে হাসিকে বলতে গেল তো গেলই। পদ্ম ভুটুকে দুটো এলাচদানা দে।’
শ্রীধরের কাঠের সিংহাসনের পাশে একটা দু—হাত উঁচু আলমারি তার মধ্যে শিশি বোতল ঠাকুরের বাসন বিছানা রাখা। পদ্ম হরলিকসের বোতল থেকে এলাচদানা বার করল। বিজলি কোল থেকে ভুটুকে মেঝেয় নামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যা, মাসির কাছে যা।’
ভুটু টলতে টলতে দু—পা এগিয়েই সামনে ঝুঁকে পড়ল। দু—হাত মেঝেয় রেখে দ্রুত হামা দিয়ে এগোল।
‘ধর ধর পদ্ম, নারায়ণ শিলায় হাত দেবে। সেদিন ওকে কোলে নিয়ে শিবের মাথায় ফুল বেলপাতা দিচ্ছি নজরটা একটু সরিয়েছি, ওম্মা খপ করে নারায়ণকে তুলেই মুখে, শিলাটা ভাগ্যিস বড়ো নইলে মুখে ঢুকে গেলে কী কাণ্ডটাই যে হত!’ বিজলি শিউরে উঠলেন। ‘ব্যাটা বড়ো হয়ে পুরুত হবে, চক্রবর্তীর ব্যাটা তো!’
‘ঠাকুমা তোমার নারায়ণ শিলা ভুটু এঁটো করে দিল?’ অনুলেখা তির্যক স্বরে বলল। ‘আর আমি যদি হাত দিই অমনি হাঁ হাঁ করে উঠে বলবে, ছুঁয়ে দিলি নারায়ণকে?’
‘কে বলেছে তোকে আমি বলব?’ বিজলি বললেন তীক্ষ্ন স্বরে। ‘তুই তো কায়েতের মেয়ে, চামার মেথর নোস। আমাকে ভাবিস কী তুই?’
অনুর নাম ধরে পাশের বাড়ি থেকে চিৎকার ভেসে এল। ব্যস্ত হয়ে অনু বলল, যাই ঠাকুমা। মা—র চেল্লানি থামিয়ে আসি।’
অনুলেখা বেরিয়ে যাবার পর অলকা বলল, ‘মাস্টারমশাই পড়াতে এসেছেন। উঠতে বসতে গঞ্জনা দেয় ওকে, কেন সাতশোর ওপর নম্বর উঠল না! চার চার জন প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়েও কেন তিনটের বেশি লেটার পেলি না বলে বাবা—মা শুধু মারতে বাকি রাখে। জেঠিমা, অনু দিনে ছ—সাত ঘণ্টা পড়ত, খাটিয়ে মেয়ে, কিন্তু শুধু খাটুনিতে কি দশ—কুড়ি জনের মধ্যে আসা যায়, মাথাটাও তো থাকা দরকার। ওর পড়ায় ব্যাঘাত হবে বলে টিভি পর্যন্ত কেনেনি। এই দেখুন না এখনও কলেজের ক্লাস শুরুই হয়নি, বাড়িতে মাস্টারের কাছে পড়া শুরু হয়ে গেছে।’
‘অনু কিন্তু বুদ্ধিমতী মেয়ে। ছোটো থেকে ঠিকমতো মানুষ করলে ও অনেক ভালো নম্বর করত।’ বিজলির স্বরে স্নেহ ও খেদ। মেয়েটার কথাবার্তা তাঁর ভালো লাগে, ওর চাপল্যে মজা পান।
‘ঠিকই বলেছেন জেঠিমা। বাবামা—ই যদি অশিক্ষিত হয়, উঠতে বসতে যদি বিধিনিষেধের বেড়ি পরিয়ে রাখে আর দিনরাত কানের কাছে যদি মন্ত্র জপে ‘রেজাল্ট চাই রেজাল্ট চাই, পড় পড়’ তা হলে যা হবার তাই হয়েছে অনুর। প্রায় সাতশো নম্বরেও ওরা খুশি নয়।’
