‘হ্যাঁ বাবা, কাল পাঁপড় খেয়েছিলে তো?’
ওরা একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ দিদিমা। এক ঝুড়ি পাঁপড় দিয়ে গেছিল পদ্ম, তারপর সত্যদা চা পাঠিয়ে দেয়, আমরা এবার চললুম। পলাশদা বলেছে দরকার হলে ক্লাবে খবর দেবেন।’
‘দোব।’ বিজলির মুখে নিশ্চিন্তি। তৃপ্তির সঙ্গে স্নেহের হাসি ফুটে উঠল। তারপরই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ‘পদ্ম রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দেওয়া হয়নি, দৌড়ে যা।’
দুটো বালিশে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে বিজলি। মাথার পিছনে পশ্চিমের জানলা, তার পাশে আশি বছরের পুরোনো বার্মা সেগুনের বড়ো আলমারি আর দাঁড়—করানো কাঠের আলনা, তার পাশে আবার জানলা। উত্তরের দেওয়াল ঘেঁষে দু—হাত উঁচু চার হাত লম্বা একটা কাঠের বাক্স। তার উপর পাশাপাশি দুটি স্টিলের তোরঙ্গ। তার পাশের জানলা আকারে অন্য তিনটির থেকে ছোটো। এই জানলার পরেই শ্রীধরের সিংহাসন। পুজোর সরঞ্জাম ও বাসনপত্র একটা জলচৌকিতে এবং তার পাশে পুবের দেওয়াল। এই দেওয়ালের পিছনের ঘরটি রান্নার, যার দরজা বারান্দায়। খাটে বসে বিজলি সোজা তাকিয়ে পুবদিকের দরজা দিয়ে বারান্দার ও—মাথা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছেন। দেখলেন ভুটুকে কোলে নিয়ে কল্পনা নীচের থেকে উঠে এল, তার পিছনে পদ্মর সঙ্গে পাশের বাড়ির একতলার ভাড়াটে বউ অলকা।
‘ছেলেগুলো ছিল তাই, দশ টাকার কম নেবে না বলছিল। ওরা ধমকে বলল পাঁচ টাকা নিবি তো নয়তো রিকশার চাকা ভেঙে দোব। এইটুকু রাস্তা বলে কিনা দশ টাকা! পা ভাঙা লোক বেকায়দায় পড়েছে দেখেছে তো অমনি ভাড়া বাড়িয়ে দিল!’ পদ্মর গজগজানি থামিয়ে দিলেন বিজলি।
‘আমি হলে দশ টাকাই দিতুম। কাল রিকশায় চড়ে বৃষ্টির মধ্যে অতটা এলুম, তাকে কি ভাড়া দিয়েছিস? রিকশা উলটে গেছিল কি ওর দোষে? বেচারা শুধু শুধু মার খেল।’
‘জেঠিমা কালকেই শুনেছি রিকশা উলটে আপনার পা ভেঙেছে, লোটাস নার্সিংহোমে গেছেন। ভাবলাম গিয়ে দেখে আসি। রাত হয়ে গেছে বৃষ্টিও তখন আবার নামল। আর যাওয়া হল না।’ অলকার গলায় যেন কৈফিয়তের সুর। ‘সকালে জানেনই তো আমার স্কুল।’ অলকা দুই সন্তানের মা, হাওড়ার কদমতলায় এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। ভোরবেলায় তাকে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়।
‘ও পদ্মদি, পদ্মদি ঠাকুমা ফিরে এসেছে?’
পাশের বাড়ি থেকে মেয়ে গলার ডাক শুনে পদ্ম জানলার কাছে গেল। সালোয়ার কামিজ পরা এক কিশোরী বারান্দায় ঝুঁকে রয়েছে। পদ্মকে দেখে বলল, ‘ঠাকুমা ফিরেছে বলল সিধুর মা, পা নাকি দু—টুকরো হয়ে গেছিল, অপারেশন করে জুড়ে দিয়েছে। এখন কেমন আছে?’
‘এখন লাফাচ্ছে।’
‘যাহহ, ঠাট্টা করছ।’
‘ঠাট্টা! রিকশা থেকে নেমে গট গট করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল। তুমি সিধুর মাকে জিজ্ঞেস করে দ্যাখো, ও নিজের চোখে দেখেছে। বিশ্বাস না হয় তো নিজে এসে দেখে যাও।’
বিজলি শুনে হাসছিলেন। দু—হাত বাড়িয়ে দিলেন ভুটুর দিকে, ‘ওকে দে আমার কাছে।’ ভুটুকে কোলে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাল পাঁপড় খেয়েছ তো সোনা?’
‘মাসিমা কেউ খায়নি।’ কল্পনা বলল, ‘ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে এসে বউদি তো শুয়ে পড়ল। দাদা ফিরতে দু—জনে কথা বলতে বলতে কীরকম যেন গম্ভীর হয়ে গেল। বউদি বলল কিছুই খাব না দাদাও বলল খিদে নেই পাঁপড়গুলো তুমি খেয়ে নাও। অত পাঁপড় আমি খাব কী করে! বাড়িতে নিয়ে গেলুম।’
বিজলি অবাক হয়ে বললেন, ‘কী এমন হল যে পাঁপড় খেল না?’
‘রাতেও কেউ খায়নি, খাবার যেমন ঢাকা দেওয়া ছিল তেমনই পড়ে ছিল সকালে। গরম করে দিলুম দাদা তাই খেয়ে বেরিয়েছে। বউদি অপিস যায়নি, খায়ওনি।’
‘হাসি কোথায়?’ বিজলি উদবিগ্ন স্বরে বললেন।
‘বিছানায়।’
‘যা ওকে বল আমি ডাকছি।’
কল্পনা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর অলকা ইতস্তত করে বলল, ‘জেঠিমা কী ব্যাপার বলুন তো! ডাক্তার দেখিয়ে এসেই হাসি অমন শুয়ে পড়ল, খেলোদেলোও না! অমন চনমনে উচ্ছল মেয়ে, যার মুখে সর্বদা হাসি লেগেই থাকে সে এমন করল কেন, সিরিয়াস কিছু হয়েছে বোধহয়।’
বিজলির গলার সরু সোনার চেনটা ধরে ভুটু টানাটানি করছে। চেনটা ওর মুঠো থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বিজলি বললেন, ‘আসুক, দেখি কী বলল ডাক্তার।’
হাসির বদলে এল অনুলেখা, পাশের বাড়ির কিশোরী। অলকার বাড়িওয়ালার মেয়ে।
‘ঠাকুমা তুমি নাকি লাফাচ্ছ?’ অনুলেখা আলতো করে আঙুল ছোঁয়াল বিজলির প্লাস্টারে, ‘ব্যথা লাগে?’
‘লাফিয়ে দেখাব তোকে?’
‘না না ওসব করতে যেয়ো না। যখন শুনলুম রিকশা উলটে ডিগবাজি খেয়ে পড়েছ তখন মনে হল ইসস এমন একটা সিন দেখা হল না। আমি বাবা আর জীবনে রিকশায় চড়ব না।’ বলেই অনুলেখা হেসে উঠল।
অলকা গম্ভীর স্বরে বলল, ‘অনু এটা হাসির ব্যাপার নয়। মনে রেখো একজন বুড়োমানুষ দুর্ঘটনায় পড়ে পা ভেঙেছেন আর তুমি বিশ্বাস করতে পারলে কী করে জেঠিমা লাফাচ্ছেন? হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছ কলেজে ভরতি হয়েছ, এখন একটু বুঝে শুনে কথা বলো।’
‘পদ্মদি ঠাট্টা করল তাই আমিও পালটা দিলুম। আর আহা উহু করে চোখের জল ফেললে কি ঠাকুমার পা ভালো হয়ে যাবে না ব্যথা দূর হবে? যদি হয় তা হলে এখুনি এক বালতি চোখের জল বার করে দেব।’ অনুলেখার গলায় ঝাঁঝ ফুটল।
‘হয়েছে হয়েছে, একবার উঠে দাঁড়াই তারপর দেখাব হনুমানের লাফ। আমার ছাদ থেকে অনুদের ছাদে লাফিয়ে পড়ব। তারপর ওকে নিয়ে রিকশায় চড়ে গঙ্গায় চান করতে যাব। যাবি তো?’
