অল্পবয়সি সুদর্শন ডাক্তারের সামনে বসে দু—জন স্ত্রীলোক, কোলে বাচ্চচা। পলাশকে দেখে ডাক্তার যেভাবে তাকাল তাতে বোঝা যায় সে পলাশকে চেনে।
‘আপনার দিদিমা?’
‘হ্যাঁ।’
রুগি ফেলে ডাক্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উবু হয়ে বসে বিজলির ডান পা আলতো করে হাতে তুলে নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। পলাশ তখন পদ্মকে দেখিয়ে দোকানের এক কর্মচারীকে বলল, ‘কপালটা পরিষ্কার করে ওষুধ টষুধ যা লাগে লাগিয়ে দিন।’
ডাক্তার জানালেন, ‘হাড় ভেঙেছে, অপারেশন করে জোড়া দিতে হবে, হাসপাতালে নিয়ে যান বা পাশের নার্সিংহোমেও যেতে পারেন। তবে পয়সা খরচের কথা যদি না ভাবেন তা হলে বলব হাসপাতালে না যাওয়াই ভালো।’
‘কী দিদিমা কোথায় যাবেন?’ পলাশ জিজ্ঞাসা করল হালকা সুরে। সন্ত্রস্ত হয়ে বিজলি বললেন, ‘না বাবা হাসপাতালে যাব না, যা সব শুনি! ওই নার্সিংহোমেই আমাকে নিয়ে চলো। বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে।’
ডাক্তার যন্ত্রণার জন্য ট্যাবলেট লিখে দিল। দোকান থেকেই কিনে নিলেন বিজলি। পায়ে ব্যান্ডেজ করে ডাক্তার ঘড়ি দেখে বলল, ‘তাড়াতাড়ি নিয়ে যান, ওদের এক্সরে ইউনিট সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকে।’
টাকার ব্যাগটা তখনও পদ্মর কাছে। ষাট টাকা নিয়ে বেরিয়ে ছিলেন বিজলি। ওষুধ আর ব্যান্ডেজের দাম মিটিয়ে দিয়ে পলাশের কাছে পদ্ম জানতে চাইল, ‘কত টাকা লাগবে দাদা নার্সিংহোমে?’
নিরস্ত করার ভঙ্গিতে হাত তুলে পলাশ বলল, ‘এখন ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না, পরে দিলেও চলবে।’ তারপর সে সঙ্গের ছেলেদের বলল, ‘দিদিমাকে নিয়ে তোরা লোটাস নার্সিংহোমের দোতলায় চলে যা। আমি গিয়ে কথাবার্তা বলে রাখছি।’
বিজলি হাতছানি দিয়ে পদ্মকে ডেকে ফিসফিস করে বললেন, ‘ঘরের চাবি তো তোর কাছে। আলমারির চাবি আছে শ্রীধরের সিংহাসনের তলায় বারকোশ ঢাকা খুঞ্চিপোশটার নীচে। সেটা নিয়ে আলমারি খুলে ওপরের তাকে গরম কাপড়ের পেছনে নীল কাপড়ের একটা থলি দেখবি। দু—হাজার টাকা আছে। নার্সিংহোম যেমন যেমন টাকা চাইবে দিয়ে দিবি।’
ওষুধের দোকান থেকে নার্সিংহোম তিরিশ মিটার দূরে। তিনটি ছেলে বিজলিকে বহন করে লোটাসের দোতলায় নিয়ে গেল, সঙ্গে পদ্ম। রিসেপশন কাউন্টারের মেয়েটির সঙ্গে তখন পলাশ কথা বলছিল। বিজলিকে চেয়ারে বসিয়ে রাখল, ‘দিদিমা আপনার ভাগ্যটা সত্যিই খারাপ। দশ মিনিট আগে এলে এক্সরে—টা করা যেত। যে করবে সে চলে গেছে।’
‘তা হলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে, আবার কাল আসতে হবে!’ বিজলি হতাশ বিমূঢ় চোখে তাকিয়ে রইলেন।
‘আমিও তাই ভাবলুম, ফিরে যাওয়া আবার আসা? তার থেকে বরং রাতটা এখানেই থেকে যান, ভাঙা পায়ের ধকলটা আর তা হলে নিতে হবে না। সেটাই বললুম দিদিমণিকে। বেড একটা খালি আছে। একটা রাত তো, কোনোরকমে কাটিয়ে দিন, পারবেন না?’
বিজলি একমুহূর্ত ভেবে নিয়ে বললেন, ‘পারব। তোমরা আমার জন্য যা করলে বাবা চিরকাল মনে রাখব। আর তোমাদের কষ্ট দোব না। আর বসে থাকতে পারছি না, একটু শুইয়ে দেবে?’
পলাশ ব্যস্ত হয়ে রিসেপশনিস্টকে বলল, ‘বেডটা কোথায় দেখিয়ে দিন, ওঁকে শুইয়ে দিই।’
ভিতরে একটি বড়ো ঘর। আটটি বেড। ঘরের পাশে দুটি ছোটো ঘর। কেবিন। বেশি টাকা দিয়ে যারা আলাদা থাকতে চায় তাদের জন্য। একটি কেবিন আজ বিকেলেই খালি হয়েছে। বিজলিকে সেখানে খাটে শুইয়ে দিল ছেলেরা।
‘যন্ত্রণা হচ্ছে খুব?’ পলাশ জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ বাবা।’
নার্সকে ডেকে পলাশ বলল, ‘ঘুমের ওষুধ কিছু থাকলে দিন, ঘুমিয়ে থেকে অন্তত রাতটায় রেহাই পান।’ তারপর বিজলিকে বলল, ‘দিদিমা রাতে কিছু খাবেনটাবেন তো নাকি উপোস দেবেন?’
‘উপোসই ভালো, এরকম জায়গায় কিছু মুখে তুলতে পারব না।’
পদ্ম বলল, ‘দুধটা গরম করে এনে দোব মাসিমা, খই আর চিনি দিয়ে?’
‘দরকার নেই, রাতে উপোস দেওয়া আমার অভ্যেস আছে। পদ্ম, যাবার সময় পাঁপড় কিনে নিয়ে যাবি। এদের খাওয়াবি তুইও খাবি। পলাশ তোমরা ক্লাবের ঘরে এখন থাকবে তো, পদ্ম পাঁপড় ভেজে দিয়ে আসবে, রথের দিনে একটু মুখে দিয়ো। পাঁপড় হাসিকেও দিতে ভুলিসনি।’
ওরা কেবিন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, বিজলি ডাকলেন পদ্মকে। ‘অনেকগুলো ছেলে, বেশি করে পাঁপড় কিনিস। পয়সা না কুলোলে আলমারি থেকে টাকা বার করে নিস। আর শোন সত্যর চায়ের দোকানে বলে দিস ছেলেদের যেন চা দিয়ে আসে। হাসিকে বলিস ভুটুর মুখে যেন একটু পাঁপড় দেয়, জগন্নাথের প্রসাদ বলে। চটিজোড়া ভিজে আমসত্ত্ব হয়ে গেছে, বারান্দার একধারে রাখবি। সকালে জলখাবার খেয়ে তবে আসবি, এখন যা।’
দুই
পরের দিন দুপুর গড়াতেই বিজলি বাড়ি ফিরলেন, ডান পায়ের পাতার অর্ধেকটা থেকে গোড়ালি মুড়ে উপর দিকে পায়ের ডিম পর্যন্ত সাদা প্লাস্টারে মোড়া। চারটি ছেলে ধরাধরি করে রিকশায় তুলে পদ্মর পাশে বসিয়ে দেয়। রিকশা জয় দত্ত স্ট্রিটের মুখে আসতেই পদ্ম চেঁচিয়ে হুঁশিয়ারি দেয়, ‘দেখে চালাও বাপু, সব্বোনেশে জায়গা ওই ঢিবিটা।’
কাল রাত থেকেই বৃষ্টি ধরে গেছে। ঘোলাটে মেঘের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে, রোদও এসে পড়েছে রাস্তায়, বাড়ির দেওয়ালে। বাড়ির দরজায় বিজলিকে রিকশা থেকে নামাল ছেলেরা। কড়া নাড়তে দরজা খুলল কল্পনা, কোলে ভুটু। ছেলেরাই দোতলায় তুলে নিয়ে গিয়ে বিজলিকে খাটে শুইয়ে দিল।
