বিজলি অবাক চোখে পদ্মর দিকে তাকালেন, ‘ভাবতে পারিস?’
‘কী জানি আমি তো তখন জন্মাইনি।’
রিকশা হরি মিত্র লেন ধরে জয় দত্ত স্ট্রিটের কাছাকাছি হতেই পদ্ম ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘বাঁয়ে গলিমে ঢুকেগা।’ তারপর স্বগতোক্তি করল, ‘রাস্তার আলোটা এত কম, গলিটা চেনা যায় না।’
‘বৃষ্টি পড়লে রাস্তার আলো কম কম লাগে।’ বিজলির কথা শেষ হওয়ামাত্রই ঘটে গেল ব্যাপারটা।
রিকশার চাকা ঢিপিতে ঘটাং শব্দ করে ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিকশাওয়ালার পা কর্দমাক্ত মাটিতে হড়কে গেল। সে মুখ থুবড়ে পড়ার সময় তার মুঠো থেকে টানার হাতল দুটি ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ামাত্র রিকশাটা দুই সওয়ারির ভারে পিছন দিকে উলটে গিয়ে উলটানো ‘৯’কার বা ‘ৎ’—এর মতো হয়ে গেল। বিজলি ও পদ্ম বলাবাহুল্য উলটানো রিকশার তলায় চাপা পড়ে গেল।
‘বাবারে।’ বলে পদ্ম প্রথমেই আর্তনাদ করে উঠে চিৎকার করল ‘বাঁচাও বাঁচাও, মরে গেলুম।’
তালগোল পাকিয়ে পড়েছেন বিজলি, তার উপরে পদ্ম। তার চিৎকার শুনে পাশের দুটি বাড়ি থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এল। পাড়ার নেতাজি তরুণদলের ঘরে কয়েকটি তরুণ ক্যারাম খেলছিল, তারা ছুটে এল চিৎকার শুনে। শীর্ণকায় রিকশাওয়ালা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে দুটি হাতল ধরে রিকশাটাকে সোজা করে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে। কাজটা করে দিল দুটি তরুণ হাতল দুটি ধরে টেনে নামিয়ে।
মাটির উপর জড়াজড়ি করে পড়েছিল ওরা দু—জন। পদ্ম নিজেই উঠে দাঁড়াল, তার ডান ভ্রুর উপরে কপাল থেকে রক্ত ঝরছে। বিজলি ওঠার চেষ্টা করে পারলেন না। তাঁর কাপড় হাঁটুর উপরে উঠে রয়েছে। পদ্ম দ্রুত নামিয়ে দিল কাপড়।
‘মাসিমা হাত ধরুন।’ বিজলির বাড়ানো হাত ধরে পদ্ম টেনে তোলার চেষ্টা করে পারল না। সে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের দিকে তাকাল।
‘সরো সরো, ঘণ্টু আয় তো দিদিমাকে তোল।’ পদ্মকে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে এল একটি যুবক, মাঝারি উচ্চচতা, বলিষ্ঠ গড়ন, তরুণদলের সচিব।
‘কে রে পলাশ! এই ডান পাটা বোধহয়—।’ বিজলি কথা শেষ করার আগেই দু—জন তাঁর বগল ধরে দাঁড় করাল। দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। পলাশ তাঁকে পাঁজাকোলা করে তুলে পাশের রোয়াকে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল। ইতিমধ্যে জমে গেছে ভিড়।
রিকশাওয়ালা তখন দুটো থাপ্পড় খেয়ে হাত জোড় করে বোঝাচ্ছে, ‘আমার কী কসুর আছে বাবু। এই দেখুন জমিনের হাল আউর আলো ভি কমতি আছে। আমি তো দেখতেই পাইনি, দেখলে কি রিকশা এর উপর চড়হাতাম?’
‘ঠিকই তো বলেছে।’ লুঙ্গির কষি আঁটতে আঁটতে চেঁচিয়ে বললেন এক মধ্যবয়সি ‘আলো তো মাসখানেক ধরে নেই। এই ঢিপিটা তো এক হপ্তা ধরে এমন হয়ে রয়েছে! রাস্তা খুঁড়ে সমান করে পিচ দেওয়ার দায়িত্ব তো কর্পোরেশনের। এসব দেখাশোনার দায় তো কাউন্সিলরের। তিনি যদি দায়িত্ব পালন না করেন তা হলে তো অ্যাকসিডেন্ট হবেই। পাড়ায় ঘুরে ঘুরে হাত জোড় করে ভোট চাইবেন, এই করে দোব তাই করে দোব বলবেন, যেই জিতলেন আর তার টিকিটি দেখা গেল না।’
‘চল পলাশ, শক্তি মুখুজ্জেকে ধরে এনে দেখাই। এইখানে দাঁড়িয়ে ওকে কথা দিতে হবে তিন দিনের মধ্যে রাস্তা আলো ঠিকঠাক করে দেবে—না দিলে রাস্তা অবরোধ হবে।’ বলল ট্রাউজার্স—হাওয়াই শার্ট পরা সিদ্ধার্থ ওরফে ঘণ্টু।
‘আমাদের বস্তির টিউবকলটাও ওইসঙ্গে ঠিক করে দিতে বোলো।’ ভিড়ের মধ্যে এক স্ত্রীকণ্ঠে শোনা গেল।
‘অবরোধ টবরোধ পরে হবে ঘণ্টু’ পলাশের গলা ভারী কর্তৃত্বব্যঞ্জক। ‘আগে দিদিমাকে ডাক্তারখানায় নিয়ে চল, মনে হচ্ছে সিরিয়াস কিছু হয়েছে।’
রিকশাওয়ালা বুঝে গেছে এই দুর্ঘটনার পর ভাড়া চাওয়া উচিত হবে না। পনেরোটা টাকা মারা যাওয়ার দুঃখ চেপে সে রিকশা নিয়ে চলে যাচ্ছিল।
‘অ্যাই রিকশা যাতা কাঁহা? মাইজিকো তুলো। ডাক্তারখানামে লে চলো।’ পলাশ ধমকে উঠল। ‘অ্যাকসিডেন্ট তুম কিয়া অব ভাগ রাহে হ্যায়?’
রিকশাওয়ালা তটস্থ হয়ে ফিরে এল। বিজলি উঠে দাঁড়াতে পারল না। পদ্ম রিকশায় উঠে বসল। পলাশ আর ঘণ্টু ধরাধরি করে বিজলিকে রিকশায় তুলে বসিয়ে দিতে পদ্ম তাঁকে ধরে রাখল।
‘পদ্ম তোর মুখ তো রক্তে ভেসে যাচ্ছে রে, অ ঘণ্টু তোমার রুমাল টুমাল থাকে তো দাও না।’ রিকশার পাশে পাশে হাঁটছে চারটি ছেলে। বিজলির কথা শুনে একটি ছেলে খয়েরি রঙের একটা রুমাল দিল পদ্মর হাতে।
হরি মিত্র লেন যেখানে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ে পড়েছে তার বাঁদিকের বাড়িতে সাধুখাঁর মুদির দোকান, শীতলার মিষ্টির দোকান আর সূর্য মেডিক্যাল হল, বড়ো ওষুধের দোকান। এখানে দু—বেলা চার জন ডাক্তার বসে পালা করে। ডানদিকে কাউন্টার ও কাচের শোকেস, বাঁদিকে প্লাইউডের দেওয়ালে ভাগ করা দুটো চেম্বার পরদা, ঝোলানো দরজা। চেম্বারের সামনে বেঞ্চে বসে জনা সাতেক চিকিৎসাপ্রার্থী নারী ও শিশু। তাদের সঙ্গের লোকেরা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে।
প্রায় চ্যাংদোলা করে বিজলিকে নিয়ে এল তিনটি ছেলে।
‘উঠুন উঠুন দিদিমাকে বসতে দিন।’ পলাশ বলামাত্র দু—জন স্ত্রীলোক তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। ওরা বেঞ্চে বসিয়ে দিল বিজলিকে। পরদা সরিয়ে ডানদিকের চেম্বারে ঢুকল পলাশ।
‘ডাক্তারবাবু রিকশা উলটে পড়ে গেছে দিদিমা। বোধহয় পা ভেঙেছে, বাইরে বসিয়েছি, আপনি এসে একটু দেখুন।’
