ট্রাম রাস্তায় পৌঁছে ফুটপাথ দিয়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটে ওরা ঠাকুরবাড়ির লোহার ফটকে পৌঁছোল। ভিতরের ছোটো উঠোনে রথ অপেক্ষা করছে। বিজলি প্রথমে হাত জোড় করে রথকে প্রণাম জানিয়ে খুচরো রেজগি ও নোট রাখার চামড়ার ছোটো মানিব্যাগটা পদ্মর হাতে দিয়ে চটি খুলে মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন। রাধা কৃষ্ণ যুগ্ম বিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলেন। মিনিট দুই পর প্রণাম করলেন গড় হয়ে।
ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যেই, রথের রশিতে টান পড়ল। ছাতা বন্ধ করে পদ্ম দাঁড়াল বিজলির পাশে রশি ধরার জন্য। বৃষ্টির জন্যই এবার লোকজন কম। অন্যান্য বার ঠেলাঠেলি হয় রথ টানার জন্য। উঠোন থেকে ফুটপাত সমতল। বিজলি রশি ধরলেন পদ্মও ধরল।
‘তুই চাকার দিকে কেন, আমার বাঁদিকে আয়।’ বিজলির স্বরে সন্দিগ্ধ ধমক। চৌধুরিদের রথের নীচে পড়ে পদ্মর স্বগ্গে যাওয়া যায় কিনা প্রশ্নটা এখন মনে পড়ায় তাঁর এই ধমক। তিনি রথের চাকার দিকে তাকালেন। মাহেশের মতো অত বড়ো নয়। এ চাকার নীচে পড়লে পদ্মর মতো বছর তিরিশের মেয়ে মরবে না, বড়োজোর হাত—পা ভাঙবে। তাঁর মতো বুড়িটুড়ি হলে আলাদা কথা। বিজলি মোটামুটি আশ্বস্ত হলেও পদ্মর বুদ্ধিশুদ্ধিতে বিশেষ আস্থা নেই। বিয়ের ছ—মাস কাটতে—না—কাটতেই স্বামীর ঘর ছেড়ে তাকে উড়েপাড়ার বস্তিতে তার মা মকরবালার কাছে ফিরে আসতে হয়। ‘রোজ মদ খেয়ে এসে গোরু পেটানোর মতো কী পেটান যে পেটায় না!’ বলেছিল পদ্ম।
ওর শীর্ণ শরীরে মারের দাগ দেখে বিজলি মনে মনে আহত হয়েছিলেন। তখুনি বলেছিলেন, ‘মাকে বল আমার কাজ ছেড়ে দিতে, বুড়ি হয়েছে এবার ঘরে বসে থাকুক। তুই থাকবি আমার কাছে, আর তোকে স্বামীর ঘর করতে হবে না। মকর এত কষ্ট করে হাড়মাস কালি করে টাকা জমিয়ে শেষে এমন একটা পশুর সঙ্গে কিনা মেয়ের বিয়ে দিল! ছি ছি ছি, ভালো করে আগে একটু খোঁজখবরও নিল না! ব্লাউজটা পরে নে।’ মারের দাগ দেখাবার জন্য পদ্ম ব্লাউজ খুলে ছিল। টেপা বোতাম লাগাতে লাগাতে পদ্ম হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে, ‘মাসিমা আমি কালো কুচ্ছিত রোগা, ওকে আমি খুশি করতে পারি না, আমার পাছা নেই বুক নেই। আমার কী দোষ মাসিমা?’ পদ্ম জানতে চেয়েছিল।
বিজলি ওর মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন। পদ্মর নাকের মাঝখানটা কেউ যেন নোড়া দিয়ে থেঁতলে বসিয়ে দিয়েছে। সেজন্য ওর ডাকনাম বুঁচি। বিজলি ওকে নাকের কথা মনে না করানোর জন্য প্রথম থেকেই ডাকেন ভালো নামে। কপাল নেই, ভুরুর একটু ওপর থেকে শুরু হয়েছে ঘন কোঁকড়া চুল। বড়ো গোল চোখের মণি কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। বিজলি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন পদ্ম কুরূপা।
‘মেয়েমানুষের বিচার হয় কি শুধু বাইরের রূপ যৌবন দিয়ে রে পদ্ম। গুণ বলে একটা জিনিস আছে। দয়া মায়া মমতা স্নেহ যার নেই রূপসি হয়েও সে সুন্দরী নয়। অন্তর সুন্দর না হলে সৌন্দর্য ফোটে না। তুই কষ্ট পাচ্ছিস কেন রে, অন্তরের মধ্যে তোর গুণের পদ্ম ফুটিয়ে তোল, দেখবি সবাই তোকে ভালোবাসবে। তাতেই তুই রূপসি হবি।’ পদ্মর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে স্নেহ মাখিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন বিজলি সাত বছর আগে। পরের মাস থেকেই পদ্ম দিনরাতের সঙ্গিনী হয়ে আছে বিজলির।
নামেই রথের রশি টানা। ওরা দু—জন ধরে একটু টান দিল মাত্র। আসলে টানল জনা পনেরো ছেলেবুড়ো। গড়গড়িয়ে রথ উঠোন থেকে ফুটপাতে। কাঠের পাটা পাতা ছিল তার উপর দিয়ে ফুটপাত থেকে ট্রাম রাস্তায় রথ নেমে গেল। বৃষ্টির মধ্যেই বালক সংঘের ব্যান্ড পার্টি বাজাতে শুরু করল। প্রতি বছরের মতোই হারমোনিয়াম, গ্যাসবাতি, টুনিবালব, চামর হাতে দুটি মেয়ে সঙ্গে নিয়ে শুরু হল জগন্নাথদেবের যাত্রা। বিজলি হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলেন। মিনিট তিনেক পর রথটি ডানদিকের রাস্তায় ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
‘পদ্ম একটা রিকশা ডাক আর হেঁটে যেতে পারব না, যা কাদা আর গর্ত!’
মন্দিরের ধারেই হুড আর পরদা ফেলে একটি রিকশায় উবু হয়ে বসে রিকশাওয়ালা। পদ্ম গিয়ে তার সঙ্গে হাত নেড়ে নেড়ে গন্তব্যস্থল বুঝিয়ে ফিরে এল বিজলির কাছে। ‘মাসিমা, বলল পনেরো টাকা নেবে।’
‘য়্যা, দু—মিনিটের রাস্তা পনেরো টাকা! বলিস কী?’
‘বিষ্টি পড়লে এই রেট, কী মেজাজ!’
‘চল তাই দোব, তবে বাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে কিন্তু।’
রিকশায় উঠে বিজলি ফিসফিস করে বললেন, ‘পদ্ম এতো হাড় জিরজিরে বুড়ো, টানতে পারবে তো?’
‘খুব পারবে, দ্যাখো না।’
মাথায় গামছা জড়ানো রবারের পাম্পশু পরা শীর্ণদেহী রিকশাওয়ালা প্রথমে লম্বা পায়ে তারপর জগিং করার মতো ছুটতে শুরু করল। বিজলি বললেন, ‘আগে রিকশাওয়ালা খালি পায়ে থাকত। গরমে পিচের রাস্তায় পা রাখা যায় না তখনও দেখেছি খালি পায়ে ওরা রিকশা টানত। ভালোই হয়েছে জুতো পরছে, কী বল?’
‘জুতো, হাওয়াই চটি পরছে বলেই তো ভাড়া বাড়িয়েছে।’ পদ্ম বিজ্ঞের মতো বলল।
‘যা বলেছিস। বিয়ের পর প্রথম সিনেমা গেলুম হাতিবাগানে, উত্তম—সুচিত্রার তখনও এত নাম হয়নি, মনে আছে বইটার নাম সাড়ে চুয়াত্তর, তোর মেসোমশাইয়ের সঙ্গে নাইট শো—এ গেছলুম। ফেরার সময় উনি বললেন চলো রিকশা করে যাই। কত ভাড়া নিল জানিস? বারো আনা!’
