‘মাসিমা তুমি মাহেশের রথ দেখেছ? আমাকে একবার তোমার জামাই বলেছিল নিয়ে গিয়ে দেখাবে। বলেছিল লক্ষ লক্ষ লোক হয় আর রাস্তার দু—ধারে দোকান বসে। রথটাও পেল্লায় উঁচু। ইয়া মোটা লম্বা রশি। সবাই হুড়োহুড়ি করে রশি একবার ধরে টানার জন্য। টানলে নাকি মরার পর স্বগ্গে যায়, সত্যি?’
বিজলি ঘাড় কাত করে বললেন, ‘সত্যি। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো এসব বিশ্বাসই করে না। আমি যেবার যাই সেবার একটা বুড়ি রথের চাকার নীচে পড়ে যায় ঠেলাঠেলির চোটে। ইয়া চারতলা বাড়ির মতো লোহার রথ তেমনি ভারী একশো বছরেরও আগে সাহেব কোম্পানির তৈরি; বড়ো বড়ো বারোটা লোহার চাকা; দুটো তামার তৈরি ঘোড়া একটার রং নীল অন্যটার সাদা; দুটো কাঠের রাজহাঁস, রথের সারথি মানুষের মাপের কাঠের তৈরি। আর রশিটা এখান থেকে শেতলের মিষ্টির দোকান পর্যন্ত, দু—হাতের মুঠোর মধ্যে আমি ধরতে পারিনি এত মোটা!’
পদ্ম বলল, ‘বুড়িটার কী হল মাসিমা?’
‘যা হবার তাই হল, তক্ষুনি মরে গেল। সবাই বলল, ‘ভাগ্যবতী, জগন্নাথদেব ওকে নিজের কাছে টেনে নিলেন’, শুনে আমার মনের ভেতরে তখন কীরকম যেন একটা হল।’
উৎসুক স্বরে পদ্ম বলল, ‘রথের চাকার নীচে পড়ে তোমার মরার ইচ্ছে হল? আচ্ছা মাসিমা চৌধুরিদের রথের চাকার নীচে পড়ে গিয়ে মরলে মানুষ স্বগ্গে যাবে?’
শুনেই ভ্রু কুঁচকে উঠল বিজলির। চোখ সরু করে বললেন, ‘কেন তোর কি মরার ইচ্ছে হয়েছে? জামাইয়ের খবরটবর রাখিস?’
‘শুনেছি আর একটা মেয়ে হয়েছে।’
‘তা হলে তো ভালোই আছে। তোকে কে বলল মেয়ে হয়েছে?’
‘আরতির বর শ্যামল শালকেতে তুলোর দোকানে কাজ করে, মাঝেমধ্যে ওর সঙ্গে দেখা হয়। ওই বলেছে এবারও মেয়ে হল! শ্যামলের কাছ থেকে শুনে আরতি আমায় বলেছে। থাকগে মাসিমা ওসব কথা বাদ দিন, যার যা কপালে লেখা আছে তাই হবে।’ পদ্ম বারান্দার বাইরে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘বৃষ্টি ধরেছে, চলো বেরিয়ে পড়ি। ফেরার সময় পাঁপড় কিনে নোবখন।’
দোতলার ঘরে আর সিঁড়ির দরজায় তালা দিয়ে, দু—জনে একতলায় নামল। সিঁড়ির ডান দিকে টানা রক, সামনে ছোটো উঠোন। উঠোন পেরিয়ে সদর দরজা। রকের পাশে দুটো ঘর, শয়নের এবং রান্নার। ঘর ভাড়া নিয়ে আছে স্বামী স্ত্রী ও একবছরের একটি ছেলে। জ্যোতির্ময় হাবড়ায় একটি স্কুলের শিক্ষক, একহারা চেহারা, সুদর্শন যুবক, ঠান্ডা স্বভাব, কথাবার্তায় নম্র। হাসি উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা, স্বামীর বিপরীত স্বভাবের, দ্রুত কথা বলে, সর্বদাই হাসিখুশি, দেহের গড়ন কিঞ্চিৎ ভারী, দৈর্ঘ্যে সাধারণ বাঙালি মেয়ের থেকে খাটো। ভুটুর মুখখানি ও গায়ের রং মায়ের মতোই। স্বাস্থ্যবান শিশু। তার রান্না কালেভদ্রে শোনা যায়। হাসি চাকরি করে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ে এক ট্রান্সপোর্ট এজেন্টের অফিসে।
একতলায় নেমে বিজলি বললেন, ‘দেখো তো পদ্ম হাসি ঘরের দরজায় ঠিকমতো তালাটা দিয়েছে কিনা, যা তড়বড়ে মেয়ে!’
পদ্ম দুটো ঘরের তালা ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, ‘দিয়েছে। কোথায় গেছে হাসিদি? তোমায় বলে গেছে?’
‘বলেছিল তো ডাক্তারের কাছে যাবে। বুকের এইখানে কী একটা অনেকদিন ধরে খচখচ করছে।’ বিজলি ডান দিকের স্তনে হাত দিলেন। ‘ভুটুকে সঙ্গে নিয়েই গেছে অপিস থেকে ফিরে।’
‘ছেলেটা বেশ নাদুসনুদুস, কল্পনা বলছিল বেশিক্ষণ কোলে রাখতে কষ্ট হয়।’
‘ষাট ষাট, বচ্ছরকার এমন দিনে তুই ওর শরীরে নজর দিলি, বালাই ষাট। নে চল।’ বিজলির বিরক্ত স্বরে পদ্ম কুঁচকে গেল।
‘আমি আবার নজর দিলুম কোথায়! ভালো কথা বললে যে নজর দেওয়া হয় আমি জানতুম না বাপু।’
সদর দরজার ভিতরের কড়ায় তালা ঝুলছে। সেটা চাবি দিয়ে খুলে দু—জনে বাইরে বেরিয়ে এল। দরজার বাইরের কড়ায় তালা লাগাতে লাগাতে পদ্ম বলল, ‘চাবি হাসিদির না দাদার কাছে রয়েছে?’
‘হাসির কাছেই তো থাকে, অপিস থেকে তো আগে ফেরে। জ্যোতির তো ফিরতে ফিরতে রাত সাতটা—আটটা হয়ে যায়। হাবড়া কি কম দূর? তার ওপর বনগাঁ লাইন, ট্রেনের গন্ডগোল তো লেগেই আছে। ছাতাটা খোল।’
জয় দত্ত স্ট্রিট খুব সরু গলি নয়। মুখোমুখি হলে দুটি রিকশা পাশ কাটিয়ে যেতে পারে। ওরা দু—জন একটা বাঁক ঘুরে চওড়া রাস্তা হরি মিত্র লেনে পৌঁছেই থমকে দাঁড়াল। কর্পোরেশনের মিস্ত্রিরা রাস্তা খুঁড়ে জলের পাইপ সারিয়ে ইট আর মাটি দিয়ে গর্ত বুজিয়েছে। জায়গাটা হয়ে আছে কচ্ছপের পিঠের মতো। বৃষ্টির ফলে মাটি পিচ্ছিল, একটা—দুটো ইটের মাথা মাটির উপরে উঠে রয়েছে। ঢিপিটার পাশের দেওয়ালে রাস্তার টিউব লাইটের, টিউবটা আছে আলো নেই। দূর থেকে রাস্তার আলো আবছা হয়ে পড়ে ঢিপিটা চকচক করছে।
‘পদ্ম সাবধান। ওই ধার দিয়ে ঘুরে চল। ঢিপির ওপর উঠেছিস কি হড়কেছিস।’
ছাতা হাতে নিয়ে বিজলি পা টিপে টিপে ঢিপির পাশ দিয়ে এগোলেন, পিছনে পদ্ম। এবার হরি মিত্র লেন ধরে দু—জনে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ছাতার নীচে থেকে চলল চৌধুরিদের রাধাবল্লভ ঠাকুরবাড়ির উদ্দেশে। জোরে বৃষ্টি নামল সঙ্গে দমকা হাওয়া, জলের ঝাপটা থেকে বাঁচতে পদ্ম ছাতাটা বিজলির হাত থেকে নিয়ে সামনে ঝুঁকিয়ে বলল, ‘মাসিমা এই বৃষ্টিতে রথ চালাবে কী করে? সব তো ভিজে ঢোল হয়ে যাবে।’
‘রথের দিনে বৃষ্টি না হলে রথযাত্রা আবার কীসের! ঠিক বেরোবে রথ।’
