‘গঙ্গাদার ওপর প্রতিশোধ নেবার আনন্দে বোধ হয় ওর এটা মনে ছিল না।’
‘তুমি ওপরে যাও, আমি আর একবার জহিরুলের কাছে ঘুরে আসি, ফ্ল্যাটের ব্যাপারটা আর একদিনও দেরি করা ঠিক হবে না। যা টাকা চাইছে, তাতেই রাজি হয়ে যাই।’
‘আজ থাক, বড়ো ক্লান্ত অবসন্ন লাগছে। বরং কাল যেয়ো। এখন একা থাকলে আমিই বোধ হয় পাগল হয়ে যাব।’
তিন তলায় উঠে এসে চাবি দিয়ে দরজা খুলে তারা ভিতরে ঢুকল। পাল্লাটা বন্ধ করার সময় রোহিণী বাইরের দিকে তাকিয়েই দেখল, চারতলার সিঁড়িতে সুজাতা গুপ্ত দাঁড়িয়ে। বিস্রস্ত মলিন সাদা শাড়ি, চুল বাঁধা নেই, মুখ শুকনো, চোখ বসা। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি, যার অর্থ বোঝা অসম্ভব।
‘মাসিমা! কখন এলেন?’ রোহিণী প্রাথমিক চমক কাটিয়ে, পাল্লাটায় হাত রেখে স্বস্তিভরে বলল।
হাসিটা মুখে রেখেই সুজাতা ধীর পদক্ষেপে নেমে এলেন।
‘বহরমপুর গেছিলাম। সেখান থেকে তোমার জন্য সুখবর এনেছি।’
রাজেন এসে দাঁড়াল রোহিণীর পাশে। সুজাতা তাকে দেখে বললেন, ‘ইনিই কী তোমার হবু স্বামী?’
‘হ্যাঁ।’
‘সুখে থাকো দুজনে।’ সুজাতার স্বরে শ্রান্তি, চোখ শান্ত।
‘কিন্তু সুখবরটা কী মাসিমা?’ রোহিণী ব্যগ্র হল।
‘শোভনেশ মারা গেছে। তুমি বিধবা হয়েছো।’
কথাটা বলেই সুজাতা ঘুরে সিঁড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, তখন রোহিণীর আর্তনাদটা শুনলেন। ঘুরে দাঁড়ালেন।
‘আমি জেল সুপারের সঙ্গে কথা বলেছি। হাসপাতাল থেকে শোভনেশ আর তার সঙ্গে একজন পালিয়ে গেছিল ঠিকই। পালিয়ে গেছিল নসিপুর স্টেশনে, ট্রেনেও ওঠে। তখন ওখানে কম্যুনাল রায়ট চলছে। দাড়ি গোঁফ, লুঙ্গি, এইসবই ওর কাল হল। ট্রেন থেকে নামিয়ে বহু লোককে মারা হয়, তার মধ্যে শোভনেশ আর তার সঙ্গীও ছিল। শোভনেশের লাশ পুলিশ শনাক্ত করেছে। পুড়িয়েও দিয়েছে।’
সুজাতা গুপ্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন দেওয়াল ধরে ধরে। সিঁড়ি ঘোরার সময়ে আর একবার মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। রাজেনের বুকে মুখ চেপে রোহিণী তখন ফোঁপাচ্ছে। রাজেনের বাহু পিঠে বেড় দিয়ে শক্ত করে ধরে আছে ওর কাঁধ।
সুজাতা গুপ্ত দেখে শুধু মাথা নাড়লেন।
রাজেন দু—হাতে জড়িয়ে রোহিণীকে এনে ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসাল। এখন কথা বলার সময় নয়। রোহিণী শুধু শূন্য দৃষ্টিতে রাজেনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রাজেন জানে, এই শূন্যতা প্রকৃতির নিয়মের মতোই বেশিক্ষণ থাকবে না? সে চায়ের জল চড়াতে গেল রান্নাঘরে।
বিজলিবালার মুক্তি
এক
দুদিন ধরে কখনো টিপটিপ কখনো ঝমঝম বৃষ্টি পড়ে চলেছে। উত্তর কলকাতার হাতিবাগানে চৌধুরিদের রাধাবল্লভ ঠাকুরবাড়িতে রথযাত্রার উৎসব। মাহেশের রথের মতো নয় চূড়া বিশিষ্ট দু—মানুষ উঁচু কাঠের রথ। ফুলে পাতায় ব্যাটারিতে জ্বলা টুনির আলোয় নানারঙের রাংতায় মুড়ে সাজিয়ে রাস্তা দিয়ে টেনে এলাকায় ঘোরানো হয়। রথের সামনে ইউনিফর্ম পরা বালক সংঘের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা কুচকাওয়াজ করে ড্রাম বাঁশি করতাল বাজাতে বাজাতে যায়। তার পিছনে সাইকেলের চাকা লাগানো ছোট্ট টেবিলের একটা ঠেলাগাড়ি তার উপর রাখা হারমোনিয়াম। বাদকের পাশে নানা বয়সি সাত—আটজন গায়ক। ব্যান্ড বাদকরা বাজনা বন্ধ করে দাঁড়ায় যখন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গায়করা জগন্নাথদেবকে নিয়ে রচিত গান সমবেত কণ্ঠে গেয়ে ওঠে। রথের দু—পাশে চামর হাতে শাড়িপরা দুটি কিশোরী হাঁটতে হাঁটতে যায়। কাঠের তৈরি প্রায় দেড় ফুট লম্বা জগন্নাথ সুভদ্রা বলরাম ত্রিতল রথের দ্বিতলে থাকেন ও চামরের বাতাস খান। প্রায় কুড়ি মিটার লম্বা শোভাযাত্রার সঙ্গে থাকে কার্বাইড গ্যাসের বাতি মাথায় চারটি মুটে।
উত্তর কলকাতায় চৌধুরিদের ঠাকুরবাড়ির রথযাত্রা চল্লিশ—পঞ্চাশ বছর আগে আরও জমকালো ছিল। বিজলিবালা হুগলি জেলার ভেনিয়াপুর গ্রাম থেকে তেতাল্লিশ বছর আগে যখন প্রথম জয় দত্ত স্ট্রিটের শ্বশুরবাড়িতে আসেন তখন থেকেই শাশুড়ির সঙ্গে দেখতে যেতেন চৌধুরিদের রথযাত্রা উৎসব। সবার সঙ্গে রথের রশি ধরে প্রথম টান দিতেন। বছরের পর বছর এটা করে তাঁর অভ্যাস বা নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। শাশুড়ি মারা যাবার পর স্বামী কৃষ্ণকিশোর তাকে সঙ্গে নিয়ে রশি টানতে যেতেন; স্বামী মারা যাবার পর তিনি একাই যেতেন। গত সাত বছর হল সঙ্গে থাকছে পদ্মমণি।
বিকেলে হঠাৎ টিপটিপানি বৃষ্টিটা ঝমঝমিয়ে উঠতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিজলি বললেন, ‘পদ্ম এবার আর বোধহয় রথ টানতে যাওয়া হল না।’
‘কেন হবে না মাসিমা। এখুনি বৃষ্টি ধরে যাবে, কাল থেকে এই রকমই তো চলছে।’ পদ্ম কথা বলতে বলতে বারান্দায় দড়িতে ঝোলানো কাপড় হাত দিয়ে টিপে বলল, ‘কাল থেকে মেলা এখনও ভিজে রয়েছে। মাসিমা রথের দিনে পাঁপড় তেলেভাজা এবার খাবে না? সব বছরই তো খাও।’
‘ওই যাঃ, একদম ভুলে গেছি। ঘরে তো পাঁপড় নেই, তুই ছাতাটা নিয়ে সাধুখাঁর দোকান থেকে সন্ধেবেলাতেই কিনে আনবি। রথের দিনে পাঁপড় খাওয়ার ইচ্ছেটা ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে মাহেশের রথ দেখতে গিয়ে মনের মধ্যে সেই যে ঢুকে গেল তারপর এই পঞ্চাশ বছরে দু—তিনবার ছাড়া সব বছরই মেনেছি।’
পদ্ম অবাক হয়ে বলল, ‘পঞ্চাশ বছর ধরে!’
‘বললুম তো দু—তিন বছর বাদ দিয়ে। শ্বশুর মারা গেলেন রথযাত্রার আগের দিন। অশৌচ, তখন কি পাঁপড় ভেজে খাওয়া যায়? আর একবার শাশুড়ির অম্বলশূলের ব্যথা উঠল। ছটফটাচ্ছেন, উনি ডাক্তার আনলেন। তিনি দেখেটেখে ওষুধ দিয়ে বললেন, ‘অপারেশন না করালে আবার হবে। বেলগেছের কারমাইকেল কলেজে ভরতি করাল ওর ছেলে। ডাক্তার পঞ্চানন বাঁড়ুজ্জে, মস্ত বড়ো ডাক্তার, অপারেশন করলেন। আর সেইদিনই রথযাত্রা, তখন তো আমি হাসপাতালে শাশুড়ির বেডের পাশে। আর একবার কেন যে পাঁপড় খাওয়া হল না এখন আর মনে পড়ছে না।’
