‘ছবিগুলো তো বাসুদেবপুরে—’
গঙ্গাপ্রসাদের বাড়ি আজ ভোরেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মীনা চ্যাটার্জির সঙ্গে লাগতে এলে, তার কী ফল হতে পারে, ওই মোটা বেঁটে মর্কটটার এবার তা মালুম হবে। সুখবরের জন্য আমি দশটা থেকে এখানে অপেক্ষা করছিলাম। আধঘণ্টা আগে ওরা ফিরল। কাম ফতে।’ মীনা শেষ শব্দটা বলল টেবলে ঘুঁষি মেরে এবং উঠে দাঁড়াল।
‘কিন্তু ওইসব ছবির মধ্যে তো অনেকগুলো আসল কাজও ছিল, খুব ভালো কাজ।’
‘যাক আসল ছবি, যাক ভালো কাজ।’ মীনা হঠাৎ গলা চড়িয়ে দেহটা টানটান করে বলল, ‘ধ্বংস হয়ে যাক অতীত তার ভালো আর মন্দ নিয়ে, শোভনেশ সেনগুপ্ত আবার নতুন করে শুরু করবে, আবার সে রংতুলি নিয়ে দাঁড়াবে ক্যানভাসের সামনে।’ মীনার স্বর জড়িয়ে যাচ্ছে, দেহ ঈষৎ টলে উঠল। ‘আমি ওকে দাঁড় করাব। বুঝলেন, আমি ওকে—’
মীনার চিৎকার শুনে ওর সঙ্গীরা মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে ছিল। তাদের মধ্য থেকে একজন উঠে দ্রুত মীনার কাছে এসে দু—হাতে ওর দু—কাঁধ ধরে বলল, ‘বি কোয়ায়েট মীনা, বি কোয়ায়েট…এবার আমরা যাব, চলো এখন। এটা পাবলিক প্লেস, এখানে ইনডিসেন্ট ব্যবহার করা উচিত নয়।’
লোকটিকে রোহিণী মীনার ফ্ল্যাটে প্রথম দিন দেখেছে। মীনা একে ‘বাচ্চচুদা’ বলে ডেকেছিল। তা ছাড়া টেলিফোনেও মীনা এর কাছেই সাহায্য চেয়েছিল।
‘মিস চ্যাটার্জি, কাগজের লোকজন সর্বত্রই আছে। ব্যাড পাবলিসিটি পেয়ে গেলে আপনার ক্ষতিই হবে।’ কথাগুলোকে বলে রোহিণী যা আশা করেছিল, তাই হতে দেখল। মীনার চোখমুখ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে এল, বাচ্চচুদার হাতদুটো কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘এক্সকিউজ মী, একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম, হবার মতোই একটা ঘটনা, নয় কী?’
‘অবশ্যই’, রোহিণী ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘শোভনকাকাকে কলঙ্কমুক্ত করলেন, ভবিষ্যতে মানুষ আর তার খারাপ ছবিগুলো দেখতে পাবে না, এটা তো উত্তেজিত হবার মতোই ব্যাপার। এবার আপনি নিজের টেবিলে গিয়ে বসুন।’
রোহিণী তাকে ব্যঙ্গ করল কিনা, সেটা মীনা ঠাওর করার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘আপনি কি খুব কষ্ট পেলেন?’
‘মোটেই না। কেননা আমিও আমার অতীত ধ্বংস করার জন্য উদগ্রীব, তাই শোভনেশ সেনগুপ্ত নামটাও আর শুনতে চাই না। মনে আছে, কী উপদেশ আমায় দিয়ে ছিলেন? সেটাই এবার পালন করব। সামনে যে লোকটি বসে, উনিই আমার ভবিষ্যৎ স্বামী,’ রোহিণী উঠে দাঁড়াল। মীনা হতভম্বের মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে। ‘রাজেন ওঠো, এখানে আর আমার ভালো লাগছে না, অন্য কোথাও খেয়ে নেব।’
ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিয়ে রোহিণী কারোর মুখের দিকে না তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাজেন লাফিয়ে উঠে তার পিছু নিল।
হোটেলের গেট থেকে গাড়ি বেরোতেই রোহিণীর চোখে পড়ল, কুড়ি—পঁচিশ গজ দূরে জলপাই রঙের মারুতি। চণ্ডীদাস ঘোষাল অপেক্ষা করছে। কোনো লাভ নেই অপেক্ষা করে, গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি আর আসবে না। এই কথাগুলো ওকে বলে দেবে কিনা, রোহিণী তাই নিয়ে ভাবতে ভাবতেই গাড়ি অনেক দূরে চলে গেল। থাকগে, দাঁড়িয়ে আছে তো থাকুক। অনেক কিছুই তো জীবনে না—বলা থেকে যায়। বাড়িতে অত যত্নে শ্রদ্ধায় টাঙানো ছবিটা যে জাল, সে কথা তো চণ্ডীদাসকে বলা যায়নি। আসল ভেবে যদি পুজো করে তৃপ্ত হয়, তাহলে দরকার কী ভুলটা ভাঙিয়ে। এতে কারোরই তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না!
‘কী ভাবছ?’ রাজেন জানতে চাইল।
‘মনটা কীরকম হয়ে গেল। ছবিগুলোর জন্য তো বটেই, মীনা চ্যাটার্জির মানসিক অবস্থার কথা ভেবেও। প্যাথেটিক।’
‘আসলে হালভাঙা, পাল ছেঁড়া জীবনের এই অবস্থাই হয়। যখন যেরকম আবেগের ধাক্কা, পরিস্থিতির ধাক্কা লাগে, ওরা তখন সেইদিকেই ভেসে যায়। জীবন আর জগৎ সম্পর্কে একটা ধারণা, একটা দৃষ্টিভঙ্গি—অর্থাৎ কী চাই, কী করণীয়, করার জন্য একাগ্রভাবে লেগে থাক অচঞ্চল অটলভাবে ঝড়ঝাপটার বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে দাঁড়ানো…এসবের জন্য চাই চরিত্র, সেটাই ওই মীনার মতো লোকদের নেই। তাই অত রোমান্টিক হয়, আজেবাজে কথা বলে, আচরণ করে।’ কথা বলতে বলতে রাজেন আড়চোখে দেখল, রোহিণী ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে টেপের ক্যাসেট বার করল, হাতটা তুলেছে সেটা জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলার জন্য। রাজেন সিলি পয়েন্টে ক্যাচ ধরার মতো বিদ্যুৎগতিতে বাঁ হাত বাড়িয়ে রোহিণীর হাত থেকে ক্যাসেটটা ছিনিয়ে নিল।
‘পাগল হয়েছ! কেউ কুড়িয়ে পেয়ে ওটা যদি বাজিয়ে শোনে, তাহলে?’
‘আমি আর ওটা রাখতে চাই না, ওটাও ধ্বংস হোক।’
‘ওতে আছে পরমেশের কনফেসন। পাগলের প্রলাপ বলে কোর্টে হয়তো উড়িয়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু গীতার কথা সত্যি বলে ধরে নিলে শোভনেশ সেনগুপ্ত খুনি নন।’
‘তোমাকে আবার বলছি রাজেন, এসব নিয়ে আর একটা কথাও আমি শুনতে চাই না। কে খুনি আর কে নয়, তাতে আমার আর কোনো কৌতূহল নেই। আমি ভুলে যেতে চাই, ভুলে যেতে চাই, ভুলে যেতে চাই।’ রোহিণী প্রায় মীনা চ্যাটার্জির মতোই চিৎকার করে দু—হাতের তালুতে মুখ ঢাকল।
সারা পথে একবার ছাড়া তার আর কথা বলেনি। পথে মিষ্টির দোকান দেখে রাজেন বলেছিল, ‘কিছু কী কিনব?’
‘খিদে নেই।’
সল্টলেকে ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে নামার সময় রাজেন হালকা চালে বলল, ‘মীনা চ্যাটার্জি তখন চিৎকার করে বলল, ‘আমি ওকে দাঁড় করাব।’ কিন্তু যাকে দাঁড় করিয়ে ছবি আঁকাবে, সেই লোকটির তো পাত্তা নেই।’
