রোহিণীর গজদাঁতটা দেখা গেল ঠোঁটদুটো একটু বেশি ছড়িয়ে পড়ায়। রাজেন ব্রেক কষল। রোহিণী সান গ্লাস খুলে চোখ দুটি মেলে দেখাল তার অহঙ্কারের সুখাবেশ।
‘কী জেনেছ?’
‘জেনেছি, ভালোবাসার পরীক্ষা দেবার জন্য একটা লোক কী কঠোরভাবে নিজেকে ডিসিপ্লিনড করতে পারে, জেনেছি, আমি খুব সাধারণ তুচ্ছ নই, জেনেছি…।’ আবেগে রোহিণীর কথা বন্ধ হল।
‘বলে যাও, থেমো না।’ মৃদু স্বরে রাজেন বলল।
‘আর আমি জানি না। সব যেন কেমন এই মুহূর্তে গুলিয়ে যাচ্ছে…একটা দুর্দান্ত ফিলিংস রাজেন, যা সব মেয়েই জীবনে পেতে চায়, সর্বক্ষণ জমিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। পৃথিবীতে গাদাগুচ্ছের সেঞ্চুরি হচ্ছে, তার মধ্যে একটা শুধু আমার জন্যই হবে, এটা জানিয়ে, প্রতিজ্ঞা নিয়ে একজন মাঠে নেমে সেটা করে নিয়ে এল। আমাকে সে মর্যাদা দিল, সম্মান দিল, আমি কী যে সে মেয়ে!’
মুখোমুখি দু—জনের দৃষ্টি একটি বিন্দুতে এসে স্থির হয়ে রইল অনেকক্ষণ। উভয়ের দৃষ্টিপথ বেয়ে প্রবাহিত হল গাঢ় অনুরাগ, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা।
‘ভীষণ খিদে পাচ্ছে।’ রাজেন বলল।
‘না না, রাস্তার মধ্যে ওসব নয়, বাড়ি ফিরে—’
‘আরে, সত্যিকারের খিদে পেয়েছে।’
‘তার মানে? তোমার তো একটাই খিদে!’
‘কখন আলু ভাতে ভাত খেয়ে বেরিয়েছি বলো তো? এটা পাকস্থলির বাস্তব খিদে।’
‘বাগুইআটি তো সামনেই, দই আর সন্দেশ কিনে খেয়ে নাও।’
‘উঁহু। এয়ারপোর্টে হোটেলেই আমরা যাব তবে অন্য উদ্দেশ্যে, লাঞ্চ করতে।’
‘সেই ভালো। আমারও বেশ খিদে পাচ্ছে।’
রাজেন গাড়ি ছাড়ল। বাগুইআটির মোড় পার হয়ে সে বলল, ‘মানুষ কতরকম ঝোঁকের মধ্যে যে জীবনকে টেনে নিয়ে যায়, তাই এইসব লোকগুলোকে দেখলে বোঝা যায়। টাকার ঝোঁক, প্রেমের ঝোঁক, প্রতিহিংসার ঝোঁক, উন্মাদ হয়ে যাবার ঝোঁক।’
‘আমিও কৌতূহলের ঝোঁকে পড়েছিলাম।’
‘এখন আর নেই?’
‘এখন শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর ঝোঁক।’ স্টিয়ারিং থেকে রাজেনের বাঁ হাতটা তুলে রোহিণী, তার ডান ঊরুর উপর রাখল, রাজেন হেসে ফেলল।
এয়ারপোর্ট হোটেলের সামনে কোনো গাড়ি দাঁড়িয়ে নেই। হোটেলের পার্কিং জোন—এ একটি অ্যাম্বাসাডর ও একটি জিপ। তাদের পাশেই রাজেন হিলম্যানকে রাখল।
হোটেলের রেস্টুরেন্টে ঢুকেই তাদের চোখ পড়ল ঘরের শেষপ্রান্তে এক কোণে টেবিলে মুখোমুখি বসে তিনটি লোক। তারা খাওয়ায় ব্যস্ত। টেবিলের ওপর চারটি বিয়ারের বোতল। চতুর্থ চেয়ারটি খালি কিন্তু প্লেটে আধ খাওয়া একটা তন্দুরী চিকেন রয়েছে। দরজার দিকে তাকিয়ে বসা লোক দু—জন রাজেন ও রোহিণীর দিকে তাকাল। রোহিণীর ভ্রূ কুঁচকে উঠল।
‘ওদিকে বসব না, এখানেই দেওয়ালের পাশে বসা যাক।’ রোহিণী চাপা স্বরে বলল।
‘কেন, আর একটু এগিয়ে—’
‘না।’ রোহিণী টেবিলে ঝোলাটা রেখে চেয়ার টেনে লোকগুলির দিকে পিছন ফিরে বসে বলল, ‘ওখানে বসা একটা লোকের মুখ কালই দেখেছি মীনা চ্যাটার্জির ফ্ল্যাটে, মীনাকে পাহারা দিচ্ছিল।’
রাজেন সামনে তাকিয়ে বলল, ‘ওরা তোমার দিকে তাকাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে তোমাকে নিয়েই কিছু যেন বলছে।’
‘বলুক গে। কিন্তু এই সময় ওরা এখানে কেন! বাসুদেবপুর যাবার তো এটাই রাস্তা। তাহলে কী—।’
রোহিণী কথা অসমাপ্ত রাখল রাজেনের চোখ দেখে। সে যে অপ্রত্যাশিত কিছু একটা দেখতে পেয়েছে।
‘মাই গড!’ রাজেন ফিসফিস করল। ‘এখানে মীনা চ্যাটার্জি! খালি চেয়ারটায় বসল, টয়লেট থেকে এসে। গ্লাসে বিয়ার ঢালছে। একটা লোক ওকে কী যেন বলল, বিয়ার ঢালা বন্ধ শুনছে, পিছনে তাকিয়ে দেখছে, তোমাকেই। চেয়ার থেকে উঠল, আমাদের দিকে আসছে, হাতে ভরতি গ্লাস, মুখে মস্ত হাসি, পায়ের স্টেপিং গোলমেলে, বোধ হয় অনেকক্ষণ বসে খাচ্ছে।’ রিলে করার মতো রাজেন বলে গেল রোহিণীর মুখের দিকে তাকিয়ে এবং কোনোরকম ভাবান্তর না ঘটিয়ে।
‘হ্যালো মিসেস সেনগুপ্ত।’ মীনা একটা হালকা থাপ্পড় কষাল রোহিণীর কাঁধে। রোহিণী এতটা উৎফুল্ল ঘনিষ্ঠতা আশা করেনি। একটু বেশি করেই চমকে উঠে রোহিণী বলল, ‘আরে আপনি এখানে?’
‘কেন আমি কি এখানে আসতে পারি না? শুধু কি আপনিই আসবেন?’ রোহিণীর পাশের চেয়ারে বসে মীনা হাসিমুখে রাজেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইনি?’
‘আমার বন্ধু।’
‘বাড়ি থেকে এতদূরে….বন্ধুর সঙ্গে।’ বলেই মীনা তার কথার তাৎপর্যটা বোঝাতে হাসল। তারপর চুমুক দিয়ে গ্লাসটা অর্ধেক করে টেবলে ঠকাস করে রাখল। ‘আমিও এসেছি বন্ধুদের নিয়ে, ভুল বললাম, বন্ধুদের রিসিভ করার জন্য। ওরা একটা মহৎ কাজে গেছিল।’ মীনা ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ‘কাজটা কী, জানেন মিসেস সেনগুপ্ত?’
রোহিণীর মনে হল একটা কেউটে ফণা তুলে তার মুখের কাছে দুলছে। তার শরীর সিরসির করে উঠল। মাথা নেড়ে শুকনো গলায় বলল, ‘না, জানি না।’
‘শোভনেশ সেনগুপ্তর আঁকা সব ছবি, ওঁর নষ্ট মনের কাজ আর লোকের চোখের সামনে আসবে না। সব ভস্মীভূত, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
‘কোথায়, কবে, কখন পুড়ল?’ রোহিণী তীক্ষ্ন কণ্ঠে জানতে চাইল।
গ্লাসের বাকি বিয়ারটুকু শেষ করে মীনা চোখ বুজে বসে রইল। কী একটা আবেগ যেন দমন করার জন্য সে নিজের সঙ্গে ধস্তাধস্তি চালাচ্ছে। হঠাৎ চোখ খুলে বলল, ‘উনি যা চেয়েছিলেন আমি তাই করেছি, কোনো অন্যায় কোনো পাপ আমি করিনি…করেছি কি?’
