রাজেন কয়েক সেকেন্ড রোহিণীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘বাসুদেবপুর থেকে ফিরে আজই জহিরুলের কাছে যাব।’
ঠিক সওয়া এগারোটায় তারা তিনতলা থেকে নীচে নেমে এল। এখান থেকে এয়ারপোর্ট হোটেলের সামনে পৌঁছতে বুড়োর পক্ষে মিনিট কুড়ি হয়তো লাগবে। একটু আগে পৌঁছনোই ভালো। একটা জায়গা বেছে নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। চণ্ডীদাস ঘোষাল আসবে নিজের গাড়িতে, গঙ্গাপ্রসাদও তাই। ওরা কেউ বুড়োকে বা রাজেনকে আগে দেখেনি, সুতরাং চিনবে না।
একতলায় নেমেই রোহিণী মাথায় আঁচল তুলে, কালো চশমা পরল। রাজেন সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতেই বলল, ‘ছদ্মবেশ।’
‘ফিল্ম অ্যাকট্রেস ভেবে এতে আরও বেশি লোকে তাকাবে। আমার সান হ্যাটটা গাড়িতেই আছে। ওটা পরে সামনে একটু টেনে নামিয়ে নাও, মুখটা আড়াল হবে।’
কথা বলতে বলতে ওরা গেটের কাছে এসে দেখল, তুষার দত্ত কোমরে হাত রেখে খুব মন দিয়ে বুড়োকে নিরীক্ষণ করছে। রোহিণীকে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘ঘোমটা! বিয়ে করেছেন নাকি?’
‘করতে যাচ্ছি।’
‘কাকে?’
গাড়ির দরজা খুলে রাজেন ভিতরে ঢুকছে। রোহিণী আঙুল দিয়ে তাকে দেখাতেই তুষার দত্ত গম্ভীর হয়ে গেল।
‘প্রেম করে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তলায় তলায় তাহলে এইসব চালিয়ে যাচ্ছিলেন?’
‘উপরে উপরে কী প্রেম চালিয়ে যাওয়া যায়?’
তুষার দত্তর মুখ কালো হয়ে গেল। ত্যারছা চোখে হিলম্যানটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শেষে এই একটা ওল্ড লঝঝড় গাড়ি জুটল। আমি তো ভেবেছিলুম, মার্সিডিজ নয়তো টয়োটো, নিদেন কন্টেসা চেপে বিয়ে করতে যাবেন।’
তুষার দত্তর গলায় কেমন যেন একটা জ্বালা রয়েছে, যেটা রোহিণীর কানে সহজেই ধরা পড়ল। কিন্তু রাজেনের গাড়িকে লঝঝড় বলাটা তার মনঃপূত হল না।
‘লঝঝড়ে বুড়োরা খুব ফেইথফুল হয়। কাজ নিয়ে কথা। ও তো আর মোটরশ্রী কনটেস্টে নামতে যাচ্ছে না!’ কথা বলে রোহিণী গাড়ির দরজা খুলে রাজেনের পাশের সিটে বসল।
হঠাৎই তুষার দত্তর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। একটু কুঁজো হয়ে রোহিণীর চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমার মেয়েকে নষ্ট করতে চাইছেন কেন? সকালে দেখলুম, একটা সেমিজ পরে রয়েছে। রাত্তিরে ওটা পরেই নাকি শুয়েছিল। আমায় দেখে লুকোতে যাচ্ছিল। ক্যাঁক করে ধরে, এমন অসভ্য জিনিস কোথা থেকে পেয়েছে জিজ্ঞেস করায়, প্রথমে বলতে চাইছিল না। দুটো থাপ্পড় কষাতে, বলল, আপনি নাকি দিয়েছেন।’
‘হ্যাঁ দিয়েছি।’
‘ক্যানোওও।’ তুষার দত্ত চেঁচিয়ে উঠে গাড়ির চালে রোহিণীর ঠিক মাথার উপরে কিল বসাল। ‘নিজে পরেন বলে কি সবাইকে পরাতে হবে? অ্যারিস্টোক্র্যাট ফ্যামিলির মেয়েরা কি এসব পরে?’
রোহিণীর মনে হল, বাঘটা আবার উঁকি দিচ্ছে। মর্যালিস্টের পর এবার এই অ্যারিস্টোক্র্যাট। রাতের সেই বীভৎস স্বপ্ন কী যে অশুভ দিন বয়ে আনল, আর এর শেষ যে কীভাবে হবে! পাশে মুখ ফিরিয়ে মৃদুস্বরে সে বলল, ‘রাজেন আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
রাজেন স্টার্ট দিল। রোহিণীকে স্বস্তি দিয়ে বুড়ো কাশাকাশি না করেই গর্জন করে উঠল। তুষার দত্তর দিকে তাকিয়ে নড করে, রাজেন গাড়ি ছাড়ল।
‘এখানে থাকতে হলে ভদ্রভাবে থাকতে হবে, বুঝলেন?…’ তুষার দত্তর চিৎকার পিছনে ফেলে হিলম্যান সল্টলেক থেকে বেরিয়ে এল। রাজেন শুধু একবার বলেছিল, ‘অ্যাডভানটেজ নেবার চেষ্টা করেছিল?’
‘হ্যাঁ।’ রোহিণীর মুখে ফিকে একটা হাসি ফুটতে ফুটতেও মিলিয়ে গেল। ‘মেয়েটা আর বউয়ের জন্য কষ্ট হয়।’
‘এইরকম বাপ আর স্বামী হাজার হাজার আছে, সুতরাং কষ্টটা মন থেকে ঝেড়ে ফ্যালো।’
‘বলামাত্রই ঝেড়ে ফেলা যায় কি? গৌরীর মা, তুষার দত্ত, এরা ছারপোকার জাত। কামড়ালে চুলকোয়, পিষে মারলে আঙুলে গন্ধ লেগে থাকে। বার বার তোষক—গদি উলটেপালটে খুঁজতে হয়, কোথায় এরা লুকিয়ে আছে!’
‘তার থেকে অনেক নিশ্চিন্ত হতে পারবে, যদি পুরোনো তোষক—গদি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে, মানে মন থেকে চিন্তা থেকে নির্মূল করে, একেবারে নতুন হয়ে উঠতে পারো। আর তা করতে হলে প্রথমেই তোমাকে এই বাসুদেবপুর যাওয়াটা বন্ধ করতে হবে।’
রাজেন গাড়ির গতি কমাল।
‘কেন বন্ধ করব! এতদূর পর্যন্ত এসে শেষ না দেখে ফেরা যায় না।’
‘যায়, জীবনকে খুব বাস্তব দিক থেকে দেখার চেষ্টা করলে, এই যাওয়ার কোনো পজিটিভ লাভ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধরা যাক, শোভনেশ সেনগুপ্তর দামি দামি অনেক ছবি গঙ্গাপ্রসাদ বাঁড়ুজ্জে হাতিয়ে নিয়ে বাসুদেবপুরে রেখে দিয়েছে, সেগুলো বিক্রি করে সে বহু টাকা কামাচ্ছে বা কামাবে।’ রাজেন কয়েক সেকেন্ড কথা বন্ধ রেখে বলল, ‘তাতে তোমারই বা কী আর আমারই বা কী! তুমি কি ওই টাকার ভাগ চাও?’
‘মোটেই না। আমি তো বরাবরই বলে এসেছি—’ রাজেন বাঁ হাত তুলে রোহিণীকে থামিয়ে দিল।
‘তাহলে আমাদের কী দরকার, এই তথাকথিত একটা রহস্যর পিছু নিয়ে সময় নষ্ট করার আর গাড়ির তেল পোড়াবার? রুনি একটা কথা বলো, গত দশ—বারো দিনে তুমি এমন কী পেয়েছ—ভয়, অপমান আর মানসিক কষ্ট ছাড়া, যার মধ্যে নিজেকে পরিচ্ছন্ন, তাজা, আনন্দভরা মনে হয়েছে? বেঁচে থাকার একটা…কিছুই পাওনি। আজেবাজে লোকেদের নোংরামি আর স্বার্থপরতা দেখে আর ভেবে—।’
‘এবার থামো তো। গত দশদিনে আমি জীবনের শ্রেষ্ঠ জানাটা জেনেছি…বুড়োকে ঘোরাও।’
