‘পিছন ফিরে বাঁশে হেলান দিয়ে এদিকে মুখ করে দাঁড়া।’
অনন্ত ওর কথা—অনুযায়ী দাঁড়িয়েছিল। নন্দন তার পাশে দাঁড়াল। অরবিন্দ বাঁশের উপর ঝুঁকে খুব মন দিয়ে সাবিত্রীর দিকে তাকিয়ে। ওর হাতে একটা রুমাল। অনন্ত দেখল, রুমালটা হাত থেকে হঠাৎ থালার উপর পড়ল। অরবিন্দ দু—পাশে তাকিয়ে নীচু হয়ে এক লহমায় রুমালটা মুঠো করে তুলে প্যান্টের পকেটে রাখল।
অরবিন্দ মন্থরভাবে প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় কর্পোরেশনের খাবার জলের ট্যাঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিয়ে তাদের দু—জনকে ডাকল।
‘চল।’
‘না, যাব না।’
‘নাগরদোলায় চাপবি না?’
‘না। আমি দেখেছি অরবিন্দ রুমালের সঙ্গে পয়সাও তুলল।’
‘আমরা ওমলেটও খাব। তাড়াতাড়ি আয়।’
অনন্ত যায়নি। ওরা দু—জন দূর থেকে বার বার হাতছানি দিয়ে ডেকে তার জন্য অপেক্ষা করেছিল। সে মাথা নেড়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে। তখন তার ভয় করছিল। যদি কেউ দেখে থাকে? সারা পাড়ার লোক জেনে যাবে, রাস্তায় বেরোলেই লোকেরা আঙুল দিয়ে দেখাবে, কীরকম চোখে যেন তাকাবে। তার থেকেও বড়ো কথা বাবা, মা লজ্জায় পড়বে।
প্যান্ডেলের সামনের বাড়ির ঝি দোতলার জানালা থেকে দেখেছিল। সে বলে দেয় যুগলদাকে।
‘পয়সা সরিয়েছে ওরা?’
‘কী জানি, আমি দেখিনি।’
‘তুই তো ওদের সঙ্গেই দাঁড়িয়েছিলি।’
‘হ্যাঁ, তবে আমি দেখিনি।’
পুজো কমিটির তিন—চারজন তখন হাজির ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে আলোচনা করছিল। একবার তার কানে এল—’না না এ—ছেলেটা ভালো…দলে নেই।’
পরদিন অরবিন্দ আর তার মামাতো ভাইকে ডাকিয়ে এনে প্যান্ডেলে কান ধরে ওঠ—বস করানো হয়। তার দু—দিন পর ওরা দু—জন অনন্তকে সন্ধ্যার সময় ধরেছিল গলির মুখে।
‘তুই বলে দিলি কেন?’
‘না বলিনি।’
‘বলিসনি?’
অরবিন্দ তার পেটে এক ঘুসি মারল। সে পেট চেপে ধরে কুঁজো হতেই, ওরা দু—জনে এলোপাতাড়ি ঘুসি চালাল তার বুকে—পিঠে—মাথায়। সে দু—হাত তুলে যতটা সম্ভব আটকাতে চেষ্টা করে। একবারও পালটা আঘাত করার চেষ্টা করেনি বা পালাতে চায়নি।
‘ভালো ছেলে সাজা হচ্ছে? বলিসনি…তুই বলিসনি?’
‘না, আমি বলিনি।’
ওরা আবার ঘুসি চালিয়েছিল। সেইসময় পাড়ারই একজন দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে ধমক দেয়। ওরা দু—জন সরে যাবার সময় শাসায়, ‘আচ্ছা, পরে আবার ধরব, যাবি কোথায়?’
অরবিন্দ আর তাকে কিছু বলেনি। তার ঠোঁটের কোণের রক্ত দেখে মা ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সে কারণটা বলেনি।
‘হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছি।’
‘দেখে চলবি তো?’
অনন্ত তখন হেসেছিল। মানসিক আনন্দের প্রতিচ্ছায়ার মতো এমনই অস্পষ্ট যে লক্ষই করা যায় না হাসিটা। সেইদিন থেকে তার হৃদয়ের অন্তস্থলে দ্রুত একটা কী যেন পরিবর্তন ঘটে গেছল। পাড়ার বা স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে সে আর মিশত না। স্কুল থেকে ছেলেরা ছোটো ছোটো দলে বাড়ি ফিরত। সে ফিরত একা। যা তার চোখে পড়ত, বাসে ঝুলন্ত মানুষ, বৃষ্টি, বারান্দায় ঝোলানো খাঁচায় পাখি, নর্দমার নোংরা জল সব দেখত।
‘ভালো ছেলে’। সেদিন পুজো প্যান্ডেলে কে যেন বলেছিল। কিন্তু সে ‘ভালো ছেলে’ কেন? অরবিন্দের মতো সে পয়সা চুরি করতে পারেনি। সততার জন্য জন্য নয়, আসলে তার ইচ্ছা হয়নি কিংবা সাহসে কুলোয়নি বলেই।
অরবিন্দই স্কুলে তার সম্পর্কে চাউর করে দেয়—ভালো ছেলে। তার মতো আরও অনেকে তখন বলতে শুরু করে। সে শুধু হাসত আর সেখান থেকে সরে যেত।
‘অনন্ত সাধু হয়ে যাবে। বাজি ধরে বলছি।’
ক্লাসে একদিন ছেলেরা তার পিছনে লেগেছিল। সে মুখে হাসি ফুটিয়ে শুধু শুনে গেছল। হয়তো তার হাসিটা খাঁটি ছিল না কিন্তু শান্ত নিরাসক্ত একটা ভাব তাতে ছিল।
‘ওকে চড় মেরে দেখ, কিছছু বলবে না।’
একজন তার গালে আলতো করে চড় মারে। সে তখনও হাসছিল।
অমরও তাকে ‘ভালো ছেলে’ বলল, কিন্তু সত্যিই কি সে তাই? সে ভিতু আর মুখচোরা বলেই কি সবার আগে নিরাপদ হবার জন্য ভালো ছেলে সাজে?
ঘর থেকে বেরিয়ে সে দেখল মা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে একদৃষ্টে উঠানের দিকে তাকিয়ে।
অনন্ত অপরাধীর মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কলতলায় গেল মুখ ধুতে। ফিরে এসে দেখল মা একইভাবে বসে।
‘আমি কি অন্যায় করেছি?’
মা একবার মুখ তুলে তাকাল। অনন্তের মনে হল সেই চাহনিতে যেন বলা হয়েছে—ন্যায়—অন্যায় বিচার করে কী লাভ?
‘ও চলেই যেত, আজ নয়তো কাল।’
কয়েক ঘণ্টা পর অনন্ত চায়ের দোকানটার সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখল সেই ছোকরা, পরে জেনেছে ওর নাম রমেন, বেঞ্চে বসে সিগারেট খাচ্ছে, হাতে চায়ের গ্লাস ভ্রূ কুঁচকে বিরক্তমুখে লোক—চলাচল দেখছে। দোকানে গৌরী নেই। এই নিয়ে গত এগারো দিন গৌরী অনুপস্থিত।
দুপুরে একটা ছোটো ছেলেকে সে দোকানে দেখল। মুখের আদল আর গায়ের রং থেকে তার মনে হল বোধ হয় গৌরীর ভাই। তবু নিশ্চিত হবার জন্য সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাকে আগে দেখিনি তো, তোমাদের দোকান?’
‘হ্যাঁ।’
‘গৌরী কে হয়?’
‘দিদি।’
‘ও আজ এল না যে?’
‘দিদির বিয়ে।’
অনন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কবে?’
অপরিচিতের সঙ্গে ছেলেটি যেন এই বিষয়ে কথা বলায় অনিচ্ছুক। অনন্ত আর কৌতূহল দেখাল না। তার মনে হল, রমেনের সঙ্গে নয়, অন্য কোথাও গৌরীর বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। তা যদি হয় তা হলে ভালোই। রমেনকে তার ধাপ্পাবাজ ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। তবে সে বিষণ্ণবোধ করল, গৌরীকে আর দেখতে পাবে না। এইরকম বিষণ্ণতা অমর সম্পর্কে তার হয়নি। এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত অন্যটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বার্থ। অমর রোজগার করে তার বোঝা হালকা করে দেবে এ ছাড়া আর কোনো প্রত্যাশা ওর কাছে নেই।
চার
দু—দিন পর বৃষ্টি হচ্ছিল সন্ধ্যাবেলায়। অনন্ত আমহার্স্ট স্ট্রিটে একটা গাড়ি বারান্দার নীচে দাঁড়িয়েছিল ভিড়ের একধারে। রাস্তার কিনারে জল জমে গেছে। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে জলে ফুটপাথ, রাস্তা এবার ডুবে যাবে। মাঝে মাঝে দমকা বাতাস বৃষ্টির ছাট আসছে আর মানুষগুলো পিছিয়ে এসে জমাট হচ্ছে। রাস্তায় আলো কম, গাড়িও কম, লোকজন নেই বললেই চলে। স্টপে বাস এসে দাঁড়ালে এখান ওখান থেকে ছুটে এসে লোক উঠছে।
