এই সময় স্বপ্ন দেখার মধ্যেই নড়েচড়ে উঠল রোহিণী। গলগল ঘামে তার বুক পিঠ ভিজে গেছে। মুখ দিয়ে ক্ষীণ একটা ভীত স্বর বেরোচ্ছে। অস্ফুটে সে কিছু যেন বলে উঠল। লোকটি তখন তার লাল পাঞ্জা বাড়িয়ে বেড়ালটিকে ধরল। মুঠিটা ক্রমশ ছোটো হতে লাগল গলায়। ধীরে ধীরে নিস্পন্দ হয়ে গেল বিড়ালটি। লোকটি তখন সেটিকে নামিয়ে রাখল মেঝেয়। কাটা মাথা দুটি কুড়িয়ে এনে রাখল মৃত বিড়ালটির পাশে। সারাক্ষণ ঘরে একটুও শব্দ হয়নি। কিন্তু স্বপ্নটি দেখতে দেখতে রোহিণী এবার ‘মাগো’ বলে চেঁচিয়ে, উঠে বসল। কাটা মাথা দুটির মুখ এবং বেড়ালটির মুখ, একজনেরই। রোহিণীর। তার নিজেরই।
নিজের ঘাড়ে হাত রেখে সে কুঁজো হয়ে বিছানায় বসে থাকল অনেকক্ষণ। জানালা দিয়ে ভোরের কমলা রোদ মেঝেয় এসে পড়েছে। সে মেঝের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
স্বপ্নটা তার মনকে বসিয়ে দিয়ে গেল অনিশ্চিত একটা জঙ্গলের মধ্যে। নানান কাঁটাঝোপ আর ঘন গুল্ম। এর মাঝে কোথাও একটা বাঘ লুকিয়ে আছে, এমন একটা সন্দেহ সারা সকাল ধরে মাঝে মাঝেই তার মনে উঁকি দিয়েছে। গৌরীর মা কাজে এল। খাঁটি পেশাদারের মতো সে দ্রুত হাতে কাজ করতে লাগল বাড়তি কোনো কথা না বলে। রোহিণী তাতে অবাক হল। সে আশা করেছিল, জামাইবাবু সম্পর্কে গতকালের অপ্রতিভতা কাটাতে, একঝুড়ি না হোক, একথলি কৌতূহল নিয়ে গৌরীর মা আজ আসবে। কিন্তু তার বদলে মুখ এত গম্ভীর কেন!
‘গৌরীর মা, আর একজন ভাত খাবে। তুমি দোকান থেকে—’।
রোহিণী কথা শেষ হবার আগেই গৌরীর মা উদাসীন স্বরে বলে উঠল, ‘আমার এখন দু—ঘরের কাজ বাকি রয়েছে। আমি যেতে পারব না।’
রোহিণী ঘড়ি দেখল। খবরের কাগজ খুলে খাবার টেবিলে বসে, পড়তে পড়তে আড়চোখে গৌরীর মা—কে মাঝে মাঝে লক্ষ করে গেল। বাঘটা বোধ হয় উঁকি দিচ্ছে। একটা অস্বস্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে মনের মধ্যে। কাজ শেষ করে, ‘যাচ্ছি’ বলে যখন গৌরীর মা দরজার দিকে এগিয়েছে, তখন রোহিণী বলল, ‘হয়েছে কী তোমার, এত গম্ভীর কেন?’
থেমে ইতস্তত করে গৌরীর মা বলল, ‘দ্যাখো বাপু, আমি নয় বোকাসোকা মানুষ, ভুলটুল করতেই পারি। কিন্তু তোমরা তো বইটই পড়া, শিক্ষিত ভদ্দর নোক। বিয়ে না করে পুরুষমানুষের সঙ্গে রাত্তির কাটানো, এটা কেমন কথা? তোমাদের নয় বদনামের ভয় নেই, কিন্তু আমাদের তো আছে। সোয়ামি নিরুদ্দেশ, বেঁচে আছে কী মরে গেছে জানো না, এখনও সধবাই, আর কিনা এর মধ্যে এইসব কাণ্ড শুরু করে দিয়েছ? এমন ঘরে বাপু আর আমি কাজ কত্তে পারব না।’ প্রায় এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে সে দরজা খুলে বেরিয়ে, দড়াম করে পাল্লাটা বন্ধ করে দিল।
শব্দটা যেন ঠাস করে, রোহিণীর গালে চড় বসাল। গুম হয়ে সে তাকিয়ে থাকল খবরের কাগজের দিকে। একটা অক্ষরও তার মগজে ঢুকছে না। গৌরীর মা—র একটা কথা তার মাথায় দপদপ করে যাচ্ছে—এখনও সধবাই, আর কিনা এর মধ্যেই এইসব কাণ্ড শুরু করে দিয়েছ?
কিছুক্ষণ পর রোহিণী উঠল। ভেবে কোনো লাভ নেই। গৌরীর মা—র নৈতিক বোধ তারই থাক, সে কখনো আমার মতো অবস্থায় জীবন যাপন করেনি। পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলাই হচ্ছে জীবন। কে কী বলছে বা ভাবছে, তাই দিয়ে নিজেকে চালালে মানুষ কখনো কিছু করে উঠতে পারে না। আমার নিজস্ব একটা সত্তা আছে, রোহিণী বিড়বিড় করে নিজেকেই শুনিয়ে বলল, আমার ইচ্ছা অনিচ্ছায় কারোরই হস্তক্ষেপ মানব না। আমার মর্যালিটি আমার কাছে, সেখানে আমি পরিষ্কার। ব্যস। রাজেন এলে ওকে ভাতে ভাতই খেতে হবে।
তাই খেতে হল রাজেনকে। সে সাড়ে দশটায় এসে হাজির হয়। এসেই প্রথম কথা, ‘কাল যা যা খাব বলেছিলাম—’
‘তার একটাও রাঁধা সম্ভব হয়নি। দোকান বাজার আমাকেই করতে হয়, এটা খেয়াল থাকে না কেন?’ রোহিণীর ধীর গম্ভীর স্বর রাজেনকে মিইয়ে দিল।
‘কেন? গৌরীর মা?’
‘সে আমার মতো দুশ্চরিত্রার কাজ আর করবে না। আজই বলে গেল, যার সোয়ামী বেঁচে আছে কী মরে গেছে তার ঠিক নেই, সে তো এখনও সধবাই। আর কিনা এইসব কাণ্ড, অর্থাৎ রাত্রে তুমি ছিলে—এটা যেভাবেই হোক ও জেনেছে। সুতরাং চরিত্র রক্ষার জন্য তিনি রিজাইন করবেন জানিয়ে গেছেন।’
‘কিন্তু আমরা তো কোনোরকম—’
‘আহ রাজেন,’ মাছি তাড়াবার মতো করে হাতটা মুখের সামনে নেড়ে রোহিণী বলল, ‘বাদ দাও তো এসব। কাল গেছিলে?’
‘ওহ, হ্যাঁ। জীবুদার কাছে গেছিলাম, নিয়ে গেলেন সেই ভদ্রলোকের কাছে। তিনি বললেন, আগে ডিভোর্সটা করিয়ে নিতে। বিয়ের রেজিস্ট্রির ব্যাপারটা একদিনেই হয়ে যাবে, বাড়িতে বসেই তিনি করে দেবেন। দু—তিনদিনের মধ্যেই ডিভোর্স স্যুট ফাইল করা হয়ে যাবে।’
‘আর বাড়ির ব্যাপারটা?’
‘জহিরুল নিয়ে গেল ওর পাড়াতেই একটা ফ্ল্যাট দেখাতে। একতলায়, একটু ভেতরের দিকে, দু—খানা ঘর। ডাইনিং, কিচেন যা যা থাকার ঠিকই আছে। টাইলসের মেঝে, জানালা দরজার রংও ভালো, পেলমেট আছে, দেওয়াল পেইন্ট করা, কনসিলড ইলেকট্রিক্যাল ওয়ারিং। মুশকিলটা হল, ভাড়া দু—হাজার, পনেরো হাজার সেলামি দিলে ওটা দেড় হাজার।’
‘নিয়ে নাও দু—হাজারেই।’ রোহিণী বলে উঠল রাজেনের কথা শেষ হওয়ামাত্রই। ‘এখন তো উঠে যাই। তারপর আরও কমে কোথাও খুঁজে নেব। এই ফ্ল্যাটে আর একমুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে না। গঙ্গাদার অনুগ্রহ যথেষ্ট নিয়েছি, আর নয়।’
