‘কিংবা নার্সিংহোমের খোঁজে। আসি মাসিমা। কোপ্তা কিন্তু তাড়াতাড়ি চাই।’
তিনতলায় না থেমে রোহিণী চারতলায় উঠে এসে সুজাতা গুপ্তদের দরজার সামনে উদবিগ্ন হয়ে দাঁড়াল বেল বাজিয়ে।
একটু দেরি করে দরজা খুললেন হৃদয়রঞ্জন। টিভি থেকে নাটকের সংলাপ ভেসে আসছে।
‘মাসিমার খবর কী?’
‘ফোন করেছিল।’ ধীর আশ্বস্ত স্বর। ‘বহরমপুর থেকে।’
‘বহরমপুর!’ রোহিণীর চোখের উপর দিয়ে ঝলসে গেল শোভনেশের ভাঙাচোরা মুখ, কয়েকটা ন্যুড ছবি, বালিশে পিঠ দিয়ে আধবসা অবস্থায় মাথাটা পিছনে হেলিয়ে চাদর ঢাকা এক আবছা রমণী।
‘কেন বহরমপুরে কেন গেছেন?’
‘ওখানে ওর মাসতুতো এক দাদার বাড়ি, খাগড়ায়। টেলিফোন করেছিল তুষারবাবুদের ঘরে। আপনার সঙ্গেই কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু আপনি তো বিকেলে তখন ছিলেন না, তাই ওরা আমাকেই ডেকে দেয়। বলল, কী একটা জরুরি কথা আপনাকে জানাতে চায়। আমি বললাম, আমাকে বলো, আমি জানিয়ে দেব। কিন্তু বলল, না, শুধু রোহিণীকেই বলব।’
‘আর কিছু বললেন?’ রোহিণী অস্বস্তি আর ভয় নিয়ে তাকিয়ে রইল অভিব্যক্তিহীন হৃদয়রঞ্জনের মুখের দিকে।
‘না। কালকেই ফিরে আসছে, শুধু এইটুকু বলেই ফোন রেখে দিল।’
‘কাল যখন? ট্রেনে না বাসে আসবেন?’
‘জানি না।’
রোহিণী ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। না বলে—কয়ে হঠাৎ মাসতুতো দাদার বাড়ি বেড়াতে এই বয়সে যান না। নিশ্চয় শোভনেশকে দেখতেই গেছেন। কিন্তু কী উদ্দেশ্য? মামলা আবার শুরু করার জন্য কথাবার্তা বলতে? কিন্তু উনি তো জানেন, শোভনেশ বহরমপুর হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেছে। তাহলে আবার ওখানে যাওয়া কেন? কাল ওনার ফিরে না আসা পর্যন্ত উত্তরটার জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হবে।
দরজায় চাবি ঢোকাতে গিয়ে গর্তটা দু—বারের চেষ্টায় সে খুঁজে পেল। হাতটা কাঁপছিল। রোহিণীর মনে পড়ল, মীনারও এমন হয়েছিল টেলিফোন ডায়াল করার সময়।
এগারো
রোহিণী স্বপ্ন দেখছিল।
ইংরেজি কথোপকথন শোনানোর জন্য দুই মেয়েকে বাবা মাঝে মাঝে ইংরেজি ফিল্ম দেখাতে নিয়ে যেতেন। টার্জান, চ্যাপলিন, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, লরেল হার্ডির পর রোহিণীর ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় হিচককে প্রোমোশন ঘটে। তখন ‘স্পেলবাউন্ড’ দেখেছিল। তাতে একটা উদ্ভট স্বপ্নের দৃশ্য ছিল, যার মাথামুণ্ডু সে একদম বোঝেনি। সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে সে স্বপ্নটা সম্পর্কে প্রশ্ন করতেই বাবা বিব্রত হয়ে বলেন, ‘ওটা হল অবচেতনের ব্যাপার। মানুষের চেতনার তলদেশে অনেক কিছু জমা হয়ে থাকে। কখনো—সখনো সেগুলো অদ্ভুত চেহারা নিয়ে উপরে ভেসে ওঠে। এই দৃশ্যটার পরিকল্পনা করেছেন সালভাদোর দালি, খুব বড়ো একজন আর্টিস্ট। উনি এই ধরনের ছবি এঁকে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন। আরও বড়ো হও, তখন চেতন—অবচেতন সম্পর্কে আরও জানতে, বুঝতে পারবে।’
তারপর রোহিণী বড়ো হয়েছে বটে, কিন্তু অবচেতন নিয়ে কখনো জানা বা বোঝার জন্য মাথা ঘামায়নি। এই ধরনের স্বপ্নের বিবরণ গল্পে—উপন্যাসে পড়েছে। কিন্তু নিজের জীবনে সে এই প্রথম দেখল।
একটা চৌকো ঘর, ঘরের গরাদবিহীন জানালাগুলো বন্ধ, শুধু একদিকের একটার পাল্লা আধখোলা। ব্যাটারি ফুরনো টর্চের মতো ম্লান আলো বাইরে থেকে ঘরে এসে পড়েছে। তাইতে দেখা যাচ্ছে, চৌকো আকারের সাদা আর কালো মার্বেলের মেঝে। একটা খাট ঘরের দেওয়াল ঘেঁসে। তাতে বালিশে পিঠ দিয়ে আধবসা অবস্থায় একটা মূর্তি। তার মাথাটা পিছনে হেলানো, মুখটা সিলিংয়ের দিকে তোলা, বাঁ হাতটা ঝুলছে খাট থেকে, ডান হাঁটু মুড়ে উঁচু করা, শরীর একটা চাদরে ঢাকা। মূর্তিটা আবছা অন্ধকারে নিথর হয়ে রয়েছে। ঘরটায় গুমোট হয়ে জমে রয়েছে নৈঃশব্দ্য। ঘরে ঢুকল এক রমণী। অন্ধকারে সে দেহ থেকে বসন খুলতে লাগল। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে, মেঝেয় যেখানে টর্চের মতো আলো, তার উপর গিয়ে দাঁড়াল। আলোটা ক্রমশ ম্যাজেন্টা রঙে পরিণত হল। রমণীর মুখ নেই। তার বদলে সেখানে সাদা রং করা একটা ক্যানভাসের টুকরো পিন দিয়ে আঁটা। রমণী মেঝেয় উবু হয়ে বসল। দুই হাঁটু জোড়া করে সামনে ঝুঁকে, দু—হাতে দুটি পা জড়িয়ে ধরল। মুখটি রাখল হাঁটুতে। স্তনদ্বয় ঊরুতে চেপে রাখা। টানা ধনুকের মতো বেঁকে রয়েছে মাথা থেকে নিতম্ব পর্যন্ত পৃষ্ঠদেশ। রমণী ধীরে ধীরে জমাট বেঁধে পাথরের মতো কঠিন আকার নিল। এই সময় সেই ঘরে ঢুকল একটি কালো বিড়াল। একাধারে থাক দিয়ে রাখা তোরঙ্গের উপর বিড়ালটি লাফিয়ে উঠল। দুই থাবা সামনে রেখে সে সামনে তাকিয়ে বসে থাকল। ধীরে ধীরে সে জমাট হয়ে গেল। এবার ঘরে ঢুকল একটি দীর্ঘকায় পুরুষ। তার চুল কাঁচাপাকা, ঝাঁকড়া, ফাঁপানো। দক্ষযজ্ঞের শিবের মতো। পুরু জুলপিতে গালের অর্ধেক পর্যন্ত ঢাকা। সরু সরু আঙুল, চওড়া কবজি। চোখ দুটি কোটরে ঢোকানো জ্বলজ্বলে। ঘন ভুরুর চুলগুলিও ধূসর। লোকটির হাতে বলির খড়্গ। সে সোজা খাটের কাছে গিয়ে খড়্গ দিয়ে মূর্তিটির ঘাড়ে কোপ বসাল। মাথাটা ধড় থেকে ছিটকে মেঝেয় পড়ল। এরপর সে কোপ বসাল মেঝেয় বসা নগ্ন রমণীর ঘাড়ে। তার মাথাটা ছিটকে দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে ঘাড় থেকে। মেঝের সাদা কালো রং ক্রমশ লাল হয়ে গেল। লোকটি এবার উন্মত্তের মতো ধেয়ে গেল বিড়ালটার দিকে। প্রাণভয়ে বিড়ালটি লাফিয়ে মেঝেয় নামল। পালাবার জন্য দরজা খুঁজছে, কিন্তু রক্তাক্ত পাথরের মেঝেয় পিছলে যাচ্ছে তার থাবা। নখ দিয়ে হাঁচোড়—পাঁচোড় করছে এগোবার জন্য কিন্তু এগোতে পারছে না। তাকে ধরার জন্য লোকটি পা বাড়াতেই পিছলে পড়ল। তখন সে হামা দিয়ে এগোতে লাগল বিড়ালটির দিকে।
