‘কী বললেন! কালকেই যাবে? বাসুদেবপুর? কোথায় সেটা?’
‘বনগাঁর দিকে। আমি আর কিছু জানি না।’
‘কাল বারোটায়, এয়ারপোর্ট হোটেলের সামনে?’
‘হ্যাঁ।’
মীনা প্রায় লাফিয়েই টেলিফোনের কাছে গেল। অধৈর্য হয়ে ডায়াল করতে গিয়ে দু—বার আঙুল পড়ল ভুল নাম্বারে। অবশেষে যথাযথ নাম্বারে যোগাযোগ ঘটল। উত্তেজনায় টসটস করছে তার মুখ।
‘হ্যালো, কে, শঙ্করবাবু?…আমি মীনা চ্যাটার্জি বলছি। বাচ্চচুদা আছে কি?…হ্যাঁ হ্যাঁ, ওকে একবার দিন।’
ফোন ধরে অপেক্ষা করতে করতে আঙুল দিয়ে কপালের উপর থেকে চুল সরাচ্ছে মীনা। রোহিণী তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। কী যে ভাবছে মীনা। চোখ দুটো সরু হয়ে কুটিল, আবার বিস্ফারিত হয়ে ক্রুদ্ধ, পরক্ষণেই চোখ বন্ধ করে আবেগ দমনে ব্যস্ত। ওর মনের মধ্যে কীসের ওঠাপড়া চলছে, রোহিণী তার খানিকটা আন্দাজ করতে পারছে।
‘হ্যালো, হ্যাঁ, বাচ্চচুদা? আমি মীনা, কী হল? সেদিন যে বললাম, পরশুর মধ্যে আপনাদের ডিসিশন জানিয়ে দেবেন…হ্যাঁ? আর বাড়াতে পারবে না? কিন্তু…হ্যাঁ হ্যাঁ তা তো বুঝলাম, কিন্তু স্টোরি এমনই হ্যাকনিড, বস্তাপচা যে, ধেই ধেই নেচে আর ভেউ ভেউ কেঁদেও তিনদিনের বেশি দর্শক, পারব না। হ্যাঁ, বলুন শুনছি…।’
রোহিণী লক্ষ করল মীনা কিছু শুনছে না, শুধু কানের কাছে ফোনটা ধরে আছে। প্রথম যখন মীনার সঙ্গে সে দেখা করে, তখন ঘরে তিনটি লোক বসেছিল, বোধ হয় কোনো ফিল্মে অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তাদের একজনকে, বাচ্চচুদা, বলে মীনা ডাকে। সম্ভবত তার সঙ্গেই মীনা কথা বলছে।
‘বেশ তাহলে রাজি। কিন্তু আমার একটা কাজ করে দিন! সামান্য কাজ, আর তা করে দেওয়ার জন্য আপনার হাতে সেরকম লোকও আছে, আমি জানি। …না না অত বিনয় করতে হবে না বাচ্চচুদা, খরচ যা করতে হয় আমিই করব, আপনি শুধু ব্যবস্থাটা করে দিন। ফোনে সব কথা তো বলতে পারব না, অসুবিধে আছে, হাতে সময়ও খুব কম, আপনি এখুনি চলে আসুন, এখুনি। …আভাস মানে এইটুকুই বলতে পারি, কলকাতার বাইরে গ্রামের দিকে কাল একটা ছোটো ব্যাপার, কী বলে অ্যাকশন, করে আসতে হবে। …একজনের বাড়িতে। …বাড়িটা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে আসতে হবে।’
রোহিণী দেখল, মীনার চোখমুখ হঠাৎ কীরকম বদলে গেল। শান্ত, পরিহাসের ভঙ্গিটা রূপান্তরিত হয়েছে তেল কমে যাওয়া প্রদীপের দপদপে শিখার মতো। রক্ত জমে গিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মুখটা।
‘হ্যাঁ, বললাম তো, ওই টাকাতেই আমি রাজি, অবশ্য যদি আমার এই কাজটা…বেশ, এখুনি আসছেন?…আচ্ছা।’
ফোন রেখে মীনা হাসল রোহিণীর দিকে তাকিয়ে। সিরসির করে উঠল রোহিণীর সর্বাঙ্গ। মীনাকে এখন এক দানবী মনে হচ্ছে।
‘আমি এখন যাই।’
‘হ্যাঁ, আসুন। কাল যদি এমন সময় আসেন বা ফোন করেন, তাহলে ভালো একটা খবর আপনাকে দিতে পারব। গায়ে হাত দেওয়ার বদলা মীনা চ্যাটার্জি কীভাবে নেয়, সেটাই আপনাকে কাল জানাব।’ কথাটা বলেই মীনা দু—হাত বাড়িয়ে রোহিণীর কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি নিয়ে, বলল, ‘ধন্যবাদ, অজস্র ধন্যবাদ, খবরটা আমায় দেওয়ার জন্য।’
মীনার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার সময় রোহিণীর মনে হল, বাসুদেবপুরে ছবিগুলো আছে, এই খবরটা মীনাকে জানিয়ে বোধ হয় সে ভালো কাজ করেনি। কিন্তু টিউব টিপে পেস্ট বার করে ফেলে আর তা টিউবে ঢোকানো তো যায় না। বাস স্টপে দাঁড়িয়ে থাকার সময় সে ভাবল, গঙ্গাদাকে ফোন করে যদি সে বলে দেয়, কাল একটা সর্বনাশ ঘনিয়ে আসবে বাসুদেবপুরে, তাহলে নিশ্চয় সেটা মানবিক কাজ হবে, কিন্তু—। এই কিন্তুটাকে নিয়ে সে সল্টলেক পর্যন্ত সারাটা পথ নিজেই নিজেকে নাস্তানাবুদ করল। তার বাস্তববোধ এত ভালো ড্রিবল করল কিন্তুটাকে নিয়ে যে, রোহিণীর মানবিকতার ডিফেন্স তছনছ হয়ে গেল।
যা হবার হোক, এইরকম একটা মানবিক অবস্থা নিয়ে সে কুন্তীদের ফ্ল্যাট পেরিয়ে তিনতলার সিঁড়িতে পা রেখেও ফিরে এসে বেল বাজাল।
দরজা খুললেন মাসিমা। রোহিণীকে দেখে একগাল হেসে বললেন, ‘এঁচোড়ের কোপ্তা তোমার নাকি খুব ভালো লেগেছিল? কই আমাকে একবারও তো সেকথা বললে না?’
‘আপনার হাতের রান্না ভালো হয়েছে, সেকথা আবার বলার অপেক্ষা রাখে নাকি! তাহলে তো রসগোল্লা খেয়েও বলতে হয়, আহা কী মিষ্টি লাগল!’
পুলকিত মাসিমা ঝটতি প্রতিশ্রুতি দিলেন, ‘আর একদিন করে খাওয়াব তোমায়।’
‘কুন্তী কোথায় মাসীমা?’
‘আর বোল না সে মেয়ের কথা, পল্টু তো গৌহাটি থেকে আজ দুপুরেই ফিরে এসেছে।’
‘আরও দু—দিন পরে ফেরার কথা না?’
‘আমি তো তাই জানি!’ মাসিমা দু—ধারে তাকিয়ে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘থাকতে পারে না, বুঝলে, বউকে ছেড়ে দু—দিনের বেশি থাকতে পারে না! কাজকম্মো ফেলেই পালিয়ে এসেছে।’
‘কুন্তীও খুব ভালোবাসে।’
‘ছাই বাসে! পল্টু ফেরামাত্রই শুরু হয়ে গেল ঝগড়া। তারপর মারামারি। কী বলব তোমায় লজ্জার কথা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পল্টুটা গাধার মতো মার খেল! ওর অপরাধ, কেন ওকে নার্সিংহোমে ভরতি করাচ্ছে না। আচ্ছা তুমি বলো, জ্বর নেই জারি নেই, থ্রম্বসিস হয়নি, অম্বল হয়নি, একটা ফোঁড়াও হয়নি, এমন একটা মানুষকে কী নার্সিংহোমে দেয় কেউ?’
‘মারামারিতে কী রেজাল্ট হল মাসিমা?’
‘কে জানে। দুটোতে মিলে তো বিকেলবেলায় বেরোলো, সিনেমা টিনেমায় হয়তো গেছে।’
