রোহিণী হাত পাতল। পার্সটা বাড়িয়ে দিল রাজেন। চোখ বুজে পার্সে আঙুল ঢুকিয়ে কয়েকটা নোট তুলে রোহিণী ঝুলিতে ফেলে দিয়ে বলল, ‘খেলা থেকে রিটায়ার করলে খাওয়া কমাতে হয়, নইলে চেহারা বেঢপ হয়ে যাবে, এটা খেয়াল রেখো।’
‘কিন্তু তুমি যে কাল বললে খেলা কখনো ফুরোয় না। শুধু এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে সরে যায়। অন্য মাঠে খেললে কী খাওয়া বন্ধ করতে হবে? আমি তো ভাবছিলাম, চাকা চাকা করে মুলো কেটে টক আর বোয়াল মাছ, আলু, হিংয়ের বড়ি, বেগুন, সিম দিয়ে—।’
রোহিণী ততক্ষণে এগিয়ে গেছে বাড়ির ফটকের দিকে।
বেল বাজাতে মীনা চ্যাটার্জির ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দাঁড়াল যে লোকটি, তাকে দেখেই রোহিণীর মনে পড়ল, সকালে গঙ্গাদার সঙ্গে আসা লোক দুটোর চেহারা। অনেকটা একই ধাঁচের। ত্রিশ—পঁয়ত্রিশের মধ্যে, ছিপছিপে, বুক খোলা কালো স্পোর্টস শার্ট, জীনস, বেল্ট, এলোমেলো চুল, চোখে অমার্জিত ধূর্ত চাহনি, হাতে লোহার বালা। ফিল্মের পোস্টারে অমিতাভ বচ্চচন বা মিঠুন চক্রবর্তীকে যেভাবে দেখা যায়, প্রায় সেই রকমেরই।
‘মিস চ্যাটার্জি আছেন?’
‘আপনার নাম? কী দরকার?’
লোকটির বাচনভঙ্গি ও উচ্চচারণ থেকেই রোহিণী বুঝে গেল, মীনা নিরাপদ থাকার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছেন।
‘আমার নাম রোহিণী, ওর পরিচিতই আমি।’
লোকটি তার মুখের উপর চাহনি রাখল কিছুক্ষণ। ঝোলাটার দিকে তাকাল, এবং অবশ্যই গলা থেকে চটি পর্যন্ত বার দুই। রোহিণী ভেবে পেল না, তাকে বিদায় নিতে না অপেক্ষা করতে হবে!
এক মিনিট পরেই দরজা খুলল। ‘ভেতরে যান।’
লোকটির গা ঘেঁষেই রোহিণীকে ঢুকতে হল। ভিতরের ঘরের দরজার পর্দা তুলে মীনা দাঁড়িয়ে। কপালে স্টিকিং প্লাস্টার। রোহিণী বিস্ময় দেখাল ভ্রূ তুলে।
‘আসুন। এই ঘরেই বসি।’
শোবার ঘরে ঢুকেই রোহিণী খুঁজল ছবিটাকে। নেই।
‘কী হয়েছে আপনার কপালে?’ খাটের ধারে বসে বিস্মিত রোহিণীর প্রথম প্রশ্ন।
‘কপাল ফেটেছে। মিসেস সেনগুপ্ত, আমার কপালটাই এইরকম কিছুই আর আস্ত থাকে না। ফাটা কপাল নিয়েই আমাকে দিন কাটাতে হবে।’ মীনা নাটকের সংলাপ বলার ঢঙে কথাগুলো বলে এবং বলতে পারার কৃতিত্বে হাসল।
‘পড়ে গেছিলেন? বাথরুমে? আর একটু নীচে হলেই তো চোখটা যেত! রাবারের স্লিপার পরেছিলেন নাকি?’
মীনা মাথা নাড়ল। মুখ ঘুরিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকাল, যেখানে ছবিটা টাঙানো থাকত। রোহিণীকেও মুখ তুলে দেওয়ালের দিকে তাকাতে দেখে ম্লান হেসে মীনা বলল, ‘দেখেছেন, ছবিটা আর নেই। গঙ্গাপ্রসাদবাবুর লোকেরা এসে আমাকে মেরে ছবিটা নিয়ে চলে গেছে।’
‘সে কী!’ রোহিণী দাঁড়িয়ে উঠল। ‘এ কী বলছেন!…অসম্ভব, এ অসম্ভব, অবিশ্বাস্য!’
মীনা জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে। ঠোঁটে কষ মোচড়ান।
‘একটা ছবির জন্য কোনো মানুষ এমন কাজ করতে পারে?’ রোহিণী প্রশ্নটা করল মীনাকে কথা বলাবার জন্য।
‘পারে কি না পারে, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। হ্যাঁ, একটা ছবির জন্যই। আপনাকে যখন ফোন করছিলাম, তখনই লোকগুলো এসেছিল।’
‘হ্যাঁ, হঠাৎ তখন লাইনটা কেটে গেল দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম। তাহলে ব্যাপারটা তখনই ঘটেছিল!’
‘কিন্তু গঙ্গা ব্যানার্জিকে আমি সহজে ছাড়ব না। আমার ক্ষমতা কতটা, সেটা ওকে দেখাব। আমি সুযোগ পাই একবার—।’ দাঁতে দাঁত চেপে মীনা দু—হাত মুঠো করল। এভাবে অপমান করবে? কতকগুলো গুন্ডাকে পাঠাবে আমার গায়ে হাত তোলার জন্য, আর আমি সেটা মেনে নেব?’ হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো সে কাঁপতে শুরু করল।
এখন কোনো কথা বললে ওঁর মাথায় ঢুকবে না। মীনাকে সুস্থির হবার জন্য সময় দিয়ে রোহিণী বলল, ‘ছবিটাই চলে গেল। একটা মাস্টারপিস! …পুলিশে জানিয়েছেন?’
‘দরকার নেই জানাবার। ওটা আমি খুঁজে বার করবই। জীবনের শেষ দিন খুঁজব, আমার শেষ কর্পদকও আমি খরচ করব। আর ওই লোকটাকে—।’
রোহিণীর মনে হল চকমকির ঘষা থেকে ছিটকে বেরোনো ফুলকির মতো কথাগুলো মীনার দাঁত থেকে বেরিয়ে এল। প্রতিশোধ নেবার বাসনায় ওঁর সুন্দর মুখটা দুমড়ে মুচড়ে বীভৎস দেখাচ্ছে।
‘ছবিটা কোথায় পাবেন বলে আপনার ধারণা?’
মীনা হতাশভাবে মাথা নাড়ল। ‘জানি না। তবে ওর অফিসে বা বেলেঘাটার প্রেসে নেই। আর বাড়িতে তো রাখবেই না।’
‘শুধু তো একটা ছবি নয়, আরও অনেক ছবিই রয়েছে শোভনেশের। সেগুলোই বা কোথায়?’ রোহিণী তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকাল প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য।
মীনার বসার ভঙ্গিটা বদলাচ্ছে। চোখে চিন্তার ছায়া পড়ল। অস্ফুটে বলল, ‘সব ছবি পুড়িয়ে ফেলা দরকার।’
‘পুড়িয়ে ফেলা!’ রোহিণী হাঁ করে ফেলল কথাটা শুনে।
‘শোভনকাকা চার বছর আগে আমাকে তাই বলেছিলেন। উনি নতুন মানুষ হতে চান, বলেছিলেন, যা এঁকেছি সব বাজে, নষ্ট মনের কাজ। জানেন, সেদিনই আমি প্রতিজ্ঞা করি, ওঁর মনের ইচ্ছা আমি পূরণ করব। ওঁকে শান্তি দেব।’ মীনা টানা কথা বলে মুখ নামিয়ে রাখল।
‘আমার একজন পরিচিত লোক, শোভনেশের ছবি কেনার জন্য গঙ্গা ব্যানার্জির কাছে গেছিল। উনি বলেছেন, ছবিগুলো কলকাতায় নেই, বাইরে আছে।’
‘কোথায়, কোথায় আছে?’ বিদ্যুৎ ছুঁয়ে ফেলা প্রাণীর মতো মীনার মুখ ছিটকে উঠল।
‘কাল দুপুর বারোটায় এয়ারপোর্ট হোটেলের সামনে লোকটিকে অপেক্ষা করতে বলেছেন। সেখানে ওঁরা মিট করবেন। তারপর রওনা হবেন বাসুদেবপুর বলে একটা গ্রামের দিকে। সেখানেই গঙ্গা ব্যানার্জির বাড়িতে ছবিগুলো আছে।’ রোহিণী ধীরে ধীরে কথাগুলো বলল, যাতে মীনার বুঝতে অসুবিধা না হয়।
