‘দিয়েছি। উনি জেনে গেছেন, কুন্তী ওই বাড়িতেই থাকে। ক্যাসেটটা পেলে উৎপাত করবেন না কথা দিতে আমি ওঁর হাতে দিলাম।’
‘কথা রাখবে তো?’
‘মনে হয় রাখবেন। গঙ্গাদা জাত—ভিলেন বলতে যা বোঝায়, সেরকম ঠিক নন। ওঁর অ্যাম্বিশন এখন ব্যবসা করে বড়ো হবার দিকে। ছ—সাত বছর আগে এক্সপ্যান্ড করার জন্য খুব বেশি ক্যাপিটাল ওঁর ছিল না। কয়েক লাখ টাকার জন্য তখন যে কাজ করেছিলেন, ওই পরিমাণ টাকার জন্য এখন হয়তো আর বন্ধুকে জেলে বা ফাঁসিতে পাঠাবার কথা ভাববেন না। অতীত কীর্তিকলাপ ফাঁস হয়ে গেলে বিপদে পড়তে পারেন ভেবেই গত কয়েকদিনে এইসব কাণ্ড করেছেন।’
‘ওর সম্পর্কে আমার রিডিংও তাই। শোভনেশ সেনগুপ্ত এখন ওর গলার কাঁটা, সেটা তুলে ফেলার জন্য একটা বক খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমার কী মনে হচ্ছে, জান?’
ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে ট্রাম আর দোতলা বাসের মাঝে প্রায় পিষে যাবার মতো অবস্থায় হিলম্যান জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে। রাজেন শঙ্কিত চোখে বাঁদিকের বাসটার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘গঙ্গা ব্যানার্জি এখন সেনগুপ্তকে পেলেই খুন করবে। ওঁকে সরিয়ে দিতে পারলেই ব্যানার্জির টিকি আর কেউ ছুঁতে পারবে না।’
বাঁদিকের বাসটা ঘোঁত ঘোঁত করে এগিয়ে গেল। রাজেন ডানদিকের ট্রামের থেকে এক হাত সরিয়ে আনল গাড়িকে।
‘আমারও রীডিং তাই।’ রোহিণীর মৃদু স্বরে বিষণ্ণতার ছোঁয়া লাগল। রাজেনের কানে তা ধরা পড়ল। ‘গঙ্গাদা বললেন, শোভনেশের আর বেঁচে থাকার দরকার আছে বলে তিনি মনে করেন না। ওঁর যুক্তিটা হল : পাগলের বংশ, একদিন—না—একদিন ও পাগল হয়ে যেতই। আচ্ছা রাজেন, তুমিও কি তাই মনে করো?’
‘না, মনে করি না।’ কথাটা বলেই রাজেন গাড়ি চালানোয় মন দিল।
মিনিট তিনেক পর রেড রোডের মুখ থেকে বাঁদিকে পার্ক স্ট্রিট যাবার রাস্তায় বেঁকে রাজেন মুখ খুলল, ‘কেন মনে করি না, জানতে চাও?’
রোহিণী জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত প্রতিভাবান। পাগল বলতে সাধারণত যা আমরা বুঝি, উনি সেই পর্যায়ে পড়েন না। ওঁকে আমাদের স্বাভাবিকত্বের মাপকাঠি দিয়ে মাপলে ভুল করা হবে। আমরা সাধারণ, ছাপোশা, মিডিওকার, ভীতু, নানান সংস্কারে বাঁধা কূপমণ্ডূক। পৃথিবীতে আমরাই সংখ্যায় বেশি। আমরা গাওস্কারকেই পছন্দ করি, হতে চাই ওইরকমই, কিন্তু দূর থেকে অ্যাডমায়ার করি গ্যারি সোবার্সকে। শোভনেশ সেনগুপ্তর মতো বাঁধনছেঁড়া নিয়মভাঙা লোককে আমরা ভয় পাই। এঁদের ছোঁয়া থেকে বাঁচার জন্য একটা পাঁচিল তুলে দিয়ে সেটাকে পাগল বলি। রুনি, তুমি এই পাঁচিলটা টপকাতে গিয়ে পড়ে গেছ।’
শুনতে শুনতে ক্রমশ গম্ভীর হয়ে গেল রোহিণী। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘হয়তো তাই। কিন্তু শোভনেশ পাগলই। অস্বাভাবিক। পাগলের ডেফিনিশন যাই হোক না কেন, একটা মেয়ের নিজস্ব কিছু সংজ্ঞা থাকে স্বামী সম্পর্কে। এই নিজস্ব ব্যাপারটা ঠিক বোঝানো যায় না। আমি ভুল নির্বাচন করেছিলাম।’
‘আবার সেই ভুল করতে যাচ্ছ না তো?’
রোহিণী মুখ ফিরিয়ে রাজেনের দিকে তাকাল। হাসি ছড়াল তার মুখে। ‘শোভনেশের হয়ে ওকালতি শুরু করলে কেন, কী ব্যাপার?’
‘আই অ্যাডমায়ার দ্যাট ম্যান।’
‘তাহলে বোধ হয় ভুল করতে যাচ্ছি।’
‘সর্বনাশ! তুমি কি আমাকে প্রতিভাবান ভাবলে নাকি? আরে আমার আইডল গাওস্কর!’
‘তাহলে ঠিক আছে। অবশ্য মাঝে মাঝে পাগলামির একটা স্ট্রেক তোমার মধ্যেও ঝলসায়। যাই হোক, সেটা আমি ম্যানেজ করে নেব।’
‘আমার মধ্যে পাগলামি? বলছ কী! তোমার মাথাটাও দেখছি বোধহয়—’
‘ওইভাবে জয়পুরে সেঞ্চুরি আর টেলিফোন, সুস্থ মাথায় করা যায় না।’
‘মাথাটা তো আর আমার হাতে এখন নেই।’
‘হয়েছে হয়েছে। এবার একটু দেখে চালাও তো। আর শোনো, কাল একটা ব্যাপার আছে। চণ্ডীদাস ঘোষাল নামে এক ভদ্রলোককে গঙ্গাদা কাল শোভনেশের ছবি দেখাতে নিয়ে যাবেন বাসুদেবপুরে। ওখানেই সব ছবিগুলো লুকিয়ে জমা করা আছে।’
‘তাহলে হদিশ পাওয়া গেছে!’ রাজেন সিধে হয়ে বসল।
‘কাল দুপুর বারোটায় মিট করবে এয়ারপোর্ট হোটেলের সামনে। সেখান থেকে রওনা হবে বনগাঁর দিকে। মছলন্দপুর আর গোবরডাঙার মাঝামাঝিই বোধ হয় গ্রামটা। ওদের পিছু নিয়ে কাল আমরা যাব।’
‘ব্যাপারটা থ্রিলিং হবে মনে হচ্ছে। কুন্তীকে কী—’
‘খবরদার। ওকে সঙ্গে নিলে সব গুবলেট করে দেবে। চণ্ডীদাস ঘোষালকে আমিই পাঠাচ্ছি ছবি কেনার ছলে জায়গাটা দেখে আসতে। উনিও শোভনেশের অ্যাডমায়ারার, তবে বউকে চটাতে চান না।’
‘আমিও চটাব না।’
‘হ্যাঁ, চটিয়ো না। এখন আমি মীনাকে ব্যাপারটা বলব, দেখি ও কী করে।’
হিলম্যান এসে থামল মীনা চ্যাটার্জির অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নেমে রোহিণী আর একবার মনে করিয়ে দিল, ‘কাল এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটার মধ্যে আমাকে তুলে নেবে। একটু আগে গিয়েই অপেক্ষা করব। বুড়োকে আজ বেশি খাটিয়ো না। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে ওকে ওষুধটসুধ দিয়ে, মালিশ করে চাঙ্গা করে রেখো।’
‘কিন্তু এখন যে জীবুদা আর জহিরুলের কাছে যেতে হবে। বুড়োকে একটু তো খাটাবই।’
‘আমি কী বাড়ি থেকে খেয়েদেয়ে আসব, নাকি—’
‘আমার হাতে এখন গোনাগুনতি টাকা, একস্ট্রা বাজার করার পয়সা নেই। দাও তো গোটাকতক টাকা।’
