‘আপনি তো একটা ভয়ংকর মানসিক অবস্থার মধ্যে চলে গেছেন। শোভনেশ কি বেশি পাগল ছিল আপনার থেকে?’ রোহিণী উঠে দাঁড়াল। ঝোলাটা কাঁধে তুলল।
‘এক মিনিট। ভয়ংকর মানসিক অবস্থার কথা বললে না?’ গঙ্গাপ্রসাদ মিষ্টি করে হাসলেন, ‘তাহলে একটা সাধারণ গরিব চাষার কথা বলি। উত্তরপ্রদেশের লোক, নাম গয়াসিরাম। ঝাঁসি জেলায় বাড়ি। জমিজমা সংক্রান্ত ঝগড়ায় সে নাকি একজনকে খুন করে। সেসন কোর্টে দু—বছর পর ফাঁসির হুকুম হয়, পাঁচ মাস পর এলাহাবাদ হাইকোর্ট তা বহাল রাখে, দু—বছর পর সুপ্রিম কোর্টেও তার আপিল অগ্রাহ্য হয়। ন—মাস পর ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে তার প্রাণভিক্ষা করে আবেদন জানায় গয়াসিরামের বউ। ফাঁসির হুকুম হয়েছিল দশ বছর আগে, প্রাণভিক্ষার জন্য আবেদন সাত বছর আগে!
‘রোহিণী, মানুষের প্রাণের দাম আমাদের দেশে কতটা? সেটাই জানতে চাও তো? গয়াসিরামের ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করার জন্য গত চার বছরে উত্তরপ্রদেশ গর্ভমেন্ট ২১ বার রিমাইন্ডার পাঠিয়েছে ইউনিয়ন হোম মিনিস্ট্রিতে। কিস্সু হয়নি। ডিস্ট্রিক্ট জাজ জেলে গিয়ে গয়াসিরামকে দেখে এসে আইজি প্রিজন্সকে রিপোর্ট দেন, লোকটার মানসিক অবস্থা এখন এমনই, গরাদে মাথা ঠুকে নিজেকে হত্যা করবে যেকোনো দিন। সেই রিপোর্ট ইউনিয়ন হোম মিনিস্ট্রিতে পাঠানো হয় গত বছর, কিস্সু হয়নি।
‘গয়াসিরাম গত দশ বছর ধরে ঝাঁসির জেলে আছে কীভাবে জান? দশ বর্গফুটের একটা সেল—এ। তাতে পাথরের একটা ধাপ, সেটার উপর শোয়। মাত্র এক ঘণ্টার জন্য তাকে সেল থেকে বের করে হাঁটতে দেওয়া হয়। বাকি তেইশ ঘণ্টা সে থাকে দশ বর্গফুটের মধ্যে…দশ বছর ধরে এভাবেই সে রয়েছে, এখনও। কল্পনা করতে পারো রোহিণী? বাইরের কেউ গেলে গয়াসিরাম তাকে শুধু বলে; সাহিব কছু করো। হামারি ফাঁসি জলদি লাগওয়ায়ে দেও। লোকটার বয়স এখন ষাট।’
ভারী দেহটা নিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ উত্তেজনায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠলেন। টেবিলে ঝুঁকে, দাঁড়িয়ে থাকা রোহিণীর মুখের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘এ দেশে মানুষের প্রাণের দাম? এ দেশে করুণা, মমতা, স্নেহ? কী জঘন্য অত্যাচার চলেছে এই লোকটির উপর, যেজন্য সে এখন শুধু মরতেই চায়। …আর আমিই হচ্ছি ভিলেন, বদমাস!’
শুনতে শুনতে রোহিণীর মাথাটা ঝন ঝন করে উঠেছিল। অস্ফুটে বলল, ‘গঙ্গাদা এখন আমি আসি।’
আনমনে সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ফটকের বাইরে এসে দাঁড়াল। এখন অফিসের সময়। কাতারে কাতারে লোক হেঁটে যাচ্ছে। বাস আর মোটর যেন ধাক্কাধাক্কি করছে রাস্তায়। জীবনের এক বিশাল স্রোত সশব্দে তীব্র গতিতে ব্রেবোর্ন রোড ধরে প্রবাহিত হচ্ছে। রোহিণী নিজেকে সুস্থির করার জন্য ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে রইল।
‘রুনি, আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছি’ রাজেন ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল ‘গাড়িটা ওধারে রেখেছি, চলো।’
.
‘একটু দাঁড়াও রাজেন, এক মিনিট।’
ব্রেবোর্ন রোডের পেভমেন্টে জনস্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে রোহিণী বাস্তব জগৎটাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করল। একটু আগে গঙ্গাপ্রসাদ মানুষের উপর মানুষের অত্যাচারের যে বীভৎস কাহিনিটা তাকে শোনালেন, তারপর অসুস্থ বোধ না করে উপায় নেই। দশ বছর ধরে একটা গরিব নিরক্ষর, বুড়ো চাষিকে দশ বর্গফুট ডেথ—সেলে আটকে রেখেছে, রাত দিনে এক ঘণ্টার জন্য মাত্র বাইরে বেরোতে পারে, সে এখন শুধুই মরতে চায়, বাঁচার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেছে! মানুষকে এই অবস্থায় নিয়ে গেছে মানুষই!
রোহিণী আপন মনেই বলল, ‘যেন মরেই যায়।’
‘হল কী তোমার? কার মরার কথা বলছ? গঙ্গা ব্যানার্জি কী বলল?’
‘বলছি সব। চলো।’
রাজেনের বুড়ো হিলম্যানটিকে দেখে কেন জানি রোহিণীর মায়া হল। সস্নেহে রংচটা তোবড়ানো দরজায় হাত বুলিয়ে সে বলল, ‘রাজেন, বুড়োকে এবার ছেড়ে দাও।’
‘সে কী, ছাড়ব মানে? এখনও ছোকরা মারুতিদের সঙ্গে সমানে টক্কর দেয়। গা—হাত—পা অবশ্য একটু কাঁপে, মাঝে মাঝে কাশেটাশেও—।’ বলতে বলতে রাজেন সেলফ স্টার্টারের চাবি ঘোরাল। হিলম্যান বার কয়েক কঁকিয়ে উঠে চুপ করে গেল।
‘অথচ বাড়ি থেকে বার করার সময় সঙ্গে সঙ্গেই স্টার্ট নিয়েছিল। তুমি চড়লেই ওর যত ভীমরতি ধরে।’ রাজেন হতাশ চোখে ড্যাশবোর্ডের মিটারগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
‘তাহলে আমি কি এখন নামব?’ রোহিণী দরজার হাতলে হাত রাখল। ‘কিন্তু বুড়ো কী তাতে আরও মনমরা হয়ে যাবে না?’
‘যেতে পারে।’ রাজেন এরপরই ধমকে উঠল, ‘আই বুড়ো, এবার যদি স্টার্ট না নাও, তাহলে মল্লিক বাজারের কসাইখানায় কিলোদরে বেচে দিয়ে আসব তোমায়! মনে থাকবে?…নাউ, অন ইওর মার্ক…সেট…গোওও।’
চাবি ঘোরানোমাত্র এঞ্জিন বারদুই খুক খুক করে ঝাঁঝিয়ে উঠল।
‘রেগে গেছে বোধ হয়।’ রোহিণী স্বস্তি বোধ করল।
‘ভয় পেয়েছে।’ রাজেন হুঁশিয়ার দৃষ্টিতে একটা মিনিবাসকে লক্ষ করতে করতে ক্লাচ ছাড়ল।
‘তোমার এখন কাজ কী?’
‘সিএবি—তে যাব। ওখানে জীবুদাকে নিয়ে যদি পাই, তাহলে ভালোই। ওর শালার বন্ধু ম্যারেজ রেজিস্ট্রার, জীবুদাকে তার বাড়িতে যাব। তারপর থাকার ব্যবস্থার খোঁজে যাব জহিরুলের বাড়ি, পার্ক সার্কাসে।’
‘আমি এখন পার্ক সার্কাসেই যাব, মীনা চ্যাটার্জির কাছে। তুমি ওখানেই নামিয়ে দাও আমায়।’
‘বেশ, ততক্ষণে বলো, গঙ্গা ব্যানার্জির সঙ্গে কী কথা হল। ক্যাসেটটা দিয়েছ?’
