‘আচ্ছা, আমি আসি। হয়তো কাল দেখা হতে পারে।’
রোহিণী দ্রুত পায়ে ফিরে গেল। দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছে, লিফটম্যান তাকে দেখে খুলে দিল। তিনতলায় থামতেই মুড়ির ঠোঙাটা সে লিফটম্যানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল।
গঙ্গাপ্রসাদের কামরার দরজায় টোকা দিয়ে ঠেলে খুলল। মুখ তুলে তাকে দেখে গঙ্গাপ্রসাদ একমুখ হাসি নিয়ে বললেন, ‘কে রোহিণী, এসো।’
চেয়ারটায় বসে, যেমন সে ভেবে রেখেছিল, কোনোরকম ভণিতা না করেই রোহিণী বলল, ‘আজ সকালে কুন্তীকে খুঁজতে গেছিলেন কেন? সঙ্গে আবার দুটো লোক নিয়ে?’
‘বিশ্বনাথের বউয়ের কিছু আবোল—তাবোল কথা মেয়েটি টেপ করে এনেছে। উপরে গিয়ে পরমেশের সঙ্গেও কথা বলেছে, টেপ করেছে। বিয়ের জন্য মেয়ে দেখে দেবে বলে কথা দিয়ে এসেছে। খুব ধড়িবাজ মেয়ে। যাই হোক, আমার মনে হল, ওকে দিয়ে এ কাজ করানো দু—জনের পক্ষেই সম্ভব—তুমি আর মীনা। কেননা, শোভনেশ সেনগুপ্ত সম্পর্কে আর কারোর তো মাথাব্যথা থাকার কথা নয়।’
‘সুজাতা গুপ্তও আছেন।’
গঙ্গাপ্রসাদের কপাল কুঁচকে উঠল। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওঁর কথাটা একদমই ভুলে গেছিলাম। তবে উনি কোনো ফ্যাক্টর নন। যাই হোক, আমি প্রথমে তোমার কাছেই যাই। আর গিয়েই কুন্তীকে পেয়ে গেলাম। টেপের ক্যাসেটটা আমার চাই। নিশ্চয় সেটা তোমাকেই ও দিয়েছে।’ ধীর শান্ত স্বরে কথাগুলো বলে তিনি রোহিণীর মুখে সার্চলাইট চাহনি ফেললেন।
‘হ্যাঁ দিয়েছে। এসব করার জন্য ওকে কিন্তু আমি বলিনি। নিজে থেকেই করে এনেছে। মিস্ট্রি, ক্রাইম থ্রিল এইসবের দিকেই মেয়েটির ঝোঁক। ওকে শুধু সিদ্ধার্থ সিনহার আর্টিকেলটা পড়তে দিয়েছিলাম। তারপর নিজের উদ্যোগেই খোঁজাখুঁজি করতে বেরোয়। মনে হচ্ছে ক্যাসেটটা পাওয়া আপনার খুবই দরকার।’
‘হ্যাঁ, দরকার।’
‘না পেলে আপনার লোকেরা সেইসব কাজ করবে, যা মীনা চ্যাটার্জিকে করেছে?’
‘তার থেকে বেশি কিছুও করতে পারে।’
‘আর যদি ক্যাসেটটা পেয়ে যান?’
গঙ্গাপ্রসাদের চোখ পিট পিট করে উঠল। হাসি মাখানো মুখে রুমাল ঘষলেন। রুমালের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যেন, কতটা হাসি তাতে লেগে রয়েছে। হাতটা বাড়িয়ে বললেন, ‘বারগেন করতে চাও? মনে হচ্ছে, সঙ্গে করেই এনেছ। দাও। ক্যাসেটটা। কথা দিচ্ছি কখনো কোনো ঝামেলা হবে না।’
রোহিণী ঝুলি থেকে ক্যাসেটটা বার করে গঙ্গাপ্রসাদের হাতে দিল। তিনি চোখের কাছে তুলে ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটা দেখে টেবিলের ওপর রাখলেন। ‘গীতা আর পরমেশ দু—জনেই এতে আছে?’
‘হ্যাঁ, যতটুকু পেয়েছে, তার সবই এতে রয়েছে।’
‘বাড়ি গিয়ে শুনব।’ চেয়ারে হেলান দিয়ে নিজেকে শিথিল করে গঙ্গাপ্রসাদ স্মিত হেসে বললেন, ‘এবার তুমি কী ঠিক করলে, বিয়ে?’
‘হ্যাঁ। শুধু একটা কথা এবার জিজ্ঞাসা করব, মনে হয় সত্যি কথাই বলবেন।’
‘মিথ্যে কথা বলার কোনো কারণ তো নেই।’
.
‘মিথ্যে আপনি অনেক বলেছেন, কাজও অনেক করেছেন। করেননি?’ রোহিণী ক্যাসেটটার দিকে তাকাল। গঙ্গাপ্রসাদ লক্ষ করলেন। তারপর চাপা হেসে বললেন :
‘শোভুর আর বেঁচে থাকার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করিনি। পাগলের বংশ, ও পাগল হয়ে যেতই। মাঝে মাঝেই ওর মধ্যে উন্মত্ত ব্যাপার—স্যাপার ফুটে উঠত। কুকুর পাগল হলে লোকে যা করে, আমি তাই করেছি। গুলি করে বা পিটিয়ে না মেরে, ওকে জেলের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করেছি। তাতে সবথেকে উপকার হয়েছে কার জান?’
গঙ্গাপ্রসাদ ঝুঁকে রোহিণীর মুখের দিকে তীব্র চোখে তাকালেন। অপলক দৃষ্টি রেখে রোহিণী বলল, ‘আমার?’
‘আমারও।’ গঙ্গাপ্রসাদ আবার হেলান দিয়ে হাসিটা ফিরিয়ে আনার জন্য সময় নিলেন। ‘আমার টাকার দরকার। ইস্টার্ন ম্যাগাজিনসের জন্য এক্সপ্যানশন প্রোগ্রাম নিয়েছি। শুধুই কয়েকটা পত্রিকা নিয়ে থাকলে তো চলবে না। আরও নানান ব্যবসা খোলা দরকার। বাড়াতে হবে, ক্রমশ নিজেকে বাড়াতে হবে।’ দু—হাত বিস্তার করে তিনি বোঝাতে চাইলেন।
‘সেজন্য আপনি ওর বাড়িটা আর ছবিগুলো হাতিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ। নতুন কোম্পানি খুলছি। সেরামিক ফ্লোর টাইলস আর ওয়াটার হিটার তৈরির কারখানা শিগগিরই শুরু হবে উলুবেড়িয়ায়। আমার তখন খুব প্রয়োজন ছিল টাকার। তোমারও প্রয়োজন ছিল ওর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার, ঠিক বলছি কী?’
‘বোধ হয় ঠিক।’
‘এজন্য তোমাকে খেসারত দিতে হয়েছে শুধু তোমার স্বামীর যাবতীয় স্থাবর—অস্থাবর সম্পত্তি। আর সেজন্য তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হওনি। আগে যা ছিল তোমার, এখনও তাই রয়েছে। মাঝের থেকে পেয়েছ কিছু কঠিন অভিজ্ঞতা আর সম্ভবত প্রেম।’
গঙ্গাপ্রসাদ হাসতে লাগলেন। রোহিণী ভেবে পেল না, সে এই লোকটির ছাঁকা ছাঁকা কথাবার্তায় রেগে উঠবে কিনা।
‘কিন্তু আপনি একটি লোকের—সুভাষ গায়েনের মৃত্যু ঘটার জন্য দায়ী, আপনি আসল বলে জাল ছবি বিক্রি করে কিছু লোককে ঠকিয়েছেন এবং আরও ঠকাবেন।’
‘হ্যাঁ ঠিক কথাই, কিন্তু তাতে কী হয়েছে! একটা লোক মারা গেল তো বেশ গেলই।’ গঙ্গাপ্রসাদ তাচ্ছিল্য ভরে বললেন, ‘রোজ কত লোকই তো মারা যাচ্ছে, তাতে দেশের বা সমাজের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি? ও লোকটা নিজে সৎ কাজ কিছু করেছে জীবনে?’
‘মেরে ফেলার পক্ষে ওটাই কী আপনার যুক্তি?’
‘হ্যাঁ। এরা হল আগাছা। উপড়ে ফেলে দেওয়াটাই ভালো। আমাদের দেশে প্রাণের দাম এত সস্তা যে, খুন নিয়ে বাচ্চচা ছেলেরাও দু—দিন পর রাস্তায় খেলা করবে। কেউ ফিরেও তাকাবে না।’
