সম্পাদকীয় দপ্তরের দরজা খুলে দুটি মহিলা বেরিয়ে গেলেন। দু—তিন সেকেন্ডের জন্য রোহিণী ভিতরটা দেখার সুযোগ পেল। তার চেয়ারটা খালিই রয়েছে দেখে একটু উন্মনা হল। গঙ্গাদা কি আশা করছেন রোহিণী আবার কাজ শুরু করবে! বৃথা আশা। গঙ্গাদার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। জীবনের এই অধ্যায়টা একেবারেই বন্ধ করে দিয়ে স্বস্তিতে বাকি জীবনটা কাটাবার চেষ্টা এবার সে করবে।
‘আপনি ভেতরে যান।’
কমল দরজার পাল্লা খুলে ধরে রেখেছে। ঘোষাল ভিতরে ঢুকে যাবার পর সে রোহিণীকে বলল, ‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, অফিসে গিয়ে বসুন।’
‘আমি এই অফিস ছেড়ে দিয়েছি কমলদা, আর মায়া বাড়াব না। গঙ্গাদার সঙ্গে দরকারি একটা কাজ সেরেই চলে যাব।’ রোহিণী বেঞ্চে বসল, বলল, ‘বসুন আপনি। যতক্ষণ না ভদ্রলোক বেরোচ্ছেন, আপনার সঙ্গে কথা বলি।’
কমল বসল না। রোহিণীর অফিস ছেড়ে দেওয়ার কথা শুনে তাকে মর্মাহত দেখাচ্ছে।
‘আপনি আর কাজ করবেন না? কেন, কী হল? অন্য কোথাও ভালো কিছু পেয়েছেন নাকি?’
‘কিছুই পাইনি, আর হয়নিও কিছু। মাঝে মাঝে মানুষকে কুঁড়েমিতে ধরে, আমাকে এখন তাই ধরেছে। কতদিন ধরে থাকবে, কে জানে। যাকগে, আপনার ছেলে এখন কেমন আছে?’
‘ভালোই। ভয়ের আর কিছু নেই। কিন্তু দিদি, আপনি আর আসবেন না শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।’
গঙ্গাপ্রসাদের কামরার বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রোহিণী ম্লান হাসল। ঘোষালের বেরোতে এত দেরি হচ্ছে কেন! তিন—চারটে তো কথা বলবে। কোথায় যাব, কখন যাব, কী ধরনের ছবি আছে বা কেমন দামের ছবি আছে, এর বেশি আর কী কথা হতে পারে?
এরপরই রোহিণীর হুঁশ হল, গঙ্গাদা, আর ঘোষালের মধ্যে কী কথা হল সেটা সে জানবে কী করে? ঘোষালের বাড়িতে ফোন করে বা বাড়িতে গিয়ে? কিন্তু তার আগে এখানেই তো ঘোষালের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যেতে পারে! কিন্তু কমলদার সামনে তো ঘোষালের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। তাহলেই গঙ্গাদার কানে তা পৌঁছে যাবে। আর যা ধূর্ত লোক, ঠিক বুঝে নেবে ঘোষালের ছবি কেনার পিছনে অন্য কোনো ব্যাপার আছে।
‘কমলদা, ভদ্রলোক তো এখন বেরোবেন বলে মনে হচ্ছে না, এদিকে নীচে একজনকে আমি দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি। আমি বরং নীচে গিয়ে তাকে বলে আসি, আপনি গঙ্গাদাকে বলে রাখুন আমি এসেছি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে।’
‘সে আমি জানিয়ে দিয়েছি। আর এই ভদ্রলোক এখনি চলে যাবেন, এসেছেন তো ছবি কেনার জন্য।’
‘কার ছবি?’ রোহিণী দ্রুত প্রশ্নটা করে বসল। থতমত হয়ে কমলের মুখে অস্বস্তি দেখা দিল।
‘কার ছবি? তাতো আমি বলতে পারব না।’
‘ভদ্রলোক তখন বললেন সল্টলেকে আপনিই তো শোভনেশ সেনগুপ্তর ছবি দেখিয়েছিলেন, কথাটার অর্থ ঠিক বুঝলাম না! ব্যাপারটা কী?’
‘ব্যাপার আবার কী। বহু বছর আগে শোভনেশবাবু তাঁর কয়েকটা ছবি বিক্রির জন্য সাহেবকে দিয়েছিলেন। এই ঘোষালবাবু তারই একটা কিনেছিলেন। আমি ওনাকে ছবিগুলো দেখাই।’
‘ক—টা ছবি দেখান?’
‘মনে নেই ঠিক…তিন—চারটে হবে।’
রোহিণী বুঝে গেল, কমল মিথ্যে কথা বলল। চণ্ডীদাস ঘোষাল আর তার বউ বলেছিল, দুটো ঘরভরা ছবি তারা দেখেছে।
‘বাকিগুলো কি বিক্রি হয়ে গেছে?’
‘বোধহয়।’
‘তাহলে এখন ঘোষালবাবু কার ছবি কিনতে এসেছেন?’
‘বলতে পারব না।’
রোহিণীর সপ্রশ্ন দৃষ্টি থেকে কমল চোখ সরিয়ে নিল। তার চোখমুখে গ্লানি। রোহিণী উঠে দাঁড়াল। ‘আমি নীচের থেকে আসছি।’
সিঁড়ি দিয়ে তর তর করে নীচে নেমে রোহিণী বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এসে চণ্ডীদাস ঘোষালের জলপাই রঙের মারুতিটাকে দেখতে পেল। গাড়ির কাছে অপেক্ষা করলেই ওকে ধরা যাবে। কিন্তু পেভমেন্টে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা মানেই কৌতূহল আকর্ষণ করা। নোংরা নজর পানের পিকের মতো গায়ের উপর এসে পড়বে।
পাশের বাড়ির গেটের ধারে মশলা—মুড়ির দোকান। রোহিণী সেদিকেই এগিয়ে গেল।
‘এক টাকার মুড়ি—নারকেল—বাদাম দাও তো।’ বলতে বলতে রোহিণী থলি থেকে পার্স বার করল।
ঠোঙাটা হাতে নিয়ে সবেমাত্র মুখে একগাল ঢেলেছে তখনই সে, চণ্ডীদাস ঘোষালকে দেখতে পেল, মারুতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুখ ভরতি মুড়ি নিয়ে ডাকা সম্ভব হল না, তাই সে আধছোটা হয়ে ঘোষালের কাছে পৌঁছল।
‘আপনার জন্যই দাঁড়িয়ে আছি। কী কথা হল?’
চণ্ডীদাস বলল, ‘কাল বেলা বারোটায় মি. ব্যানার্জি দমদমে এয়ারপোর্টে হোটেলের সামনে গাড়িতে অপেক্ষা করবেন। আমরাও সেখানে তাকে মিট করব। তারপর একসঙ্গে যাব বাসুদেবপুর বলে একটা জায়গায়। সেখানে একটা বাড়িতে শোভনেশবাবুর পুরো কালেকশানটাই আছে।’
‘কাল বারোটায়, এয়ারপোর্ট হোটেলের সামনে?’
‘হ্যাঁ। আমি বললাম, বাসুদেবপুর জায়গাটা কোথায় বলুন। আমরা নিজেরাই চলে যাব। তা, উনি বলতে চাইলেন না। ‘ডিরেকশান দিলেও চিনে যেতে পারবেন না, ভিতরের দিকে একটা গ্রাম, এইসব বলে এড়িয়ে গেলেন।’
‘ঠিক আছে আপনি যান। আমি এখন গিয়ে একবার ওঁর সঙ্গে দেখা করব। দামটামের কথা জিজ্ঞাসা করলেন?’
‘করেছি। দশ—বারো হাজারের মধ্যে অল্পই আছে। পঁচিশের উপরেই বেশি। শিগগির নাকি বোম্বাই আর দিল্লিতে শোভনেশবাবুর একটা একজিবিশন করবেন। আমেরিকাতেও করার জন্য কথাবার্তা চালাচ্ছেন। ছবির দাম বাড়ানোর জন্যই এইসব কথা আমাকে শোনানো!’
