‘কপি করতে হলে আর একটা রেকর্ডার যে দরকার! জোগাড় করতে পারবেন?’ কুন্তী জানতে চাইল।
‘নন্দাদের একটা আছে। দাঁড়াও আমি দেখছি।’ রোহিণী ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে যাবার সময় রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গৌরীর মা, নিরুদ্দেশ থেকে ফেরা তোমার জামাইবাবুটি সকাল থেকে অভুক্ত, টোস্ট করে অন্তত খাওয়াও।’
কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলল স্বয়ং নন্দা।
‘আঙ্কল তোমার জন্য জয়পুর থেকে ম্যাক্সি এনেছে, ওটা নিয়ে এসো, আর তোমাদের টেপরেকর্ডারটা কিছুক্ষণের জন্য দরকার, ওটা সঙ্গে করে নিয়ে যেয়ো। চটপট।’ দরজায় দাঁড়িয়ে ফিস ফিস করে কথাগুলো বলেই রোহিণী নেমে এল।
খাওয়ার টেবিলে টেপরেকর্ডারটা। কুন্তী ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করায় ব্যস্ত। রাজেন গালে হাত দিয়ে বসে। গৌরীর মা লম্বা ঘোমটায় মুখ ঢেকে টোস্ট রেখে গেল টেবিলে।
‘নন্দা রেকর্ডার আনছে। কুন্তী তোমার কাছে স্পেয়ার ক্যাসেট আছে বললে, সেটা নিয়ে এসো। আমি ওটা বরং অফিসে গিয়ে গঙ্গাদার হাতেই দিয়ে আসব।’
দু—ঘণ্টার পর ট্যাক্সিতে মালপত্র তুলে রাজেন রওনা হল, সঙ্গে রোহিণীও। তাকে মহারানি অফিসে নামিয়ে দিয়ে সে বাড়ি যাবে। পথে হৃদয়রঞ্জনের প্রসঙ্গ উঠল। রাজেন বলল, ‘ভদ্রলোক একেবারে শ্যাটারড হয়ে গেছেন। আমিও খুব লজ্জায় পড়ে গেছলাম। আচমকা পিছন থেকে একজোড়া হাত যদি গলা টিপে ধরে, তাহলে আত্মরক্ষার জন্য ইনস্টিংকটিভলি যা করার তাই করেছি। বুড়ো মানুষ, গায়ে জোর নেই, আমি গলা থেকে হাতটা ছাড়িয়েই উঠে দাঁড়িয়ে একটা ঘুসি চালাই। ভাগ্য ভালো সেটা ওঁর মুখে লাগেনি। তাহলে এতক্ষণে হাসপাতাল আর পুলিশ করতে হত। তারপর আমি ওঁকে দেখে আর উনি সেনগুপ্তর বদলে আমাকে দেখে, দু—জনেই হতভম্ব হয়ে যাই। ওনার অবস্থাটাই মর্মান্তিক হয়ে পড়ে। বার বার এমনভাবে ক্ষমা চাইতে লাগলেন যে, দেখে আমার কষ্টই হচ্ছিল।’
‘ওঁর মনের ব্যাপারের কিছুটা বুঝতে পারি, কিন্তু কিছুই তো আমাদের করার নেই। ওঁর বউ যে এই বয়সে শোভনেশের জন্য এমন পাগলামো করবেন, এটা আমি ভাবতেও পারি না। ভদ্রমহিলা হঠাৎ যে কোথায় গেলেন!’
‘এইসব দেখে এখন তো বিয়ে করতেই ভয় করছে। কোনদিন বাড়ি ফিরে দেখব বউ নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।’
‘আমারও তো সেই একই দশা! একদিন হয়তো দেখব বরমশাই গেটে দাঁড়িয়ে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে আর রুমালে চোখ মুছছে।’
রোহিণী জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে গেল। আর হো হো করে হেসে উঠল রাজেন।
‘কুন্তীর গেট ক্র্যাশিংয়ের কোনো জবাব নেই। ভাবছি, এবার থেকে গুরুতর কোনো সমস্যায় পড়লে ওরই দ্বারস্থ হব।’
‘হয়ো। তবে জেনে রেখো, আর আমায় বোকা বানাতে পারবে না। …আর হাতটা সরাও, এটা বিবাদী বাগ, রাস্তায় লাখখানেক লোক, তাদের অনেকেই ট্যাক্সির দিকে তাকাচ্ছেও।’
মহারানির অফিসের সামনে পেভমেন্ট ঘেঁষে ট্যাক্সি দাঁড়াল। নামার আগে নিশ্চিত হবার জন্য রোহিণী ঝোলা থেকে ক্যাসেটটা বার করে দেখে নিল।
‘ঠিক এক ঘণ্টা পর আমি এসে এখানে দাঁড়াচ্ছি।’ জানালায় মুখ বাড়িয়ে রাজেন বলল।
‘বাড়ি গিয়ে এখন তোমার একটা লম্বা ঘুম দেওয়া উচিত। কাল সারারাত তো জেগেই কাটালে।’
‘যতক্ষণ না জানছি গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জির কাছ থেকে কী অভ্যর্থনা পেলে, ততক্ষণ ঘুমটুম আর আসবে না। তাহলে এই কথাই রইল, এক ঘণ্টা পর এইখানে দাঁড়িয়ে থাকছি।’
ট্যাক্সিটা চলে যাবার পরও রোহিণী সেই দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। গঙ্গাদার এখন অফিসে থাকারই কথা। কীভাবে কথা শুরু করবে ভাবতে ভাবতে রোহিণী সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়েও ফিরে এসে লিফটের লাইনে দাঁড়াল।
সে দাঁড়াল ঠিক চণ্ডীদাস ঘোষালের পিছনেই। তাকে দেখে চণ্ডীদাস হেসে বলল, ‘সেই ছবি কেনার ব্যাপারে, মি. ব্যানার্জিকে সকালে ফোন করেছিলাম। উনি দেখা করতে বলেছেন। কোথায়, কখন ছবি দেখতে যাব সেটাই উনি এখন বলে দেবেন।’
.
চণ্ডীদাস ঘোষাল আর সে একসঙ্গে মহারানি অফিসে ঢুকলে সেটা কারোর চোখেই অস্বাভাবিক ঠেকবে না। তবে একটা ব্যাপারেই হুঁশিয়ার থাকা দরকার, রোহিণী সেটাই গলা নামিয়ে ঘোষালকে বলল, ‘আমরা কেউ কাউকে চিনি না, এটা খেয়াল রাখবেন।’
‘তা আর বলতে।’
লিফটে তারা তিন তলায় পৌঁছল। মহারানির অফিসে ঢুকল অপরিচিতের মতো। কমল বসেছিল তার বেঞ্চটায়। রোহিণীকে দেখে হেসে উঠে দাঁড়াল। কমলের দিকে তাকিয়েই চণ্ডীদাস ঘোষালের ভ্রূ দুটির কুঁচকে ওঠা রোহিণী লক্ষ করল। চিনতে পারার মতো একটা ভাব ঘোষালের চোখে ফুটে উঠল কেন, সেটা সে আন্দাজ করল। সল্টলেকের ফ্ল্যাটে ঘোষাল দম্পতিকে ছবি দেখিয়েছিল তাহলে কমলদাই।
‘দিদি, আপনি আসছেন না যে। ছুটি নিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, বরাবরের জন্য। গঙ্গাদার সঙ্গে দেখা করব, আছেন?’
ঘোষাল গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, ‘মি. ব্যানার্জির সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।’ কার্ডটা সে কমলের দিকে এগিয়ে দিল।
‘আপনি কি ঘোষালবাবু?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে যেন চেনাচেনা মনে হচ্ছে। আচ্ছা, আপনিই তো সল্টলেকে দেখিয়ে ছিলেন শোভনেশ সেনগুপ্তর ছবি?’
‘আপনি একটু অপেক্ষা করুন।’ কমল হঠাৎ শশব্যস্ত হয়ে চণ্ডীদাস ঘোষালকে থামিয়ে দিয়ে গঙ্গাপ্রসাদের কামরায় ঢুকে গেল। ঘোষাল আর রোহিণী দৃষ্টি বিনিময় করে হাসল।
