‘অসাধারণ চয়েস। কিন্তু আপনি কি একটু দেরি করে ফেলেননি? বাজারে এসব জিনিস এত দেরি করে গেলে কি পাওয়া যায়?’
তুষার দত্ত, ‘তাই তো’ বলেই দ্রুত নেমে যেতে যেতে ভ্রূ কুঁচকে একবার গঙ্গাপ্রসাদ ও তার সঙ্গের লোক দুটির দিকে তাকাল। ফ্ল্যাটের ভিতর থেকে হৃদয়রঞ্জন ও রাজেন তখন বেরিয়ে এল।
‘চলুন আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’ মৃদু কোমল স্বরে রাজেন বলল।
‘না না, আমি ঠিকই আছি, মাথাটা তখন কীরকম যেন—’
হৃদয়রঞ্জন এক পা এক পা করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগলেন। রাজেন সিঁড়িতে লোকজন দেখে রোহিণীর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। কুন্তীর দিকে তাকিয়ে হেসে কী যেন বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই রোহিণী ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘মেসোমশাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে যাও, দেখছ না ওনার মাথা ঘুরছে, পড়ে টড়ে যেতে পারেন।’
রাজেন লাফ দিয়ে হৃদয়রঞ্জনের কাছে পৌঁছল।
একদৃষ্টে গঙ্গাপ্রসাদ সব কিছু লক্ষ করছিলেন, এইবার রোহিণীকে লক্ষ করে বললেন, ‘নীচের ফ্ল্যাটে দত্তরায় লেখা একটা নেমপ্লেট দেখলাম। সেখান থেকেই কী উনি আসছেন।’
রোহিণীর বুক নিমেষের জন্য হিম হয়ে গেল। কিন্তু সামলে নিয়ে বলল, ‘দত্তরায় কী কলকাতা শহরে এই একজনই আছে?’
‘তা বটে।’ গঙ্গাপ্রসাদ শান্ত ভঙ্গিতে তাকালেন কুন্তীর পায়ের দিকে। শৌখিন ঘাসের চটি কুন্তীর পায়ে। ‘উনি তাহলে এ বাড়ির লোক নন, বাইরে থেকেই আসছেন। আচ্ছা চলি।’
গঙ্গাপ্রসাদরা নেমে যাওয়ামাত্র কুন্তীর হাত ধরে রোহিণী ফ্ল্যাটের মধ্যে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
‘তুমি পল্টু দত্তরায় বলতে গেলে কেন?’
‘ওই নামটাই মুখে এসে গেল যে!’
‘নীচে গিয়েই খোঁজ নেবে গঙ্গাদা।’
‘নিক গে। আমার তাতে কিছু এসে যাবে না।’ কুন্তী অবহেলাভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।
‘এসেছে কেন জান? তুমি যে টেপ করে এনেছ, সেই খবর পেয়ে গেছে। তোমার খোঁজেই এসেছে। সঙ্গের লোক দুটো গুন্ডা।’
‘ওহ রিয়ালি!’ কুন্তী খুশিতে চনমন করে উঠল। ‘আমার জন্য, গুন্ডা! রুনিদি, এ তো রিয়াল লাইফ থ্রিলার। আমি এটা লিখবই, কিন্তু ছাপিয়ে দিতে হবে।’
রোহিণী হতাশ হয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘ব্যাপারটার গুরুত্ব তুমি বুঝতে পারছ না এখনও।’
‘খুব বুঝতে পারছি, আমাকে অত হাঁদাভোঁদা ভাববেন না। আপনার ওই গঙ্গাদা এবার টেপের ক্যাসেটটা উদ্ধার করার জন্য আমাদের ফ্ল্যাট র্যানস্যাক করবে, আমাকে কিডন্যাপ করবে, টর্চার করবে আর পল্টু গিয়ে আমাকে ওদের ডেন থেকে রেসকিউ করবে। ভাবতে পারেন রুনিদি, ভাবতে পারেন?’ কুন্তী উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরল রোহিণীকে।
কলিংবেল বাজল। রোহিণী দরজা খুলল।
‘কী কাণ্ড গো দিদি, য়্যাঁ উনি জামাইবাবু নন? আমাকে সে কথা বলবে তো?’
‘তুমি আমাকে সে কথা বলার সুযোগ অন্তত দেবে তো?’
‘ছিছিছি, এমন ভুল আমি করে বসলুম! সকালে বাঁ চোখটা নাচল, আমি ভাবলুম আজ তাহলে ভালো একটা কিছু ঘটবে। আর কিনা একটা বাইরের লোককে তোমার স্বামী বানিয়ে দিলুম! কী হবে এখন বলো তো? কী লজ্জায় যে এখন—’
‘কী আর করা যাবে, তোমার লজ্জা ঘোচাতে ওকেই এখন আমায় বিয়ে করতে হবে।’ ‘তোমার ভালো লোকটি করছেন কী উপরে?’ রোহিণী জানতে চাইল আর তখনই রাজেনকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখে গৌরীর মা ঘোমটা তুলে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
কুন্তী একগাল হেসে বলল, ‘আপনার খবর নিতেই এসেছি। কিন্তু এসেই ঘটে গেল গঙ্গাস্নান। এখন হিহি করে কাঁপছি। কী করা যায় বলুন তো?’
‘ভিজে কাপড়ে আর কিছুক্ষণ থাকলেই নিউমোনিয়া হবার খুবই সম্ভাবনা। গঙ্গাযাত্রা ঘটে যেতে পারে।’ রাজেন হালকা স্বরে বললেও তার মুখে ছড়ানো রয়েছে দুশ্চিন্তার ছায়া। সে জিজ্ঞাসু চোখে রোহিণীর দিকে তাকাল। দু—জনেই কোনো কথা বলছে না।
পরিবেশটা ক্রমশ গুমোট হয়ে উঠছে দেখে কুন্তী বলল, ‘টেপটার জন্যই তো দলবল নিয়ে ওর আসা, তা ওটা দিয়ে দিলেই তো হয়।’
‘সে কী! দিয়ে দেব?’ রোহিণী জীবনে এই প্রথম যেন একটা আজগুবি কথা শুনল! ‘এটাই তো এখন আমাদের হাতে রাখা দরকার।’
‘রুনিদি, দেব মানে এর একটা নকল দেব। আমার কাছে টেপ আছে, তাইতে ডুপ্লিকেট করে সেটাই ওকে দেব। গঙ্গারাম বুঝতেও পারবে না।’
রোহিণী আর রাজেন মুখ—চাওয়া চাওয়ি করল। সেটা লক্ষ করে কুন্তী বলল, ‘লোকটা যাতে আর ঝামেলা না করে, সেইজন্যই বললাম। তখন রুনিদি এমন একটা কথা ফট করে মুখ থেকে বার করলেন, শুনেই মনটা কীরকম যেন হয়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে ধুমধাড়াক্কা, হুড়োহুড়ির থেকে শান্ত, আনন্দের জীবন অনেক সুন্দর।’ কুন্তীর কথাগুলো সকালের রোদের মতো সোনালি আভা হয়ে ঘরে ভেসে রইল।
অবাক স্বরে রোহিণী বলল, ‘কখন আমি কী বললাম?’
‘বললেন না, পল্টু নার্সিংহোমে বউকে নিয়ে গেছে কীসের জন্য যেন।’ কুন্তী মুখ ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। চোখে হালকা নরম স্বপ্নের ছায়া।
হেসে উঠতে গিয়ে রোহিণী হাসল না। রাজেন কথাগুলোর অর্থ বুঝতে না পেরে বিব্রত হয়ে বলল, ‘কারোর সিরিয়াস কিছু হয়েছে নাকি?’
‘হয়েছে। কুন্তীকে খুব সিরিয়াস রোগেই ধরেছে। কিন্তু পল্টুবাবু ছাড়া আর কারোর পক্ষে তো এর চিকিৎসা সম্ভব নয়। ফিরে আসুক গৌহাটি থেকে, তারপর কুন্তীর জন্য নার্সিংহোমের ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখব। কিন্তু তার আগে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়াটা খুবই জরুরি। গঙ্গার ঢেউ কুন্তীর ঘরে ঢুকে বাচ্চচার দোলনা ভাসাক, এটা কোনোমতেই হতে দেওয়া যায় না। কুন্তী তোমার প্রস্তাবই শিরোধার্য করছি, এই টেপটার একটা কপি এখনি করে দাও।’
