নিমন্ত্রণ খেয়ে বাড়ি ফিরে সে মায়ের কাছে কীভাবে তার সামনের লোকটি বাজি ধরে চল্লিশটা রসগোল্লা টপটপ খেয়ে গেল সেই গল্প করছিল, ‘ভাবতে পারবে না, লোকটা এই টিংটিঙে। বাজি ছিল তিরিশটা, দশটা বেশি খেল!’
অনু বলল, ‘কী বাজি ছিল?’
‘এক টাকা!’
‘মা—ত্ত—র!’
তখন মা হঠাৎ বলে ফেলে, ‘অমর অনেকগুলো সন্দেশ এনেছে।’
সে প্রথমে বুঝতে পারেনি। তারপরই খটকা লাগতে জিজ্ঞাসা করে, ‘কীভাবে আনল? ওরা কি অমরকে দিয়েছে?’
‘দেবে কেন। এমনিই এনেছে।’
‘এমনি, এমনি মানে? নিশ্চয় লুকিয়ে এনেছে…চুরি করে এনেছে।’
মা—কে চুপ করে থাকতে দেখে অনন্ত রাগে দাউদাউ করে উঠেছিল।
‘চোর! আমার ভাই চোর! সামান্য ক—টা সন্দেশের লোভ আর সামলাতে পারল না?’
সে লাফিয়ে উঠেছিল। ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে বাসন ছুড়ে ছুড়ে খুঁজছিল।
‘নিশ্চয় কেউ—না—কেউ ওকে সন্দেশ সরাতে দেখেছে।…আমাদের সবাইকে চোর ভাবছে…চোরের ফ্যামিলি…’
‘তুই অমন কচ্ছিস কেন…পাগল হলি নাকি?’
শোবার ঘরের তাকে কাগজে মুড়ে রাখা ছিল প্রায় গোটা কুড়ি সন্দেশ। চাপ খেয়ে দলা পাকানো। মা সেটা অনন্তের হাতে তুলে দিতেই সে ছুটে বেরিয়ে যায় উৎপলদের বাড়িতে।
‘কাকাবাবু এগুলো নিন, অমর বাড়িতে নিয়ে গেছল।’
উৎপলের বাবা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘কী ব্যাপার?’
‘অমর এগুলো বাড়িতে নিয়ে গেছল।’
‘চুরি’ শব্দটা বলতে গিয়েও বেধে গেল গলায়। কাঁধে হাত রেখে উৎপলের বাবা মৃদুহেসে বলেছিল, ‘আরে দূর, ছেলেপুলেরা এরকম একটু—আধটু করে থাকেই, ফেরত দেবার কী দরকার। ও তুমি নিয়ে যাও।’
‘না, আমরা নিতে পারব না।’
টেবলে তখন কাগজ বিছানো হচ্ছে, অমর কলাপাতা হাতে অপেক্ষা করছিল। অনন্ত ছুটে গিয়ে সন্দেশমোড়া কাগজটা টেবলে রাখল। দলাপাকানো কাগজটার ফাঁক থেকে সন্দেশ দেখা যাচ্ছে। সেইদিকে তাকিয়েই অমরের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। সে ফ্যালফ্যাল করে তার আশেপাশের কৌতূহলী মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে হাতের কলাপাতাগুলো টেবলে নামিয়ে দিল।
‘ছেলেটা সত্যিই ভালো।’
কে যেন তখন বলছিল। অনন্ত কোনোদিকে আর তাকায়নি। বাড়িতে এসে গুম হয়ে দালানে বসে থাকে। একটু পরেই অমর আসে।
‘ভালো ছেলে সার্টিফিকেট নেবার জন্য আমাকে এভাবে ডোবালে কেন? আমি পাড়ায় মুখ দেখাব কী করে?’
অনন্ত উঠে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড পর বিরাজমান নৈঃশব্দের মধ্যে চড়ের শব্দটা তীক্ষ্ন হয়ে উঠল। অমর কোনো কথা না বলে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। একটু পরে অনন্ত ওর পাশে গিয়ে শোয়।
অমর দু—দিন ঘর থেকে বেরোয়নি। তৃতীয় দিন দুপুরে কোথায় যেন যায়, ফিরে আসে অনেক রাতে যখন পাড়া নিশুতি হয়ে গেছে। মা শুধু বলেছিল, ‘ভাত তোলা আছে, খাবি?’
ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই অনন্ত শুনতে পায় দালানে কথা বলছে মা আর অমর।
‘আমি এখানে আর থাকব না, চলে যাচ্ছি।’
‘কোথায় যাবি?’
‘ব্যবস্থা করে এসেছি।’
‘ব্যবস্থা?’
‘এন্টালিতে একজনের বাড়িতে থাকব, তার দুটো বাচ্চচা ছেলেকে পড়ানো, দেখাশোনার কাজ করতে হবে।’
‘তোর নিজের পড়াশুনো?’
‘করব।’
অনন্ত শুনতে শুনতে অসাড় হয়ে গেল। তার মনে হল অমর আর কোনোদিনই এই সংসারে ফিরে আসবে না, চিরকালের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কেন? বরাবরই ও আলগাভাবে ছিল এই সংসারের সঙ্গে। কিছুটা স্বার্থপর, কিছুটা উদাসীন। সবাই বলে ট্যালেন্টেড। ওকে বই নিয়ে পড়তে বিশেষ কেউ দেখেনি, অথচ ভালো রেজাল্ট করেছে। অনন্তের আশা ছিল, অমর ভালো চাকরি করে সচ্ছলতা আনবে, অন্তত বাবার থেকে বেশি রোজগার করবে।
সন্দেশগুলো ফিরিয়ে না দিলে অমর থেকেই যেত। সে কি অন্যায় কাজ করেছে? অনন্ত দু—দিন ধরে উত্তর খুঁজেছে। অমরের ধারণা ভালো ছেলে সাজার জন্য সে কাজটা করেছে। ভগবান জানে, মোটেই তা নয়। এইরকম কিছু দেখলে তার ভিতরে অসহ্য একটা চাপ তৈরি হয়, অস্থিরতা জাগে। সেটা বার করে না দিলে তার মনে হয় দম ফেটে মরে যাবে।
তার তখন দশ—এগারো বছর বয়স। পাড়ার সর্বজনীন দুর্গাপুজোয় তারা কয়েকজন সমবয়সি ভলান্টিয়ার হয়েছিল। প্যান্ডেলের একধারে সাবিত্রী—সত্যবানের মূর্তি রাখা ছিল। প্রতিমা দেখার পর মেয়েরা সরায় রাখা সিঁদুর সাবিত্রীর মাথায় ছুঁইয়ে নিজেদের সিঁথিতে দিত। সামনে রাখা থালায় পয়সা ফেলত। নানান আকারের রেজগিতে থালাটা ভরে উঠত দু—তিন ঘণ্টাতেই। দশ পয়সা থেকে সিকি—আধুলি, দু—টাকা, এক টাকার নোটও থালায় পড়ত। যুগলদা থালাটা তুলে নিয়ে নতুন একটা থালা রেখে যেত।
নবমীর দুপুরে অরবিন্দই বলেছিল, ‘পার্কে নাগরদোলা বসিয়েছে, চাপবি?’
‘পয়সা নেই।’
অরবিন্দের মামাতো ভাই পুজোয় বেড়াতে এসেছিল পাটনা থেকে। নাম ছিল নন্দন। তার কাছে ছিল একটা সিকি।
‘দশ পয়সা এক—এক বারে। আরও তো পয়সা চাই।’
অরবিন্দ আর নন্দন নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে অনন্তকে বলল, ‘তুই এইদিকটা আড়াল করে দাঁড়া।’
‘কেন?’
‘যা বলছি শোন।’
তিনদিক ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছোট্ট একটা ঘরে দু—হাত লম্বা সাবিত্রী হাতজোড় হাঁটু গেড়ে ভগবানকে ডাকছে, তার পাশে শোয়ানো সত্যবান। সামনে বাঁশের বেড়া। দুপুরে ভিড় প্রায় নেই—ই। চৌকিতে রাখা ক্যাশবাক্সে মাথা রেখে অন্যদিকে মুখ করে কোষাধ্যক্ষ যুগলদা আধশোয়া। দুটি ছেলে রেকর্ড বাজাচ্ছে।
