‘হ্যাঁ গো দিদি, ব্যাপার কী?’ গৌরীর মা কোনোক্রমে কথাটা বলতে পারল। ওদের আচরণ দেখে সে এইটুকু শুধু বুঝেছে, তার বলা কথাগুলো দক্ষের যজ্ঞে ক্ষ্যাপা শিবের মতো হাজির হয়েছে দু—জনের কাছে।
‘মেসোমশাই অমন করে ছুটলেন কাকে খুন করতে?’
সর্বনাশ, নীচে তো রয়েছে রাজেন। মনে পড়ামাত্র ছিটকে উঠেই রোহিণী দরজার দিকে ছুটল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে দেখল, তার ফ্ল্যাটের দরজা খোলা আর ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনটি লোক, যাদের মধ্যে একজনকেই সে শুধু চেনে।
রোহিণী থমকে পড়ল মাঝ সিঁড়িতে। গঙ্গাদা আবার এসেছেন, কিন্তু সঙ্গে ওই দুটি লোক কারা? চেহারা সুবিধের মনে হচ্ছে না।
গঙ্গাপ্রসাদ দেখতে পেয়েছেন রোহিণীকে। ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে বললেন, ‘কথা আছে। তার আগে বলো, ঘরে যে দু—জনকে দেখলাম, ওরা কারা?’
রোহিণী ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা লোক দুটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তার আগে বলুন আপনার সঙ্গের ওই লোক দুটি কারা?’
‘আমার লোক, আমার সঙ্গে এসেছে।’
‘ওদের বেরিয়ে আসতে বলুন। আমি পছন্দ করি না, আমার বিনা অনুমতিতে অপরিচিত কেউ আমার ফ্ল্যাটে ঢোকে।’
‘এ ফ্ল্যাট আমার, আমি এর মালিক।’
‘অবশ্যই। কিন্তু যতক্ষণ আমি এটায় রয়েছি, ততক্ষণ আমি মালিক।’
রোহিণী কণ্ঠস্বরকে যতটা ইস্পাত করল, ঠিক ততটা কঠিন চোখেই গঙ্গাপ্রসাদ তাকিয়ে রইলেন। সাত—আট সেকেন্ড পর মাথা নেড়ে ইশারা করলেন লোক দুটিকে বেরিয়ে আসার জন্য। ওরা বেরিয়ে আসতেই রোহিণী ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকল।
খাওয়ার টেবিলে চুপ করে বসে আছেন হৃদয়রঞ্জন, মাথা দু—হাতে ধরে, নীচু করে। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রাজেন, একটু ঝুঁকে হাত নেড়ে কী যেন তাঁকে বলছে বোঝাবার মতো ভঙ্গিতে। রোহিণী হাঁফ ছাড়ল। খুনটুন ধরনের কিছু যে ঘটেনি, এটাই তাকে স্বস্তি দিল। অবশ্য বৃদ্ধ হৃদয়রঞ্জন, খালি হাতে কোনো ‘শয়তানকে’ যে সাবাড় করতে পারবেন, এমন সম্ভাবনাকে বহু চেষ্টাতেও সে স্বপ্নে জায়গা দিতে পারবে না। তাহলেও মানুষের সবথেকে সহজ কাজগুলোর মধ্যে, খুনই বোধ হয় সবথেকে সহজতম। আক্রমণ রুখতে গিয়ে রাজেনই হয়তো হৃদয়রঞ্জনকে মেরে ফেলতে পারে। যাই হোক, দু—জনকেই বেঁচে থাকতে দেখার পর রোহিণী ফিরে তাকাল দরজায় দাঁড়ানো গঙ্গাপ্রসাদের দিকে।
‘বলুন, কী কথা?’
‘একটু বাইরে এসো।’
রোহিণী পরিবেশটা বুঝে নিল। গঙ্গাদার লোক দুটোর অস্বস্তিকর রকমের চেহারা। বোধ হয় উনি ভেবেছিলেন, মীনা চ্যাটার্জিকে দেওয়া ওষুধেই কাজ সারতে পারবেন। কিন্তু ফ্ল্যাটে আরও দুটি লোক যে থাকবে, এটা জানতেন না। দশ ঘণ্টা আগে রোহিণীও জানত না। এখন আর ঝঞ্ঝাট বাধানোর কোনো ঝুঁকি ওরা নেবে না। রোহিণী সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে এসে দাঁড়াল।
কোনো ভনিতা না করেই গঙ্গাপ্রসাদ বললেন, ‘কুন্তী নামে কোনো মেয়েকে চেনো?’
‘কুন…তী!’ রোহিণী তার বিস্ময়কে দীর্ঘস্থায়ী করল চিন্তা করার সুযোগ নেবার জন্য। নামটা জেনে গেছে। কীভাবে? দিগম্বর বর্ধন লেনে গিয়ে তাহলে গীতা বা বিশ্বনাথের সঙ্গে গঙ্গাদা কথা বলেছেন। কুন্তী নিশ্চয় নিজের নামটা গীতার কাছে বলে ফেলেছিল। উনি এখন তাহলে টেপ রেকর্ডারের সন্ধানে বেরিয়েছেন।
‘মনে পড়ছে না এমন নামের কাউকে চিনি। কেন বলুন তো?’ সরল কৌতূহল রোহিণীর কণ্ঠে ও চোখে।
‘ভালো করে মনে করো…খুব রোগা, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, বয়স কুড়ি—বাইশ, সালোয়ার—কামিজ পরে…এমন কাউকে?’ গঙ্গাপ্রসাদ তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে রোহিণীর মুখভাব লক্ষ করছেন। কিন্তু মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারছেন না।
রোহিণী মাথা নেড়ে বলল, ‘নাহ মনে পড়ছে না।’
‘অ।’ গঙ্গাপ্রসাদ একবার খোলা দরজা দিয়ে ফ্ল্যাটের ভিতরে তাকালেন, কী যেন ভাবলেন, তারপরই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলেন। তাঁর পিছনে লোক দুটিও।
তখনই দেখা গেল সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে কুন্তী। তাকে দেখেই গঙ্গাপ্রসাদ থমকে দাঁড়ালেন। কুন্তীও থমকে পড়ল। গতকাল এই সময়ই সে রোহিণীর শোবার ঘর থেকে উঁকি দিয়ে গঙ্গাপ্রসাদকে দেখেছিল। মুখ তুলে কুন্তী একবার শুধু রোহিণীর দিকে তাকিয়েই কী যেন বুঝে নিল, তারপর গঙ্গাপ্রসাদকে বলল, ‘এক্সকিউজ মী, মিসেস রোহিণী সেনগুপ্তর ফ্ল্যাট কোনটে বলতে পারেন?’
‘আমি এখানে থাকি না।’
‘ওহহ।’ কুন্তী যখন পাশ কাটিয়ে উপরে উঠছে তখন রোহিণী বলল, ‘আমিই রোহিণী সেনগুপ্ত, আপনি?’
‘আমার নাম নন্দা দত্ত।’ কুন্তী চোখের পলক না ফেলে, অপরিচিতের মুখভাব বজায় রেখে বলল, ‘আমি আসছি পল্টু দত্তরায়ের কাছ থেকে।’
রোহিণীর মুখে হাসি ফুটল।
‘ওহো পল্টু! আসুন আসুন। কালকেই তো পল্টু ফোন করে বলল, আজ আসতে পারবে না, বউকে নিয়ে নার্সিং হোম যাবে…বাচ্চচা হবে কিনা। তা আপনাকে বুঝি পাঠাল?’
বাজারের থলি হাতে চারতলা থেকে তুষার দত্ত নামছে। সিঁড়িতে অতগুলো লোক দেখে সে মন্থর হয়ে গেল। রোহিণীর দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা হেলিয়ে বলল, ‘বেরোচ্ছি, একটু বাজারের দিকে যাব। মেজো শালা এসেছে কানাডা থেকে, খুব বড়ো ডাক্তার, ওকে আজ খেতে বলেছি।’
‘তাই নাকি!’ এর বেশি আর কী সে বলতে পারে, রোহিণী তা ভেবে পেল না।
‘চেতলের পেটি খাওয়াব ভাবছি, চয়েসটা ঠিক করেছি কি না বলুন?’
