‘যাব কিনা ভাবছি, তবে মীনা চ্যাটার্জিকে খবরটা নিশ্চয় দেব।’
.
দশ
চা খেতে খেতে রাজেন খবরের কাগজ পড়ছিল। রোহিণী চারতলায় গেছে হৃদয়রঞ্জনের কাছ থেকে সুজাতা গুপ্তর খোঁজখবর নিতে। তখন কলিংবেল বাজল।
দরজা খোলার জন্য রাজেন উঠে গিয়ে আই হোলে চোখ রেখেই সিঁটিয়ে গেল। একটি স্ত্রীলোক এবং হাতে পাউরুটি আর দুধের প্যাকেট দেখে মনে হচ্ছে কাজের লোক অর্থাৎ গৌরীর মা। রাজেন ভেবে পাচ্ছে না এখন তার কী করা উচিত। ফ্ল্যাটে রোহিণী নেই, দরজা খুলে দিলে তার পরিচয় জানার জন্য এই মহিলার ভ্রূ বেঁকে উঠবে আর সেটি কপালে উঠবে যথার্থ পরিচয় শুনলেই। অতএব দরজা না খোলাই উচিত। কিন্তু না খুললে ইনি তো বেল বাজিয়েই যাবেন।
গৌরীর মা আবার বেল বাজাল। মুখে বিরক্তি। তার পক্ষে জানা সম্ভব নয়; রোহিণী এখন চারতলায়। ‘যা হয় হবে’ এইরকম একটা বেপরোয়া ভাব নিয়ে রাজেন দরজা খুলল।
‘তুমি গৌরীর মা?’
‘হ্যাঁ।’ গৌরীর মা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে। তার মুখের উপর দিয়ে বিস্ময়, সন্দেহ, কৌতূহল পর পর ঢেউ খেলে গেল। ‘দিদি নেই?’
‘এইমাত্র ওপরে গেল মাসিমার খবর নিতে। দাঁড়িয়ে রইলে কেন, ভেতরে এসো।’ রাজেন খোলা দরজা থেকে এক পা পিছিয়ে গেল।
‘আপনি?’ প্রশ্নটা করার পরই গৌরীর মা—র মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘জামাইবাবু!’
রাজেন ভ্যাবচ্যাকা দশার মধ্যে পড়ল। এখনও হইনি তবে হবো, এই ধরনের একটা বাক্য সে মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছিল, কিন্তু কাজটি সম্পূর্ণ করার আগেই গৌরীর মা—র মুখে ছড়ানো হাসি দেখে সে ঢোঁক গিলল।
‘আমার মন বলছিল, আপনি ফিরে আসবেনই। না এসে পারবেনই না…দিদির মতো অমন ভালো মেয়েকে কষ্ট দিয়ে কদ্দিন আর নিরুদ্দেশ হয়ে থাকতে পারবেন?’ গৌরীর মা ভিতরে এসে হাতের জিনিসগুলো টেবিলে রাখল। ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করে রাজেন এবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
‘কতদিন আমি দিদিকে বলেছি, ওপরের মাসিমাকে, নীচের বউদিকেও বলেছি, জামাইবাবু ঠিক ফিরে আসবেনই আসবেন। আজ সকালেই তো আমার বাঁ চোখটা নাচল, তখন কেন জানি মনে হল, বাবা তারকনাথের দিব্যি, সন্তাোষী মা—র দিব্যি করে বলছি, মনে হল দিদির দুখ্যু আজ ঘুচবে, হ্যাঁ আজকেই। কেমন মিলে গেল তো? আমার মন যা বলবে, তা হবেই হবে। তা জামাইবাবু কতদিন আপনি নিরুদ্দেশ হয়ে ছিলেন?’
‘ছ—সাত বছর।’ মুখ ফসকেই রাজেনের অজান্তেই কথাটা বেরিয়ে এল।
‘য়্যাঃ! অত্তোদিন, এমন বউকে ফেলে? পারেন বটে আপনারা। আমার বর একবেলা আমায় না দেখে…তা দিদি এখন আবার উপরে গেল কেন, দাঁড়ান আমি ডেকে নিয়ে আসি। এখন কী…।’ শশব্যস্তে গৌরীর মা প্রায় জগ করেই বেরিয়ে গেল।
রাজেন বিমূঢ়ের মতো ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল। ঠিক সেই সময় চারতলায় হৃদয়রঞ্জনের ফ্ল্যাটেও রোহিণী উৎকণ্ঠিত স্বরে দ্বিতীয়বার বলল, ‘সে কি! মাসিমা রাতে ফেরেননি?’
হৃদয়রঞ্জন মাথা নাড়লেন।
‘তাহলে এবার পুলিশে খবর দিন। আর অপেক্ষা করার দরকার নেই। আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটেছে। মাসিমা দিগম্বর বর্ধন লেনে সেদিন না গেলেই ভালো করতেন।’
‘কেন?’ হৃদয়রঞ্জন তীক্ষ্ন তীব্র স্বরে, একটি শব্দেই বুঝিয়ে দিলেন, তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। ‘কেন পুলিশের কাছে যাব? যে স্বেচ্ছায় চলে গেছে তার জন্য সবাইকে উদবাস্তু করে লাভ কী?’
‘কিন্তু তিনি কোনো বিপদে পড়লেন কিনা…’
‘পড়ে পড়বেন। বহু বছর ধরে আমি যন্ত্রণা ভোগ করেছি। আমার সারাজীবন বিষিয়ে দিয়েছে…আমি খোঁড়া, আমি কুৎসিত, আমি শোভনেশ সেনগুপ্তর মতো লম্বা নই, ফর্সা নই, তাঁর মতো শিল্পী নই…কিন্তু আমারও তো সহ্যের সীমা আছে।’ বলতে বলতে হৃদয়রঞ্জন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। পুরু কাচের ওধারে চোখ দুটোয় ধকধক করে ঘৃণা জ্বলছে। হাতের আঙুল কাঁপছে।
রোহিণী ভেবে পেল না, এখন কী বলে সে এই লোকটিকে সান্ত্বনা দেবে। লাঞ্ছিত, অপমানিত এক পুরুষ এতদিনে যেন শোধ নিতে নিজেকে জাগিয়ে তুলেছে।
‘এই একটা লোক আমার জীবন দুর্বিষহ করেছে। কলকাতা ছেড়ে দূরে চলে গিয়ে ভেবেছিলাম …কিন্তু এখন দেখছি সবই আগের মতনই রয়েছে, কিছুই মুছে যায়নি।’ হৃদয়রঞ্জনের স্বর হতাশায় অস্ফুট হয়ে এল।
যাবার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে রোহিণী, ঠিক সেই সময়ই পড়িমরি ছুটে এল গৌরীর মা।
‘অ দিদি, অ্যাদ্দিন পর জামাইবাবু ফিরে এল, আর তুমি এখানে বসে বসে গপ্পো করচো! একদিন নয় এক বছর নয়, ছ—ছ’টা বছর পর নিরুদ্দেশ থেকে ফিরে এয়েচে! কোথায় তুমি তাঁর সেবা যত্ন করবে, তা না তুমি…ধন্যি বাবা। যাও যাও নীচে যাও।’
একটা পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটল অথচ একটা পিঁপড়েও মরল না, এমন একটা ব্যাপার যেন প্রত্যক্ষ করছে রোহিণী, সেইরকমভাবে গৌরীর মা—র দিকে তাকিয়ে রইল। হাত—পা অবশ হয়ে আসছে। মাথাটা টলে যেতেই সে চেয়ারে আবার বসে পড়ে বলল, ‘শোভনেশ ফিরে এসেছে?’
তখনই দরজার দিকে ছুটে যেতে গিয়ে টেবলের কোণায় ধাক্কা লেগে বেটাল হয়ে পড়তে পড়তে হৃদয়রঞ্জন চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমি খুন করব শয়তানটাকে, আজ আমি…।’ দেওয়ালে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আবার নিজেকে দাঁড় করিয়ে তিনি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। রোহিণী চোখ বন্ধ করে ফেলল। গত সাত—আট দিন ধরে যে ভয়টাকে নিয়ে সে নাড়াচাড়া করেছে, অবশেষে সেটা বাস্তব রূপ নিল।
