‘না করলেই ভালো হত। তাহলে এইরকম অবস্থাটা তৈরি হত না। সুভাষ, মীনা, গঙ্গাপ্রসাদ বা সুজাতা গুপ্ত এরা তোমার কেউ নয়। যা কিছু বোঝাপড়া ওরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে করে নিত, তোমার কোনো দরকারই ছিল না এদের মধ্যে মাথা গলাবার। তা ছাড়া শোভনেশ সেনগুপ্তর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির উপরও তোমার যখন বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, তখন এদের থেকে দূরে থাকাই ভালো ছিল।’
‘এখন তাই মনে হচ্ছে।’ মুখ নামিয়ে রোহিণী নখ দিয়ে টেবল থেকে মোমবাতির জমাট মোম তুলতে লাগল।
‘গঙ্গাপ্রসাদ কি কিছু করবে বলে মনে হচ্ছে?’
‘মীনাকে যা করেছে?’
‘না, সুভাষ গায়েনকে যা করেছে।’
‘মনে হয় না, অন্তত টেপের ক্যাসেটটা কার কাছে রয়েছে, সেটা না জানার আগে পর্যন্ত নয়।’ চিন্তিত স্বরে ধীরে ধীরে রোহিণী বলল। ‘একটা লোককে খুনি সাজিয়ে জেলে ঢোকাবার সুযোগ উনি নিয়েছেন। তার বহু টাকা দামের ছবি হাতিয়েছেন, বসত বাড়িটাও আমার মনে হয় বেনামে নিজেই কিনেছেন সামান্য টাকায়। তাই নয়, নিজের মুখেই বলে গেলেন, এসব করেছি টাকার জন্য, টাকা করতে ভালোবাসি, টাকা করতে হলে এভাবেই করতে হয়। ভাবতে পারো রাজেন, বেশ গর্বের সঙ্গেই কিছু না রেখে—ঢেকে একটা লোক পরিষ্কার দিনের আলোয় কিনা মুখের উপর বলল, কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না, আর শোভনেশের ছবিগুলো তো আমার কাছেই আছে!’
‘প্রমাণের কিছু না থাকলে, আমিও এইভাবে কথা বলতে পারি। শোভনেশ সেনগুপ্ত নিজের মুখে কোর্টে বলেছেন, তিনিই বীণাকে জানলা দিয়ে ফেলে দিয়েছেন। তারই ভিত্তিতে কনভিক্টেড হয়েছেন। এরপর গঙ্গাপ্রসাদকে ফাঁসানো কি এত বছর পর সম্ভব হতে পারে? পুলিশে অবশ্য তুমি অভিযোগ করতে পারো, কিন্তু এমন জায়গায় এমনভাবে সেগুলো লুকোনো যে, খুঁজে বার করাই অসম্ভব হবে। ধরো, খোঁজ পাওয়া গেল, তখন দেখবে গঙ্গাপ্রসাদ এমন একটা দলিল বার করবে যাতে লেখা, শোভনেশ তার সব ছবিই ওঁকে বিক্রি করে দিয়ে গেছে। এখন তো আসল ছবিগুলোর সঙ্গে নকলগুলোও গঙ্গাপ্রসাদ বিক্রি করে যাবে, কিন্তু ধরা পড়বে না। ধরিয়ে দেবার লোক ছিল সুভাষ গায়েন, তাকে তো হাওয়া করে দিয়েছে।’
‘শুধু একটা লোকই এখন গঙ্গাদার মুখোশ খুলে দিতে পারে। কিন্তু সে লোকটা যে এই মুহূর্তে কোথায়, তা কেউই জানে না।’
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত।’
রাজেন জলের গ্লাস নিয়ে উঠে বেসিনের কলে গেল। গ্লাসে জল ভরে ঢক ঢক করে খেয়ে, চোখে জলের ঝাপটা দিল।
‘শোভনেশ নাকি গঙ্গাদাকে ফোন করেছিল। আমার মনে হয়েছে এটা মিথ্যে কথা।’
‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। ব্লাফ দিয়ে তোমাকে বোধ হয় অসাড় করে দিতে চেয়েছিল।’ তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে হঠাৎ মোছা বন্ধ করে রাজেন বলল, ‘একবার বহরমপুর গিয়ে খোঁজ নিলে হত না? সেনগুপ্তর হাসপাতাল থেকে পালানোর খবরটাও ব্লাফ কিনা সেটা একবার ভেরিফাই করা কি উচিত নয়?’
‘কবে কী লাভ হবে? ধরো শোভনেশ পালায়নি।’ রোহিণী চেয়ারে বাবু হয়ে বসে মুখের সামনে তালু রেখে হাই তুলল। রাজেন কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল।
‘ধরো শোভনেশ জেলেই আছে, তাতে এখনকার এইসব ব্যাপারের উপর তার কোনো প্রভাব পড়বে কি? গঙ্গাদার কেশাগ্রও স্পর্শ করা যাবে না। ওর শুধু একটাই অস্বস্তি, কেসটা রি—ওপেন হলে, ওনার সাক্ষ্যপ্রমাণ ধামাচাপা দেবার চেষ্টাটা ফাঁস হয়ে যাবে। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়তে পারে। …ওহহ দ্যাখো ভুলেই গেছি, ওপরের মাসিমা কাল বিকেলে বেরিয়ে রাত পর্যন্তও ফেরেননি।’
‘কে, সুজাতা গুপ্ত?’ রাজেন অবসাদ কাটাতে ক্যালিসথেনিকস শুরু করেছে। দু—পা ফাঁক করে কোমর থেকে ঊর্ধ্বাঙ্গ চক্রাকারে ঘোরাচ্ছিল। সেটা থামিয়ে বলল, ‘তোমায় কে বলল?’
‘মেসোমশাই। কাল রাতে সিঁড়িতে দেখা, তখন বললেন, খুবই আপসেট মনে হল।’
‘হওয়াটাই স্বাভাবিক। বুড়ো বয়সে বউ পালালে কী মুশকিল যে হয়!’
‘পালিয়েছেন ধরে নিচ্ছ কেন, হয়তো বিপদে পড়েছেন, অ্যাকসিডেন্টও হতে পারে। একবার উপরে গিয়ে খোঁজ নেওয়া উচিত।’
‘ওপরে গেলে ম্যাক্সিটা নিয়ে যেয়ো।’
‘ওরে বাবা, তুষার দত্ত ওটা দেখলে খাপ্পা হয়ে, ফড়াৎ করে হয়তো ছিঁড়ে ফেলে দেবে। আমি পরলে ঠিক আছে, কিন্তু নিজের মেয়ের গায়ে এইরকম অসভ্য ড্রেস উনি বরদাস্ত করবেন না। আমি বরং নন্দাকে ডেকে এনে দিয়ে দেব।’
রোহিণী চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে জানালা খুলল। বাইরে আবছা আলো। ভোর হচ্ছে। পাখিদের কিচির—মিচির ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
‘তোমার গৌরীর মা এসে পড়ার আগেই আমায় কেটে পড়তে হবে। ট্যাক্সি এখানে কখন পাওয়া যাবে? বাড়ি গিয়ে ঘুমোতে হবে।’
‘আটটা—নটার আগে পাচ্ছ না। তবে ভাগ্যে থাকলে তার আগেও পেয়ে যেতে পারো। ততক্ষণ তুমি বিছানায় গড়িয়ে নিতে পারো।’
‘এখন বিছানায় বডি ফেললে সাত—আট ঘণ্টার আগে সেটা তুলতে পারব না। অসম্ভব টায়ার্ড। বরং আর একবার চা হোক।’
চা করতে করতে রোহিণী বলল, ‘আজ একটা জরুরি কাজ আছে, ঘোষালদের ফোন করতে হবে। গঙ্গাদাকে আজই চণ্ডীদাস ঘোষাল ফোন করে জানবে, বিক্রির জন্য শোভনেশের ছবি পাওয়া যাবে কিনা। পাওয়া গেলে কোথায় ছবি দেখার জন্য ওদের যেতে হবে, সেটাই আমায় জানতে হবে।’
‘জেনে কী করবে?’ আঙুলে টুথ পেস্ট লাগিয়ে দাঁতে ঘষতে ঘষতে রাজেন বলল। ‘তুমিও কী ছবি দেখতে যাবে?’
