ধাতস্থ হয়ে কুন্তী দরজা খুলে ফ্ল্যাট থেকে বেরোল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কী একটা মনে পড়ায় থেমে গিয়ে ফিরে তাকাল। খোলা দরজায় রোহিণী দাঁড়িয়ে স্নেহ ভরে তাকিয়ে। কুন্তী হালকা পায়ে উঠে এসে রোহিণীর ঘাড়ের উপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘ক্র্যাশ কাকে বলে এবার দেখলেন তো?’
‘এ তো ভিভ রিচার্ডসের ইনিংস!’
দরজা বন্ধ করার পর রোহিণী জিজ্ঞাসা করল, ‘ক্র্যাশটা কী জিনিস?’
‘কঠিন বাধা চুরমার করে দেওয়া! ইচ্ছে করছে, যে ম্যাক্সিটা এনেছি, সেটা ওকেই উপহার দিই।’
‘থাক থাক, তাহলে আড়াইটে কুন্তী লাগবে একটা নন্দার ম্যাক্সি ভরাতে। …খিদেটিদে পাচ্ছে কি, খেয়েছ কখন?’
‘পাচ্ছে। প্লেনে ডিনার নামে গালভরা যে জিনিস সার্ভ করে, তাতে মাত্র ঘণ্টা চারেক পেটটাকে চুপ করিয়ে রাখা যায়।’
‘তাহলে ডিম পাউরুটি দিয়ে মোগলাই টোস্ট…’
‘আহা হা হা, এখন আবার কষ্ট করে রান্নার দরকার কী! তৈরি খাবার যা আছে, তাতেই তো রাতটা চলে যাবে।’
‘তৈরি তো কিছুই নেই।’ বিব্রত স্বরে কথাটা বলে রোহিণী কুণ্ঠিত চোখে তাকাল এবং তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। হাত বাড়িয়ে সে টেবল থেকে টর্চটা তুলে নিয়ে বলল, ‘গুন্ডা দমনের জন্য কুন্তী এটা দিয়ে গেছে। ভালো ছেলের মতো যদি এই চেয়ারটায় বসে না থাক, তাহলে মাথায় আলুর খেত তৈরি হবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে টোস্ট হয়ে যাবে, পেঁয়াজটা কাটতে শুরু কর।’
‘কিন্তু রুনি, এক—একটা মিনিট এখন আমার কাছে এক—একটা বছর। পাঁচ মিনিট মানে পাঁচ বছর, এতদিন উপবাস করলে কেউ বাঁচে না। এটা বোঝার মতো হৃদয় কি ভগবান তোমায় দেননি?’
‘দিয়েছেন,’ রান্নাঘর থেকে জবাব ভেসে এল। ‘সেই সঙ্গে কিছু বুদ্ধিও। গঙ্গাদা এখন আমার বুদ্ধির পরীক্ষা নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।’
‘কুন্তী আমায় বলল, সে নিজের কানে শুনেছে, আজ সকালেই গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি নাকি তোমায় মার্ডার করবে বলে থ্রেট করেছে? সত্যি নাকি? আমি তো ভাবলুম, মেয়েটি তোমার বিপদের কথা বলে ভয় ধরিয়ে আমাকে আটকাবার জন্য কথাটা বানিয়ে বলল, তাই আর গুরুত্ব দিইনি। তুমিও তো এতক্ষণ এ সম্পর্কে কিছু বলোনি। আশ্চর্য লোক তো!’
রাজেন উঠে গিয়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল। তার চোখে উৎকণ্ঠা। হাতে কুচোনো পেঁয়াজ। মুখ গম্ভীর।
‘পাঁচ—ছ’দিন ছিলাম না। দেখে গেছিলাম, তুমি খুব ডিস্টার্বড ছিলে।’
‘হ্যাঁ ছিলাম, এখনও আছি। তারপর এই ক—দিনে অনেকগুলো ব্যাপার ঘটেছে, অনেক ব্যাপার জেনেছি, এমনকী একটা খুনও হয়েছে, একজনের ফ্ল্যাটে গুন্ডারা হামলা করে ছবিও চুরি করে নিয়ে গেছে। সবই তোমায় বলছি, আগে এটা করে নিই, তারপর খেতে খেতে শুনো।’
‘তার আগে গায়ে জল ঢালা দরকার। সারাদিনে স্নান হয়নি। তোমার কি রাতের স্নান হয়ে গেছে?’
প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেবার জন্যই যেন রোহিণীর সর্বাঙ্গে চোখ বোলাল রাজেন। কুঁকড়ে গেল রোহিণী। পাতলা, ঢিলে ম্যাকসিটার অন্তরালে কোনো অন্তর্বাস নেই; রাজেনের চোখ দেখে তার মনে হল, থাকার দরকার রয়েছে। সে ভ্রূ কুঁচকে পিছন ফিরল, মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে।
রাজেন লক্ষ করেছে রোহিণীর মুখভাব। গম্ভীর স্বরে বলল, ‘নিশ্চিন্ত থাকতে পার, রেপ কেসের আসামি হবার ইচ্ছে আমার নেই।’
‘একটা আসামি নিয়ে হিমসিম খাচ্ছি, তারপর আর একটা কপালে জুটলে…। আচ্ছা, আমার এই শরীরটাকে ধ্বংস করে ফেললে হয় না? তাহলে আর কোনো ঝামেলার মধ্যে কাউকেই পড়তে হবে না।’
‘চমৎকার প্রস্তাব। গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি শুনলে খুবই পুলকিত হবে। আমি আর পেঁয়াজ—টেয়াজ কাটতে পারব না…বাথরুমে যাচ্ছি।’
‘এই এই শোনো।’ রোহিণী রান্নাঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে রাজেনের হাত ধরল, ওর চোখে চোখ রাখল। প্রায় এক মিনিট তারা এইভাবে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে স্তিমিত কোমল হয়ে এল রাজেনের ক্রুদ্ধ চাহনি। সে রোহিণীর মাথায় গালে, ঘাড়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ভয় থেকে আগে বেরিয়ে এসো, তা না হলে এই দেহ এই মন থেকে আমি নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নিতে পারব না।’
রোহিণীর মুখটা কিছুক্ষণ বুকে চেপে রেখে রাজেন স্নান করতে গেল।
রাত প্রায় চারটে। টেবিলে মুখোমুখি রোহিণী ও রাজেন। তৃতীয়বারের চা খাওয়া শেষ করে রাজেন বলল, ‘ব্যাপারটা তো আর হালকাভাবে নেওয়া যাচ্ছে না। তলায় তলায় যে এতটা গড়িয়েছে, তুমি কিছুই কি বুঝতে পারোনি?’
‘একদমই পারিনি। সবকিছু আনফোল্ড হতে লাগল তুমি চলে যাবার পর। আর কী অদ্ভুত দ্যাখো, ঘটনাগুলো ঘটতে লাগল আমার বিনা চেষ্টাতেই। মীনা চ্যাটার্জিকে ইন্টারভিউ করার জন্য আটদিন আগে তুমি আমাকে পৌঁছে দিলে, সেখানে ওর ফ্ল্যাটে একটা ছবি দেখে ফেললাম। ব্যস, সেই শুরু হল। সেখানেই সুভাষ গায়েনের সঙ্গে পরিচয়, তার কাছ থেকে অনেক কথাই জানতে পারলাম। আবার তোমাকে খাওয়াব বলে ইলিশ মাছ কিনে সেটা উপরের ফ্ল্যাটে ফ্রিজে রাখতে গিয়ে আলাপ হল সুজাতা গুপ্তর সঙ্গে, তার কাছেও আবার অনেক কথা জানতে পারলাম। মহারানির রাশিফল লেখার জন্য কুন্তীদের কাছ থেকে ইংরিজি ম্যাগাজিন আনলাম, তাতে শোভনেশ সম্পর্কে এমন একটা প্রবন্ধ দেখলাম, তুমিও সেটা পড়েছ, লেখাটা আমাকে এমনই চাগিয়ে তুলল যে, নিজেই উদ্যোগ নিয়ে খোঁজখবর করতে লাগলাম।’
