রাজেন চুপ করে শুধু তাকিয়ে রইল। রোহিণীর মন ভিজল কিনা সেটা না বুঝে আর এগোতে ভরসা পাচ্ছে না।
‘তৃতীয়টা?’
‘তুমি যে একা থাক, সেটা খেয়াল হল ডাক্তার এখানে নামিয়ে দিয়ে যাবার পর। কিন্তু আমি তো এখনি চলে যাব।’
‘কীভাবে? সল্টলেকে রাত সাড়ে এগারোটায় বাস, ট্যাক্সি, সাইকেল রিকশ, এমনকী ঠেলাগাড়িও পাবে না, শুধু মশা আর রাস্তার কুকুর ছাড়া।’
‘তাহলে হেঁটেই বাড়ি যাব। একরাতের জন্য এই দুটো জিনিস রাখতে নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না?’
‘এখান থেকে সাদার্ন অ্যাভিনু হেঁটে যাবে?’ এই মাঝরাতে? ভালো…তাই যাও।’
রাজেন কথা না বলে ধীরপায়ে এগিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল ফ্ল্যাট থেকে। দরজা বন্ধ হতেই রোহিণী বন্ধ পাল্লার কাছে দ্রুত এসে আই হোলে চোখ রাখল। রাজেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। দরজাটা খুলে গলা বাড়িয়ে রোহিণী চাপাস্বরে বলল, ‘বীরত্ব? শিভালরি? খুব হয়েছে।’
কোনো জবাব এল না বা রাজেনের প্রত্যাবর্তনও ঘটল না। একতলার সিঁড়ি থেকে ড্রাইভওয়েতে বেরিয়ে এসে রাজেন গেটের দিকে যাচ্ছে, তখন দোতলার বারান্দা থেকে গলা ভেসে এল, ‘ও মশাই, এত রাতে বেরোচ্ছেন যে? আপনার না রুনিদিকে পাহারা দেওয়ার কথা?’
রাজেন থতমত হয়ে মুখ তুলে তাকাল। বাইরের দেওয়ালে জ্বলা ইলেকট্রিক আলোয় তার মনে হল, সেই মেয়েটিই, যে ওয়াটার বটল হাতে রোহিণীকে বলেছিল, ‘ওয়ান্ট এনি হেল্প?’
‘ও বলল পাহারার দরকার নেই।’
‘বললেই হল? আপনি ওপরে আসুন।’
রীতিমতো হুকুম। দোনামনা করে রাজেন দোতলায় উঠতেই দেখল সেই মেয়েটিই, তার ফ্ল্যাটের দরজা ভেজিয়ে ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে।
‘পাহারা লাগবে না মানে? আমি নিজের কানে শুনেছি, থ্রেট করে গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি আজ সকালেই ওকে বলল, অচল করে দেব। তার মানে মার্ডার করবে রুনিদিকে। এমন বিপদের মধ্যে একা রয়েছে আর আপনি ওকে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন?’
‘আমি তো এসবের কিছুই জানি না!’ রাজেন হতভম্ব। ‘আমাকে তো এসব কিছুই বলল না!’ তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে তার মাথার মধ্যে।
‘আশ্চর্য লোক বাপু! যান, শিগগিরি ওপরে যান।’
‘কিন্তু, ও একা…আমি কী করে…’
‘আপনিই তো সেই লোক, যিনি রুনিদিকে বিয়ে করবেন, রাইট?’
‘হ্যাঁ, না, মানে…ও আমাকে বিয়ে করবে।’
‘তাহলে রাতে থাকতে অসুবিধে কোথায়?’
‘আমার দিক থেকে তো…।’
‘আশ্চর্য লোক তো আপনি! দেখতে তো ম্যানলিই লাগছে, করেন কী?’
‘ক্রিকেট খেলি, এঞ্জিনিয়ারও।’
‘গেট ক্র্যাশিং কাকে বলে জানেন? দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ুন। আসুন…আস্তে কথা বলবেন, সবাই ঘুমোচ্ছে।’
‘ক্র্যাশিংয়ের শব্দে তো ঘুম ভেঙে যাবে!’
‘সেভাবে ক্র্যাশ নয়।’ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে কুন্তী পিছনে তাকিয়ে বলল, ‘রুনিদির কিছু এথিক্স আছে তো। পিউরিটান ধরনের মানুষ…আপনি এইখানে দাঁড়িয়ে থাকুন। ক্র্যাশ আমি করব।’
বেল টিপতে গিয়ে, কী ভেবে, কুন্তী দরজায় খুটখুট টোকা দিল। সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেল। রোহিণী প্রথমে কুন্তীর মুখে তারপর মুখের পাশ দিয়ে দৃষ্টিটা সিঁড়ির দিকে পাঠিয়ে খুঁজতে শুরু করল।
‘তুমি আবার যে? ঘুমোওনি?’
‘আমার জিনিসগুলো নিতে এসেছি।’ কুন্তী ভিতরে ঢুকে এল। ‘পল্টুর জুতোটা কোথায় রেখেছেন?’
‘শোবার ঘরে। কিন্তু কাল সকালেও তো নিতে পারতে?’
‘না এখনি দরকার। অপরিচিত একটা পুরুষমানুষ ফ্ল্যাটে রাতে থাকবে, পল্টুও নেই, লোকটা কেমন তাও জানি না! হাতের কাছে কিছু তো রাখা দরকার।’
‘কে থাকবে তোমার ফ্ল্যাটে? রাজেন!’
‘ওনার নাম রাজেন বুঝি?…ইসস ভদ্রলোক নীচে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রুমাল দিয়ে যেভাবে চোখ মুছছিলেন, দেখে বড়ো মায়া হল।’
‘রাজেন কাঁদছিল!’
‘আমি দৌড়ে নেমে গেলাম। উনি বললেন, রোহিণী আমায় তাড়িয়ে…।’
কুন্তীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রোহিণী তির বেগে সিঁড়ির দিকে ছুটল। কুন্তী ছিটকে পড়েছিল দেওয়ালে। নিজেকে দাঁড় করিয়ে একগাল হেসে সে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকাল।
রাজেনকে টানতে টানতে ভিতরে আনল রোহিণী।
‘রুনিদি, আমি কী তাহলে—’
‘হ্যাঁ, দয়া করে এবার গিয়ে ঘুমোও। তোমাকে আর বারান্দায় বসে নজর রাখতে হবে না।’
‘কিন্তু এখনও তো আপনাদের—’ কুন্তী চিন্তিত মুখে থেমে গেল।
‘ওহহ কুন্তী! তুমি আর একটা কথা যদি বলেছ…রাজেন, এত হাসির কী আছে? একটু আগে তো গেটের কাছে দাঁড়িয়ে বাচ্চচাছেলের মতো কাঁদছিলে, লজ্জা করে না? …কুন্তী, মাসিমা যদি দেখেন তুমি মাঝরাতে ফ্ল্যাটের বাইরে, তাহলে কী কাণ্ডটা হবে ভেবে দেখেছ কী?’
‘মাসিমা দেখবেন কী করে? তিনি তো এতবড়ো একটা আফিংয়ের গুলি আর এক বাটি দুধ খেয়ে সেই যে বুঁদ হয়ে গেলেন, তারপর আমিই তো ওনাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। রুনিদি তাহলে কি উনি—’
‘হ্যাঁ, উনি আজ রাতটা আমাকে পাহারা দেবার জন্য এখানে থাকবেন…এটা কী খুব হাসির কথা যে হাসছ?’
‘আপনি সবার মুখে শুধু হাসিই দেখছেন। পল্টু না থাকলে আমার যে কী কান্না পায়, সেটা আর আপনি বুঝতে চাইছেন না, ওর কথা ভেবে আমার ঘুম আসে না বলেই বারান্দায় বসে মশার কামড় খাই। গঙ্গা ব্যানার্জির গুন্ডাদের উপর নজর রাখতে আমার বয়ে গেছে।’ কথাগুলো বলে থমথমে মুখে কুন্তী দরজার দিকে এগোল।
‘কুন্তী আমি খুব দুঃখিত। সত্যিই এটা আমার বোঝা উচিত ছিল।’ রোহিণী এগিয়ে এসে কুন্তীকে বুকে জড়িয়ে ধরল। ‘এম্মা, বুড়ো মেয়ের চোখে জল!’ রোহিণী ওর মাথার উপর গাল চেপে ধরল। কপালে চুমু খেল।
