রোহিণী আই হোলে চোখ রাখল। কী কাণ্ড! লোক কোথায়? মুখ তুলে কলিং বেল যন্ত্রটার দিকে তাকাল। এটাই কী বেজেছে, না অন্য কোনো ফ্ল্যাটে?
‘টিং টং।’
তাড়াতাড়ি সে আই হোলে চোখ রাখল। কেউ নেই। মাথা কাত করে আই হোল দিয়ে দু—পাশে যতটা দেখা যায়, দেখল। একটা আরশোলা পর্যন্ত নেই। বেলের সুইচটা ল্যান্ডিং—এ দরজার পাশে, ভিতর থেকে সেটা দেখা যায় না। কেউ একজন দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বেল টিপছে।
রোহিণীর গলা শুকিয়ে এল। বুকের মধ্যে স্পন্দনের শব্দ সে কানে শুনতে পাচ্ছে। দু—হাতে সমগ্র শরৎচন্দ্র আঁকড়ে সে বলে উঠল—কে? কিন্তু গলা দিয়ে একটু হাওয়া বেরোনোর শব্দ ছাড়া আর কিছু বেরোল না।
‘টিংটিং।’
আবার। ক—টা বাজে এখন? দশটা? বারোটা? যতটাই বাজুক, সারা বাড়ি, সারা এলাকা এখন নিঝুম এই সময় তার ফ্ল্যাটে ঘণ্টা বাজাবার মতো লোক পৃথিবীতে কে আর থাকতে পারে, একমাত্র গঙ্গাদার পাঠানো খুনিরা ছাড়া! কথাটা ভাবামাত্রই তার সারা দেহ শক্ত হয়ে উঠল। আর একটা শীতল অনুভব বুক থেকে তলপেটে নেমে এল।
‘কে?’ এবার গলা দিয়ে শব্দ বেরোল। মস্তিষ্ক কাজ করেছে। ‘কে এত রাতে?’
‘আঁমি ভূত।’ নাকিসুরে ভূতের গলা ভেসে এল দরজার পাশ থেকে। হাঁফ ছাড়ল রোহিণী। খুনিরা কলিং বেল টিপে আর যাই হোক ফাজলামি করবে না।
‘কে তুমি? মাঝরাতে লোকের বাড়িতে বেল টিপে ইয়ার্কি মারা হচ্ছে? মেরে মাথা ভেঙে দেব।’ রোহিণী একহাতে শরৎচন্দ্রকে শটপাট করার ভঙ্গিতে ঘাড়ের কাছে ধরে অন্য হাত দরজার হাতলে রাখল।
ধপ করে একটা শব্দ হল। ভারী কিছু একটা যেন মেঝেয় ফেলল।
‘আমি খুঁব বিঁপন্নঁ। আঁশ্রয় চাঁই রাঁতেঁর মঁতো। আঁমি আঁপনাঁর ঘাঁড় মঁটকাব নাঁ, আঁমি ভঁদ্দরলোঁক ভুঁত।
শব্দ না করে সন্তর্পণে রোহিণী দরজার হাতল ঘোরাল। পাল্লাটা এক সেন্টিমিটার মতো ফাঁক করে সে একচোখ দিয়ে তাকাল।
একটা লম্বা খয়েরি রঙের ক্যানভাস আর চামড়া মোড়া ব্যাগের একটা কোণ আর তাতে ঝোলানো ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ব্যাগেজ টিকিট সে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথার মধ্যে সাইক্লোন আর টর্নাডোর মিশ্রণে ওলটপালট করা তুমুল একটা বিপর্যয় ঘটে গিয়ে বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পাইয়ে দিল।
এক ঝটকায় দরজাটা খুলেই হাতের বইটা নীচের সিঁড়ির দিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে রোহিণী লাফিয়ে ভূতের গলা জড়িয়ে ঝুলতে শুরু করল দুই হাঁটু পিছনে মুড়ে। আর রাজেন ভীত চোখে তাকিয়ে রইল সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা রোগা মেয়েটির দিকে, যার একহাতে ঝুলছে ওয়াটার বটল অন্য হাতে হ্যাক স্য।
‘এই ছাড়ো ছাড়ো, আমার গায়ে অত জোর নেই যে, গন্ধমাদন তুলতে—’
‘আঁমি শাঁকচুঁন্নি, এঁইবাঁর ঘাঁড় মঁটকাঁব।’ গলা জড়ানো দু—হাত দিয়ে টান দিল রোহিণী। রাজেনের মুখটা নীচু হতে হতে নাকের সঙ্গে নাক ঠেকে গেল। তারপর রোহিণীর হাঁ করা মুখের মধ্যে ঠোঁট দুটি ঢুকিয়ে নিশ্চিন্ত হল।
‘আমি ভালোবাসি।’
‘আমি তা জানি।’
‘কিন্তু এটা জান কী, সিঁড়িতে একজন দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে?’
‘দেখুক। সারা পৃথিবী দেখুক। কিছু কিছু জিনিস দেখিয়ে বড়ো সুখ হয়।’
‘সেকেন্ড ইনিংসে জিরো করেছি।’
‘আমার সেকেন্ড ইনিংসে ব্র্যাডম্যান খেলবে।’
‘আমি আর খেলব না, রিটায়ার করব।’
‘খেলা কখনো ফুরোয় না, এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে সরে যায় শুধু।’
খুক খুক শব্দ হল।
‘রুনিদি, এখন রাত সওয়া এগারোটা।’ গম্ভীর স্বরে কুন্তীর চাপা ধমক শোনা গেল। রাজেনের গলা থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে রোহিণী মেঝেয় পা রাখল। কাঁচুমাচু মুখে রাজেন তাকিয়ে রইল কুন্তীর দিকে।
‘ওয়ান্ট এনি হেল্প, রুনিদি?’
‘ইয়েস। তুমি যদি এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমোতে যাও, তাহলে—’
‘ইনি?’
‘আমার পাহারাদার।’
‘আপনি কি এখন সেফ হ্যান্ডে?’ কুন্তীর গলায় কিঞ্চিৎ উৎকণ্ঠা।
‘না।’
মেঝে থেকে রাজেনের ক্রিকেট গিয়ার্সের ভারী ব্যাগটা এক হাতে, সুটকেসটা অন্য হাতে তুলে নিয়ে রোহিণী পা দিয়ে দরজার পাল্লাটা খুলে ভিতরে যেতে যেতে বলল, ‘রাত্তিরে ভূতের হাতে সেফ থেকেছে পৃথিবীতে এমন মেয়ে দেখাতে পারবে?’
দরজা বন্ধ হল।
হাতে ধরা বইয়ের কোণা থ্যাঁতলানো মলাটের দিকে তাকিয়ে কুন্তী অনুযোগের সুরে বিড়বিড় করল, ‘শরৎচন্দ্রকে ছুড়ে এই দশা হল, মাসিমা দেখলে আমার যা হবে না!’
দু—হাতের মোট মেঝেয় নামিয়ে রেখে রোহিণী এবার গম্ভীরমুখে রাজেনের দিকে তাকাল। ওর চোখের ভাষাটা পড়ে নিয়ে রাজেন আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছে, তার আগেই তীক্ষ্ন প্রশ্ন হল: ‘এখন, এই সময়ে, কী ব্যাপার? জানো, আমি এখানে একা থাকি।’
‘একে একে উত্তর দিচ্ছি। প্রথমে, এখন কেন? কারণ চল্লিশ মিনিট আগে দিল্লির প্লেন দমদমে নেমেছে। সেখান থেকে মাল খালাস করে বেরিয়ে এক ডাক্তারের গাড়িতে লিফট পেয়ে এখানে এখন, এই সময়ে। দ্বিতীয়টা হল, কী ব্যাপার? কাল খেলা শেষ হবার পরই রাতের প্লেনে জয়পুর থেকে দিল্লি আসি। ভেবেছিলাম, ভোরের ফ্লাইটে কলকাতা চলে আসব। কিন্তু সেই ফ্লাইট ক্যানসেল হয়ে গেল। গ্রাউন্ড স্টাফের একজনকে সাসপেন্ড করায় অ্যাজিটেশন, কর্মবিরতি, তারপর অবধারিত পুলিশ, লাঠিচার্জ, ফলে প্লেন আর উড়ল না। অবশেষে আলোচনা, সাসপেনশন প্রত্যাহার করে প্লেন উড়ল বিকেলে। তাতে জায়গা পেলাম না। রাত সাড়ে আটটার ফ্লাইটে সিট পেলাম প্রায় হাতে—পায়ে ধরে। প্লেনে পাশের সিটেই এক ডাক্তার। ক্রিকেটের খবর রাখে। বাড়ি সল্টলেকে। দমদমে তাকে নিতে গাড়ি এসেছিল। আমাকে বলল, উলটোডাঙার মোড় পর্যন্ত লিফট দিতে পারি। ওখানে ট্যাক্সি পেয়ে যাবে। উলটোডাঙায় এসে মনে হল, তোমার এত কাছে এসে একবার দেখে যাব না?’
