সন্ধ্যার সময় কুন্তী এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেল ভিডিয়ো ফিল্ম দেখে সময় কাটাবার জন্য।
‘দুপুরে বেরিয়ে দোকান থেকে দুটো ক্যাসেট ভাড়া করে এনেছি, ক্যারাটে আর কুংফু ফিল্ম। আমার মনে হল, এখন আপনার এইরকম ছবিই দেখা দরকার। মনের জোর বাড়বে, তা ছাড়া কীভাবে অ্যাটাক আসে, কীভাবে সামলে পালটা অ্যাটাক করতে হয় সে সম্পর্কে একটা আইডিয়াও পেয়ে যাবেন।’
‘দুটো ফিল্ম দেখেই শিখে যাব? বলো কী। হাত—পা ছোড়াছুড়ি, ডিগবাজি খাওয়া, লাফ মারা, টেবিল চেয়ার ছোড়া, এসবের দরকার হবে না?’
‘হবে হবে, এত তাড়াহুড়োর কী আছে। আমি তো বলেছি, শুধু আইডিয়া পাওয়ার জন্য দেখা দরকার।’
ভিসিপি—তে ক্যাসেট গুঁজে দিয়ে, সুইচ টিপে কুন্তী বসল টিভি সেটের সামনে। গলা নামিয়ে রোহিণী বলল, ‘মাসিমা কোথায়?’
‘এই বেরোলেন, নীচের ফ্ল্যাটে বন্ধুর সঙ্গে পরচর্চা করতে।’
প্রথম ছবিটা শেষ হবার পর কুন্তী একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘এবার বুঝতে পারলেন, কীভাবে আপনাকে পজিশ্যন নিয়ে দাঁড়াতে হবে! দরজাটা খুলেই চট করে কীরকম সরে যেতে হবে!’ বলতে বলতে সে ক্যাসেট বদল করে দ্বিতীয়টা ভরছিল। রোহিণী ‘উহহ’ বলে কাতরে উঠল।
‘কী হল রুনিদি?’
‘কলিক পেনের মতো একটা যন্ত্রণা…কালকেও হয়েছিল। আমি বরং এখন যাই, শুয়ে থাকলেই সেরে যাবে। তুমি বরং একটা গল্পের বই—টই দাও।’
‘তা দিচ্ছি। কিন্তু মাসিমাকে যে বলেছিলাম, রুনিদিকে রাতে খেতে বলেছি। আপনার জন্য উনি রান্না করেছেন। খেয়ে যেতে পারবেন না?’ কুন্তী উৎকণ্ঠিত চোখে তাকাল।
‘আবার কেন এসব করা।’ পেটে হাত রেখে রোহিণী বহু কষ্টে কথাগুলো বলল। তা কী রান্না করেছেন?’
‘এঁচোড়ের কী যেন, বোধ হয় কোপ্তা। কিন্তু এখন কী হেভি মশলা দেওয়া এসব আপনার—’
‘উচিত কুন্তী, উচিত। গুরুজনদের অসম্মান করা হবে, যদি আমি এখন না খাই। কত যত্ন করে রান্না করা!’
আধঘণ্টা পর শরৎ—সমগ্র হাতে নিয়ে কুন্তীদের ফ্ল্যাট থেকে রোহিণী যখন বেরোল, মাসিমা তখনও ফেরেননি। কুন্তী তাকে তিনতলায় পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। রোহিণী আপত্তি জানায়।
‘দোতলা থেকে তিনতলায় যাব, তাতেও ভয়?’
‘বুঝছেন না। সিঁড়িটা নির্জন। ফট করে যদি চারটে লোক ওপর থেকে নেমে আসে! ফিল্মে তাহলে কী দেখলেন?’
‘যদি নেমে আসেই, আমরা দুটো মেয়ে তাহলে কী করতে পারি?’
‘নাহ আপনাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। ঠিক আছে যা ইচ্ছে হয় করুন।’ কুন্তী দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বন্ধ দরজার দিকে স্নেহ ভরে তাকিয়ে রোহিণী মাথা নাড়ল আর মনে মনে বলল, পাগলামি করে তুমি যা তুলে এনেছ, সেটাই এখন আমার রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছে।
সিঁড়ির মাঝামাঝি রোহিণীর সঙ্গে দেখা হল হৃদয়রঞ্জনের। একটু উদবিগ্ন চোখে তার দিকে তাকিয়েই নেমে যাচ্ছিলেন। রোহিণী পিছন থেকে ডেকে বলল, ‘মাসিমা কেমন আছেন?’
‘ভালোই।’ তারপর ইতস্তত করে হৃদয়রঞ্জন বললেন, ‘বিকেলবেলায় বেরিয়েছে, এখনও ফিরল না।’
‘মাসিমা? কোথায় গেছেন?’
‘জানি না। কিছু বলেও যায়নি। একটা লোক এসে ওর সঙ্গে কথা বলে চলে গেল। কী যে কথা হল জানি না। তারপরই বলল, আমি একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, এখনি আসছি। শুধু এইটুকু বলে কাপড় বদলে বেরোল।’
‘দেখুন, এখনি হয়তো এসে পড়বেন। তবে বিকেলবেলায় এভাবে বেরোনো উচিত হয়নি। যে লোকটা এসেছিল, তাকে দেখতে কেমন?’
‘মাঝবয়সি, ধুতি শার্ট পরা, রোগা মতন।’
হৃদয়রঞ্জন যে বর্ণনা দিলেন, সেরকম লোক কলকাতা রাস্তায় অন্তত হাজার পঁচিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। রোহিণী কয়েক সেকেন্ড হৃদয়রঞ্জনের চশমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আপনি এখন কোথায় যাচ্ছেন?’
‘কোথাও না। গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখি।’ খোঁড়া পায়ের জন্য দুলে দুলে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। তখন রোহিণীর মনে হল, সকালবেলাতেই সে ভেবেছিল, সুজাতা গুপ্তও বিপদের মুখে এসে পড়েছেন। গঙ্গাদা ওঁকে অচল করবার চেষ্টা করবেন। তিনিই হয়তো কাউকে দিয়ে এই বৃদ্ধাকে ডাকিয়ে নিয়ে গেছেন।
বিষণ্ণ মনে রোহিণী ফ্ল্যাটে ফিরে এসে শরৎসমগ্র বইটা শোবার ঘরের খাটে রাখল। একমাস ধরে, দিনে দু—ঘণ্টা টানা পড়ে গেলেও বইটা শেষ করা যাবে না। ম্যাক্সিটা পরার জন্য সে নিরাবরণ হল। আড়চোখে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে পেটে আর কোমরে হাত বোলাল। পিঠের দিকে হাত ঘুরিয়ে পেশি খামচে ধরল। অস্ফুটে বলল, এখনও জমেনি। তারপর মনে হল, শরৎচন্দ্রের পুরো কালেকশনটা যদি চিত হয়ে বুকে রেখে, দিনে একঘণ্টা পড়া যায়, তাহলে শরীরের কতকগুলো জায়গার ব্যায়ামের আর দরকার হবে না।
টেবল ল্যাম্প জ্বেলে চিত হয়েই সে বই পড়া শুরু করেছিল। মিনিট পনেরো পরই চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। ধীরে ধীরে পাতা বুজে আসছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো ঘুম ঝরে পড়ছে। সে শুনতে পাচ্ছে, কোথায় যেন ঘড়ি বাজছে। কিন্তু বাজার ছন্দটা একটু যেন অন্যরকম। থেমে গিয়ে আবার বাজল। কিছুক্ষণ থেমে থেকে আবার বাজল। মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা জাগছে। বিরক্তি ধরছে। রোহিণী চোখ খুলল।
কী আশ্চর্য, এ তো তার ফ্ল্যাটেরই কলিং বেল বাজছে! এত রাত্রে কে? ধড়মড়িয়ে উঠে বসল রোহিণী। বুক থেকে বইটা মেঝেয় পড়ে ধপ করে শব্দ হল। বইটা কুড়োবার সময় দেখল, পল্টুর একজোড়া সরু মুখ জুতো খাটের নীচে, সোজা হয়েই চোখে পড়ল টেবলে জলভরা ওয়াটার বটল, স্ক্রু ড্রাইভার, টর্চ, স্কিপিং রোপ। টেবল ল্যাম্পের পাশে চুলের কাঁটা। সে হাওয়াই চটি পায়ে গলিয়ে ঘরের আলো জ্বালল। দরজার দিকে এগোল বইটা হাতে নিয়েই।
