‘তা এসো, বেল না বাজলেও এসো। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হলে যে মরে যাব।’
‘তাহলে সেই ভদ্রলোককে এখানে আসতে বলুন। পাহারা দেবার জন্য একজন পুরুষমানুষ থাকলে ভালোই হবে। ঠিকানা দিন, আমি গিয়ে খবর দিয়ে আসছি।’
‘সে এসে কী করবে, আমার সঙ্গে থাকবে?’
‘নিশ্চয়’।
‘বিয়ের আগেই?’
‘নিশ্চয়। রুনিদি আপনি বড্ড সেকেলে। বিয়ের আগে কী—’ কুন্তী থেমে গেল। ঠিক কী ধরনের শব্দ ব্যবহার করা উচিত বুঝতে না পেরে সে অর্থহীন হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেলল। রোহিণী মনে মনে সিঁটিয়ে হাসিটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করল। ভাগ্যিস রাজেন এখন জয়পুরে। সবেমাত্র তো কাল খেলা শেষ হয়েছে।
‘কুন্তী, সেই ভদ্রলোক আমার থেকেও সেকেলে, প্রচণ্ড কনজারভেটিভ, ভীষণ পিউরিটান। এখানে এসে আমাকে পাহারা দিতে বললে যে কী কাণ্ড বাধাবে…উরি বাবা, ভাবলেই শিউরে উঠছি।’
‘না না তাহলে দরকার নেই বলার। আপনি নির্ভয়ে থাকুন। আমি তো আছিই। পল্টুটা যদি এখন থাকত…আরও চারদিন লাগবে ওর ফিরতে। জানেন, পল্টু দেড়মাস ক্যারাটে শিখেছিল। একদিন আমাকে দেখাতে গিয়ে হাতটাকে কাটারির মতো করে ঘাড়ের এইখানে এমন একটা—।’
‘অ্যাঁ, মারল! তুমি নিশ্চয় পড়ে গেলে…খাটে?’
‘ঠাট্টা করছেন? আমি চললাম।’
কুন্তী সত্যিই চলে গেল। ও বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই রোহিণীর মন থেকে হালকা স্বাচ্ছন্দ্যটা ঝরে গিয়ে থমথমে গুমোট একটা আবহাওয়া তৈরি হয়ে উঠল। এখন তার কিছুই করার নেই এবং যথেষ্টই করার মতো কাজ রয়েছে। কোনটা সে বেছে নেবে?
গঙ্গাদা অস্বস্তিতে পড়েছেন একটা ব্যাপারে আর সেইজন্যই এই সকালে মোমিনপুর থেকে সল্টলেকে ছুটে আসা। সুজাতা গুপ্ত যদি মামলাটা খুঁচিয়ে তোলেন, তাহলে গঙ্গাদা মুশকিলে পড়বেন। সুজাতা গুপ্তকে নিরস্ত করার ভার নেওয়ার জন্যই তাকে বলতে এসেছিলেন। কিন্তু কথাবার্তা যেভাবে এগোল তাতে গঙ্গাদা বুঝে গেছে, কোনো সাহায্যই তার কাছ থেকে পাবেন না, বরং পাবেন বিরুদ্ধতাই। এক্ষেত্রে গঙ্গাদা প্রথমে কী করবেন?
রোহিণী ভেবে দেখল, সুজাতা গুপ্ত বিপজ্জনক হয়েছেন দিগম্বর বর্ধন লেনে গিয়ে একটা খবর জেনে যাওয়ায়। গঙ্গাদা নিশ্চয় বুঝে গেছেন, কাজটা গীতা বা বিশ্বনাথের। ওই দু—জনকে অচল করে দিলে সুজাতার চেষ্টাটা ভস্মে ঘি ঢালার মতো ব্যাপারই হবে।
গঙ্গাদা অসম্ভব ধূর্ত লোক। কাল রাতে মীনার ঘরে যা ঘটেছে, টেলিফোনের মধ্য দিয়ে সেটা জেনে ফেলার ব্যাপারটা কেমন চট করে বুঝে নিলেন। তাহলে তো উনি প্রথমে টার্গেট করবেন গীতা, বিশ্বনাথ আর পরমেশকেও। কিন্তু তিনজনকে অচল করে দেওয়াটা তো ছোটোখাটো ব্যাপার নয়, হইচই পড়ে যাবে। এক্ষেত্রে গঙ্গাদার স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে?
রোহিণী পায়চারি শুরু করল। সাধারণ বুদ্ধিতে বলে : বিশ্বনাথ, গীতা, পরমেশরা এত বছর যখন চুপ করে ছিল, তখন চুপ করেই থাকবে। ওদের কোনো মাথাব্যথা নেই শোভনেশ সম্পর্কে। কোর্টঘর, পুলিশ, উকিল ব্যারিস্টার এসব ঝামেলায় জড়াতে হলে যথেষ্ট টাকাও তো চাই। ওরা কী দুঃখে এতে জড়াবে? তা ছাড়া নারানের বাপের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেই ওরা মুখে চাবি আঁটবে। সুজাতা গুপ্ত ওদের কথার ভিত্তিতেই মামলা তুলতে চান। তা এই বৃদ্ধাকে সরিয়ে দিলেই তো গঙ্গাদা ঝামেলামুক্ত হতে পারবেন।
পায়চারি থামিয়ে রোহিণী ভাবল, উপরে গিয়ে ব্যাপারটা সব খুলে বলে হুঁশিয়ার করে দেওয়া দরকার ‘সাবধানে থাকবেন মাসিমা। গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি কিন্তু আপনাকে অচল করে দেবার চেষ্টা করবেন।’
উপরে যাবার জন্য শাড়ি বদলাতে রোহিণী শোবার ঘরে এল। আয়নায় নিজেকে দেখে নিয়ে চিরুনি তুলে চুলে দিতেই রুপোর কাঁটাটা মেঝেয় পড়ে গেল। কাঁটাটা তোলার জন্য নীচু হতেই চোখে পড়ল, খাটে বালিশের পাশে কুন্তীর টেপ রেকর্ডারটা। নিয়ে যেতে ভুলে গেছে। তারপর তার মনে হল, এই টেপেই তো রয়েছে গীতা আর পরমেশের ভাইটাল কনফেশন! গঙ্গাদা টেপ করার কথাটা জানেন না। কিংবা ওদের কাছ থেকে পরে শুনতেও পারেন, সালোয়ার কামিজ পরা, একটা রোগা মেয়ে এসে তাদের কথা বলার সময় একটা ছোটো বাক্স সামনে রেখেছিল। ধূর্ত গঙ্গাদা বুঝে যাবেন বাক্সটা কী? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা নেবেন মেয়েটার! ভাববার চেষ্টা করবেন, কে এই রোগা মেয়েটা? কুন্তীকে উনি দেখেননি।
গঙ্গাদা তাহলে আবার আসবেন। টেপ করার পিছনে আমার হাত আছে কিনা জানার চেষ্টা করবেন। যতক্ষণ না জানছেন, ততক্ষণ আমাকে অচল করার কাজে নামবেন না। টেপটা না হাতিয়ে উনি কোনোভাবেই নিজেকে নিরাপদ বোধ করবেন না।
রোহিণী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে খাটে বসে পড়ল, রেকর্ডারটা কোলে নিয়ে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবল, এটাই এখন আমার সিকিউরিটি। গঙ্গাদা যত তাড়াতাড়ি এটার কথা জেনে যান, ততই নিরাপদ হওয়া যাবে। সুজাতা গুপ্তর কাছে কে মুখ খুলেছে, সেটা জানার জন্য গঙ্গাদা নিশ্চয় এখান থেকে সোজা দিগম্বর বর্ধন লেনে যাবেন। তার মানে এতক্ষণে হয়তো জেনে গেছেন, শোভনেশকে জেলে পাঠানোর জন্য তাঁর সাক্ষ্যলোপের ব্যবস্থার কথা কেউ একজন প্রমাণ করার উদ্যোগ নিতে পারবে। সুতরাং গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি…এবার তুমি পাগলের মতো টেপটা খুঁজে বেড়াও।
