কুন্তী আসছে। দু—হাতে উপচে পড়ছে অস্ত্র।
‘রুনিদি, এইগুলোই পেলাম। হাসবেন না, হাসবেন না, খুব কাজে দেবে। পল্টু যখন রাতে ক্লাব থেকে টং হয়ে ফিরে এক একদিন গণ্ডগোল বাধাবার উপক্রম করে, তখন এগুলো…আপনাকেও হেল্প করবে, অন্তত কিছুক্ষণ তো গুন্ডাফুন্ডাদের আটকে রাখতে পারবেন।’
বলতে বলতে কুন্তী টেবিলের উপর জিনিসগুলো রাখল। প্লাস্টিকের দুটি খালি ওয়াটার বটল দেখিয়ে বলল, ‘এগুলো ছুড়ে মারার জন্য। জল ভরে দিচ্ছি, দেখুন এক—একটা কী ভারী হয়ে যাবে। আর যদি স্ট্র্যাপ ধরে বনবন করে ঘোরাতে পারেন, আচ্ছা আপনি টিভিতে ওলিম্পিক্সের হ্যামার থ্রো দেখেছেন?’ কুন্তী বেসিনের কল থেকে ওয়াটার বটলে জল ভরতে ভরতে প্রশ্ন করল।
‘দেখেছি মনে হচ্ছে।’ রোহিণী হাসবে না ঠিক করে ফেলেছে।
‘এই দেখুন এইভাবে হ্যামার ঘোরায়।’
কুন্তী কাঁধে ঝোলানোর ফিতের মতো স্ট্র্যাপটা দু—হাতে ধরে ওয়াটার বটলটা বৃত্তাকারে ঘোরাতে শুরু করল। ‘পল্টু আর এগোতে পারত না। অবশ্য বসে পড়লে মাথার ওপর দিয়ে বটলটা বেরিয়ে যাবে। এটা কিন্তু খেয়াল রাখবেন।’
‘পল্টু কি বসে পড়ত?’
‘চট করে বসেই, ডাইভ নিয়ে একদিন আমার পা দু—হাতে জড়িয়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে ফেলে দিয়েছিল। য়ু মাস্ট বি কেয়ারফুল অ্যাবাউট দিজ গুন্ডাস।’
‘তোমাকে ফেলে দিয়েছিল, তাহলে শব্দও হয়েছিল, তাইতে মাসিমার ঘুমও ভেঙে গেছিল নিশ্চয়।’
‘নো নো রুনিদি, এই সময় আমরা দু—জনেই একদম সাইলেন্ট থাকি, একটা কথাও বলি না। পাশের ঘরেই তো মাসিমা। আর হ্যাঁচকা টানে মেঝেয় তো পড়িনি, খাটের ওপর পড়েছিলুম।’
‘সব্বোনাশ! শ্রীমান পল্টু তখন কী করল?’
‘পল্টু তখন…’ কুন্তীর ওয়াটার বটল ঘোরানো বন্ধ হয়ে গেল। ভ্রূ কুঁচকে, চোখ সরু করে সে সন্দেহজনক চাহনি রাখল রোহিণীর মুখে।
‘ওয়েল, পল্টু ইজ নট আ গুন্ডা। সুতরাং তখন একজন ভদ্রলোকের যা করা উচিত, সে তাই—ই করল। আর এই বিষয়ে কথা নয়। একটা কথাও নয়। আমরা এখন গুন্ডাদের ফেস করার জন্য প্রিপেয়ার্ড হচ্ছি, পল্টুকে সামলানোর জন্য নয়, সুতরাং ব্যাপারটাকে একভাবে দেখাটা ঠিক হবে না। পল্টু যেভাবে ডজ করেছিল, মনে রাখবেন ও একবছর জুনিয়র বেঙ্গল টিমে ফুটবল খেলেছে, গুন্ডারাও যে সেইভাবে ডজ করতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি ওয়াটার বটল ডিফেন্স ভেদ করে ওরা এগিয়ে আসে, তখন আপনি এইটে হাতে নেবেন।’ কুন্তী একটা তিন ব্যাটারির টর্চ এগিয়ে ধরল।
রোহিণী টর্চটা হাতে তুলে ওজন পরীক্ষা করল। নিজের মাথায় হালকাভাবে ঠুকে বলল, ‘বেশ ভারীই দেখছি। এটাকে কী কখনো পল্টুবাবুর ওপর প্রয়োগ করে দেখেছ?’
‘না, রুনিদি, আমাকে ও একটা চান্সও দেয়নি। বরং আমার মাথাতেই একদিন ঠকাস করে মেরে একটা আলু তৈরি করে দিয়েছিল।’
‘কিন্তু আমি কী আলুর চাষ করার জন্য ঠকাস করব, না নারকোল ভাঙার মতো করে মারব?’
‘আপনি নারকোল ভাঙারই চেষ্টা করবেন। কিন্তু মাথা যদি খুব শক্ত হয়, আপনি নিশ্চয় জানেন এক—একটা নারকোল খুব বেয়াড়া ধরনের হয়, এক ঘায়ে ভাঙে না, তা হলে কী করবেন?’
‘চেঁচাব।’
‘আহহা, সে তো করবেনই। কিন্তু অ্যাটাকটা তো কিছুক্ষণ সামলাতে হবে! নখ দেখি?’ রোহিণীর হাত তুলে ধরে আঙুল পরীক্ষা করে কুন্তী হতাশ হল। ‘বড্ড সেকেলে আপনি। নিজেকে ডিফেন্ড করার কোনো ব্যবস্থাই করেননি। নখগুলো সব কেটে রেখে দিয়েছেন?’
‘আমার দাঁত কিন্তু খুব স্ট্রং।’
‘না, না, কামড়াবেন না যাকে তাকে। খুব আনহাইজিনিক। পল্টুকে পর্যন্ত আমি কামড়াইনি কখনো। আপনি বরং চুলের এই কাঁটাটা রাখুন। কিন্তু রুনিদি, কাঁটা তো খোঁপায় গুঁজে রাখতে হবে, আর আপনি একেলে ফ্যাশনে চুল কেটে কী মুশকিল বাধিয়েছেন বলুন তো! কাঁটা গুঁজব কোথায়?’
কুন্তীর হাত থেকে রূপোর কাঁটাটা নিয়ে রোহিণী ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মাথার ঠিক উপরের চুলের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে বলল, ‘এইভাবে রাখলেই হবে।’
‘মাসিমার দেওয়া, খুব সাবধান, হারায় না যেন। তবে নেহাতই যদি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে চোখেই ঢুকিয়ে দেবেন। আর এটাও যদি ফেইল করে, তাহলে লাথি। কিন্তু রুনিদি আপনার ওই ফিনফিনে হালকা জুতোয় বা চটিতে তো কাজ হবে না।’
‘শুধু পায়েই লাথি মারব।’
‘ধ্যেৎ, তাতে কিস্সু হবে না। আমি বরং পল্টুর সরু মাথাওলা একজোড়া জুতো দিয়ে যাব। ওটা সবসময় পরে থাকবেন। অবশ্য একটু ঢিলে হবে, তা হোক। আর এই স্কিপিং রোপটাও রেখে দিন। টুল বক্সে তো বিশেষ কিছু পেলাম না, তবে এই স্ক্রু ড্রাইভারটা হয়তো কাজ দিতে পারে। আচ্ছা হ্যাক স্য কি দরকার হবে বলে মনে হচ্ছে?’
‘না না, ওটা লাগবে না, তুমি নিয়ে যাও। করাত চালাবার সময় পাব না। যা দিয়েছ, এই যথেষ্ট।’
কুন্তীর মুখের উদবেগ কিন্তু কাটল না। ঠোঁট কামড়ে জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে খুবই চিন্তিত স্বরে সে বলল, ‘যথেষ্ট নয়, যথেষ্ট নয়। আপনি নিশ্চয় মনে মনে হাসছেন, কিন্তু এইসব ছোটোখাটো জিনিসই বিপদের সময় যা কাজ দেয়…রামচন্দ্র পর্যন্ত কাঠবেড়ালিদের হেল্প রিফিউজ করেননি।… অচল করে দেব বলে থ্রেট করে গেছে লোকটা, হালকাভাবে কথাটাকে কিন্তু নেবেন না। আমি অবশ্য সজাগ থাকব, জানালা দিয়ে গেটের দিকে নজরও রাখব। আপনার ফ্ল্যাটের বেল বাজলেই উঠে আসব।’
