‘লাঠি রড দিয়ে কী হবে?’
‘গুন্ডারা যদি আসে, তাহলে আটকাতে হবে।’
‘আপনি দরজা খুলবেন কেন? আগে তো আই হোল দিয়ে দেখে নেবেন, কে বেল বাজাল। যদি দেখেন অপরিচিত লোক, তাহলে একদমই খুলবেন না। ওরা তো আর দরজা ভেঙে ঢুকবে না।’
‘তা বটে।’
‘আর এখন একদমই বাড়ির বাইরে যাওয়া চলবে না।’
‘সে কী! না বেরোলে আমার চলবে কেন?’
‘বলছি বেরোনো বন্ধ। কুন্তী ধমক দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। রোহিণী অবাক হয়ে দেখতে থাকল ওর মুখটা, আর তার মনে হল হঠাৎ যেন কত বড়ো হয়ে গেছে এই মেয়েটা। সারা মুখে ছড়িয়ে আছে মায়ের উৎকণ্ঠা, উদবেগ আর স্নেহ।
‘কী দরকার আছে বেরোনোর? যা যা দরকার আমায় বলবেন, আমি এনে দেব। গল্পের বই দিয়ে যাচ্ছি, রেডিয়ো রয়েছে, আর খাটে শুয়ে জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যায়, ব্যস আবার কী চাই?’
‘কতদিনের জন্য?’
‘তখন কী একটা কথা শুনলাম, লোকটা যেন বলল, তোমার বিয়েরও ব্যাপার আছে…কী সেটা?’
‘কী আবার, বিয়ে মানে বিয়ে।’ রোহিণী মনে মনে অপ্রতিভ হতে লাগল। মেয়েটা তো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবার কথা বার করতে শুরু করবে।
‘কার সঙ্গে?’
‘একটা পুরুষ মানুষের সঙ্গে।’
‘ন্যাচারালি। কিন্তু ডুবে ডুবে কতদিন জল খাওয়া হচ্ছে? তাই বলি, এমন একটা মেয়েকে কী কখনো পুরুষরা একা ফেলে রেখে দেবে। পল্টুর সঙ্গে বাজি ধরেছি, ও বলেছে ডেফিনিটলি লোকটা ডাক্তার, ফরেনে থাকে, চিঠিতে প্রেম চলছে। আমি বলেছি, এখানকার লোক, ফিল্ম ডিরেক্টর কী আই এ এস। ঠিক বলেছি?’
‘তোমরা তাহলে এতদূর পর্যন্ত গবেষণা করে ফেলেছ? কী বাজি ধরেছ?’
‘আমি জিতলে আইসক্রিম খাব, ও জিতলে চকোলেট।’
‘হায় ভগবান, আমাকে নিয়ে এত কম টাকার বাজি! মরে যেতে ইচ্ছে করছে কুন্তী, এত কম আমার মূল্য। নাহ আমি কলিং বেল বাজলেই, আই হোল দিয়ে না দেখেই দরজা খুলে দেব। তাতে যা হয় হোক।’
.
‘প্লিজ রুনিদি, ওটা করবেন না। আপনি যাকে বিয়ে করবেন তাকে খবর দিন। চটপট বিয়ে করে সেফ জায়গায় গিয়ে বসবাস করুন। ওই গঙ্গাপ্রসাদের কথাবার্তা, চাউনি—টাউনি আমার একদমই ভালো মনে হল না।’
‘তোমার টেপরেকর্ডারে আর কারোর জবানবন্দি রয়ে গেছে নাকি?’ কথা ঘোরাবার জন্য রোহিণী বলল।
‘না, শুধু গীতা আর পরমেশ সেনগুপ্তকেই টেপ করেছি। গীতার হাজব্যান্ড বিশ্বনাথের সঙ্গে দেখা হয়নি। ভাবছি, আজ কী কাল একবার যাব।’
‘আর যাওয়ার দরকার নেই। যা জানার ছিল, সেটা তো গঙ্গাদা নিজের মুখেই বলে দিলেন। আমি তো আর ডিটেকটিভ নই যে, সাক্ষ্য প্রমাণ জোগাড় করে কালপ্রিটকে পুলিশের হাতে তুলে দেব। যা ঘটে গেছে, তাকে আবার কবর থেকে তুলে ঘটনার কঙ্কাল নিয়ে খটখটানোর কোনো মানে হয় না। বহরমপুর জেল থেকে যাবজ্জীবন পাওয়া দু—জন কনভিক্ট পালিয়েছে, এই খবরটা কাগজে পড়েই কেন জানি মনে হয়েছিল, বোধহয় ওদের একজন শোভনেশ। আর কীরকম যেন একটা ভয় ধরল। সেই থেকে এই সাত—আট দিনে গড়াতে গড়াতে ভয়টা স্নো বল, হয়ে আজ এখানে পৌঁছেছে। এখন আর শোভনেশ নয়, গঙ্গাদাই হয়ে উঠেছেন ভয়ের কারণ।’
‘রুনিদি, হাতের কাছে কিছু জিনিস রাখা ভালো। যদি এসে পড়ে, তাহলে, বুঝলেন না ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে হয়তো দরজাটা নিঃশব্দে খুলে ঢুকে পড়ল, তখন কী করবেন?’
‘চেঁচাব।’
‘লোকজন এসে পড়ার আগে পর্যন্ত ফাইট করতে হবে তো! দাঁড়ান আমি আসছি।’
কুন্তী প্রায় ছুটেই বেরিয়ে গেল। রোহিণী খোলা দরজা দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
মানুষের জীবনে এক—একটা এমন সময় আসে, যখন তার মনে হয় পা থেকে মাথা, দেহটার মধ্যে বাতাস ছাড়া আর কিছুই নেই। শুধু রক্ত, মাংস, হাড়ই নয় কোনো ইন্দ্রিয়েরই অনুভব শক্তি নেই, চিন্তা করার ক্ষমতাও নেই। রোহিণীর জীবনে দু—তিনবার এইরকম সময় এসেছিল। এখন আবার সে ওই ধরনের একটা অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য সে ধস্তাধস্তি শুরু করল। এখন কোনোভাবেই বোধ ও বুদ্ধি রহিত হয়ে ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া চলবে না।
গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি মোটেই সহজ লোক নন। মৃত সুভাষ গায়েনই তো তার প্রমাণ। মীনা চ্যাটার্জি তো বেঁচে আছে, আর একটা নজির হয়ে। এবার রোহিণীকেও এমন কিছু একটা করবেন, যাতে সে অচল হয়ে যায়। কী করতে পারেন গঙ্গাদা?
তার চোখ পড়ল খবরের কাগজে। আজ সকাল থেকে একবার উলটেপালটেও দেখা হয়নি। রোহিণী কাগজটা তুলে প্রথমেই পিছনের পাতা ওলটাল। কাল জয়পুরে রঞ্জি ট্রফির খেলা শেষ হয়েছে। যা ভেবেছিল, তার থেকেও বাজেভাবে খেলাটার ফল দাঁড়াল।
বাংলার ইনিংসে পরাজয়
মাট্টুর ৮ উইঃ ৪৭ রানে
কাগজটা টেবিলে নামিয়ে রাখতে গিয়ে রোহিণী আবার তুলে ধরল। সরাসরি জেতার ইচ্ছায়, ঝড়ের গতিতে তিন ঘণ্টায় ২০২ রান তুলে বাংলার সবাই আউট। ইনিংস ও ১৫ রানে তো হারল। কিন্তু রাজেনের রান কত? পড়তে পড়তে তার মুখে হালকা হাসি ফুটল আর ক্রমশ তার মনে হতে লাগল, এখন যেন তার দেহের মধ্যে ভরাট হবার কাজ শুরু হচ্ছে। রক্ত, মাংস, হাড়, মেদ সব আবার ফিরে আসছে।
মাট্টুর প্রথম বলেই রাজেন বোল্ড হয়েছে।
সিঁড়িতে হালকা দ্রুত পায়ের শব্দ। রোহিণী সতর্ক হল। বোধ হয় সেই অফ স্টাম্পের বাইরের ইন সুইঙ্গারটা, ছেড়ে দেবার জন্য ব্যাট তুলে রাজেন ঠকে গেছে। হায় রে পজিটিভ অ্যাফারমেশন। সেঞ্চুরিটা পাওয়ার জন্য কী প্রচণ্ড টেনশ্যনের মধ্যে যে পড়েছিল, সেটা দ্বিতীয় ইনিংসে প্রথম বলেই আউট হওয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে। যে মুহূর্তে সেঞ্চুরি পাওয়া হল, জয়পুর থেকে কলকাতায় টেলিফোনে কথা বলল, তখনই টানটান হয়ে গুটিয়ে থাকা উত্তেজনা স্প্রিংয়ের মতো খুলে যাচ্ছিল। প্রেশার থেকে বেরিয়ে এসে রাজেন আর কনসেনট্রেট করতে পারেনি। রোহিণীর মনে হল, রাজেনের টেনশ্যনটা যে কত গভীর এবং যন্ত্রণাকর ছিল, এখন সে নিজে তা অনুভব করতে পারছে। আর সেটা বুঝতে শুরু করেই সে তার চারপাশের জগৎ সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। তার ভিতরের শূন্যতাবোধটা কেটে যাচ্ছে। রাজেনের শূন্য তাকে ভরাট করে দিল।
