‘না না, আর দরকার নেই।’
‘দুটো রুটি খেতে খেতেই তো ঝোল ফুরিয়ে গেল, বাকি রুটিগুলো কি শুকনো চিবোবে?’
অনন্ত হাসবার চেষ্টা করল। ওর গলায় সবুজ মালাটা নেই দেখে তার ভালো লাগল। মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা স্বস্তি পাচ্ছে।
‘ওব্যেস নেই দুপুরে রুটি খাওয়ার।’
‘তা হলে ভাত নিয়ে আস না কেন? অনেকেই তো আনে টিফিন কেরিয়ারে।’
‘ভাত আমি খেয়েই আসি।’ অনন্ত কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলল, ‘আমাদের টিফিন কেরিয়ার নেই।’
‘দশরথের ভাতের হোটেলে তো খেতে পারো।’
অনন্ত চুপ করে খেয়ে যেতে লাগল। হোটেলে ভাত খাবার পয়সা নেই বলতে তার কুণ্ঠা হল। প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য সে বলল, ‘তোমার বাবা খেতে গেছে?’
‘আমি খেয়ে এলে বাবা খেতে যায়। বাবা ফিরে এলে আমি ঘরে যাব। আজ অবশ্য সিনেমায় যাব।’ গৌরী হাসল। অনন্তের মনের মধ্যে গুমোট জমে ভারী হয়ে উঠল। নিশ্চয় সেই ছোকরাটার সঙ্গেই যাবে। ওর বাবার কি এতে সায় আছে? থাকতে পারে। হয়তো ওর সঙ্গে গৌরীর বিয়েও দেবে।
‘একা যাবে?’
কথাটা বলেই অনন্ত লজ্জা পেল। সামান্য এইটুকু আলাপে এমন প্রশ্ন করা উচিত হয়নি। মুখ থেকে হঠাৎ—ই বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু গৌরী এমন গায়েপড়া কৌতূহলে যেন খুশিই হল।
‘একা একা সিনেমা দেখতে আমার ভালো লাগে না।’
‘আমারও। অবশ্য সিনেমা আমি খুব কমই দেখি, যুদ্ধের বই দেখতেই ভালো লাগে।’
লোকদুটো দাম চুকিয়ে চলে গেল। দর্জির দোকান থেকে হাঁক শোনা গেল, ‘একটা চা দিয়ে যাস গৌরী।’
‘আমার ভালো লাগে রগড়ের বই দেখতে।’
‘চার্লি চ্যাপলিনের বই দেখেছ? আমাদের স্কুল থেকে একবার দেখাতে নিয়ে গেছল, দারুণ হাসির।’
‘স্কুলে পড়তে?’ গ্লাসে লিকার ঢালতে ঢালতে গৌরী বলল।
‘হ্যাঁ।’
‘পড়া ছাড়লে কেন?’
‘সংসার চালাতে হবে তো। বাবা হঠাৎ বাসচাপা পড়ে মারা গিয়ে…দুটো বোন একটা ভাই আর মা রয়েছে।’
গৌরী চামচ নাড়া বন্ধ রেখে ওর দিকে তাকাল। ও—চোখে সহানুভূতি, দরদ। অনন্তের গুমোট কেটে যাচ্ছে।
‘তুমিই বড়ো?’
‘হ্যাঁ। বড়োছেলেরাই তো বাবার জায়গা নেয়।’
ভারী গলায় কথাটিকে কেটে কেটে বলল। বলার সময় গৌরীর মুখের ভাব লক্ষ করছিল। কিছু বুঝতে পারল না।
দর্জির দোকানে চা দিয়ে ফিরে এসে গৌরী বলল, ‘বাবা টাকাকড়ি রেখে যায়নি?’
‘কিচ্ছু না শুধু তেরো হাজার টাকা পেয়েছি প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে, বোনেদের জন্য তোলা আছে, আর মায়ের ভরিচারেক গয়না।’
গৌরীর বাবাকে আসতে দেখে অনন্ত বেঞ্চ থেকে উঠল। পয়সা দেবার জন্য শার্টের পকেটে হাত ঢোকাতেই গৌরী চাপাস্বরে দ্রুত বলল, ‘দিতে হবে না।’
অনন্ত কয়েক সেকেন্ড বিভ্রান্তের মতো তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে কমলা বাইন্ডার্সের দিকে এগোল। বলতে গেলে গৌরীর সঙ্গে এই তার প্রথম পরিচয় অথচ এত কথা সে যে বলতে পারল, এটাই তাকে অবাক করছে। মেয়েটার চাহনিতে কী যেন একটা আছে যা তাকে সাহসী করে দিল। কিন্তু তাই বলে বিনি পয়সায় আর সে খাবে না, একবারই যথেষ্ট বরং কিছু একটা উপহার দিয়ে সে শোধ দেবে।
সন্ধ্যায় অনন্ত বাড়ি ফেরার সময় হাতিবাগানে একটা রেস্টুরেন্টে গৌরী আর সেই ছোকরাকে দেখতে পেল। টেবলে পাশাপাশি ওরা। ছোকরা প্লেটের দিকে মুখ নামিয়ে কাঁটা চামচে মাংখখণ্ড গাঁথায় ব্যস্ত। রাস্তার দিকে একবার যেন তাকাল। অনন্তকে বোধ হয় দেখতে পায়নি কিন্তু সে ওর গলায় সবুজ মালাটা দেখতে পেয়েছে। গৌরীর পরনে হলুদ রঙের শাড়ি।
ক্লান্ত, মন্থর পায়ে যখন সে বাড়ি পৌঁছোল তখন নিজেকে তার মনে হচ্ছিল বুড়ো হয়ে গেছে।
কে বা কারা যেন বলেছি, ‘অনন্ত খুব ভালো ছেলে।’ তখন তার বয়স কত ছিল? সাত, আট, হয়তো নয়। তখন তার চারপাশের জগৎ ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছিল; তখন মানুষজন সম্পর্কে সচেতনতা শুরু হচ্ছিল, তাদের সে আলাদা আলাদা করে বুঝে প্রত্যেককে নিজস্ব ছকের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিল। এখন থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের ঘটনা মনে করতে গিয়ে তার মনে হচ্ছে স্মৃতি যেন তার সঙ্গে চালাকি করছে। বহু মানুষ, বহু ঘটনা ধূসর হয়ে গেছে, কিছু কিছু মানুষ চেতনায় রয়েছে আলোকিত কুয়াশার মতো।
একা নির্জন অন্ধকার ঘরে অনন্ত তার অতীতের দিকে দৃষ্টি রাখতে গিয়ে মানুষ, ঘটনা, দৃশ্য, শব্দ, রং এখন আর আলাদা করতে পারছে না। রেবতীর চলে যাওয়াটা তাকে যতটা নাড়া দিয়েছে একদা গৌরীর জন্য তার হৃদয় কি এইভাবেই মুচড়ে উঠেছিল? অমর যেদিন বলল, ‘আমি আর এখানে থাকব না’ সেদিনও কি এমন করে অসাড় হয়ে গেছল তার অনুভব ক্ষমতা।
অমরকে সে চড় মেরেছিল। কারণটা আজও তার মনে আছে। স্কুল ফাইনালে প্রথম পঁচিশজনের মধ্যে অমর স্থান পেয়েছিল। অবিনাশকাকা এক বাক্স সন্দেশ কিনে এনেছিল। শীলা উপরে জেঠিমাদের কয়েকটা দিয়ে আসে, সামনে উৎপলদের বাড়িতেও অনন্ত নিজে গিয়ে পাঁচটা সন্দেশ দেয়। উৎপলের দাদু অবাক হয়ে বলেছিল, ‘তিনটে লেটার পেয়েছে, বলিস কী!’
তার এক সপ্তাহ পরেই দাদু মারা যায়। হাই ব্লাডপ্রেশার ছিল, হৃৎপিণ্ডও বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে গেছল। বিকেলে বারান্দায় চেয়ারেই চলে পড়ে। দামি খাটে, প্রচুর ফুলে সাজিয়ে, সংকীর্তন করে ওকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। অমরও সঙ্গে গেছল। শ্রাদ্ধে অনন্তদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে গেছল উৎপল। পরিবেশনকারীদের অন্যতম ছিল অমর। প্রায় আটশো লোক নিমন্ত্রিত হয়েছিল। কাপড় দিয়ে রাস্তার অর্ধেকটা ঘিরে টেবলে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। সেদিন অনু মায়ের পুরোনো সিল্কের শাড়ি পরেছিল। অলু উপর থেকে ইস্ত্রি এনে বাড়িতে কাচা ফ্রকটাকে মোটামুটি কাজের বাড়িতে যাওয়ার যোগ্য করে তুলেছিল। অনন্ত নিজেদের সদরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল, খাওয়া শেষ করে একদল বেরিয়ে এলে নতুন পাত পড়ামাত্র গিয়ে বসে পড়বে। তখন অমর তার পাশ দিয়েই বাড়িতে ঢোকে। সে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কী রে, চলে এলি যে?’ অমর অস্পষ্ট স্বরে কী যেন বলেছিল।
