গঙ্গাপ্রসাদ তাকিয়ে রইলেন রোহিণীর মুখের দিকে। ধীরে ধীরে চোখ দুটো সরু হয়ে এল। কী যেন ভেবে দেখছেন। রোহিণী স্থির চোখে তাকিয়ে। ঠোঁটে ভেসে উঠল পাতলা হাসি।
‘কাল তুমি মীনাকে ফোন করেছিলে।’
‘হ্যাঁ। অচঞ্চল স্বরে রোহিণী বুঝিয়ে দিল, সে জানে গঙ্গাপ্রসাদ এখন কী ভাবছে।
‘কাল মীনার ফ্ল্যাটে কী ঘটেছে জান?
‘কাজটা করার কি খুব দরকার ছিল?’ রোহিণী লুকোচুরির বদলে মুখোমুখি হওয়াটাই শ্রেয় মনে করল। শোবার ঘর থেকে কুন্তীর উঁকি দেওয়া মুখ সে দেখতে পাচ্ছে।
‘হ্যাঁ দরকার ছিল। শোভনেশের ছবি আমার চাই।’
‘বিক্রি করে টাকাগুলো নেবার জন্য?’
‘হ্যাঁ।’
রোহিণী অবাক হয়ে দেখল, কীভাবে এক পলকের মধ্যেই একটা মুখ তার চরিত্র বদল করল। গঙ্গাপ্রসাদের স্তিমিত শান্ত চোখ দুটি কোটর ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মসৃণ সুডৌল গাল দুটি থেকে যেন চামড়া টেনে তুলে ফেলে, কর্কশ ভাঁজবহুল চামড়া লাগিয়ে দেওয়া হল। ঠোঁট দুটি থেকে মিষ্টি হাসিটা ভেঙে ভেঙে পড়ল।
‘হ্যাঁ, আমার টাকা চাই। আমি টাকা করতে ভালোবাসি।’
‘যেকোনো ভাবেই হোক?’
‘হ্যাঁ, যেকোনো ভাবেই হোক।’
‘চুরি, জাল, জোচ্চচুরি, খুন…”
‘হ্যাঁ তাই। টাকা করতে হলে এভাবেই করতে হয়।’
‘সততা, সাধুতা, বন্ধুত্ব এসবের তাহলে কোনো মূল্যই নেই?’
‘এইসব বস্তাপচা কথাগুলো আর আউড়ো না। আমি ওগুলো বাচ্চচা বয়স থেকেই জানি। শোনো রোহিণী, তুমি আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনে ফেলেছ। তাতে আমার সামান্য অসুবিধা হতে পারে।’
‘সামান্য?’
‘হ্যাঁ সামান্য। তুমি শুধু জেনেছ কিন্তু কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না। শোভুর ছবিগুলো আমার কাছেই আছে। যদি পারো তো খুঁজে বার করো।’
‘আমার কোনো আগ্রহ নেই।’
‘নেই তো মীনা, সুভাষ গায়েন, সিদ্ধার্থ সিঙ্গি, সুজাতা গুপ্ত এদের সঙ্গে দেখা করেছ কেন?’
‘নিছকই কৌতূহল!’
‘খুব বিপজ্জনক দিকে তোমাকে নিয়ে গেছে এই কৌতূহলটা। এখন আমায় ভাবতে হচ্ছে, তোমাকে সচল রাখা আর উচিত হবে কিনা।’
‘অচল করে দেবেন! কীভাবে?’
‘যেভাবে সুভাষ গায়েন অচল হয়েছে।’
রোহিণীর সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গাপ্রসাদও উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে নিজেকে শুনিয়েই যে, বললেন, ‘বাহাদুরিটা বোকারাই দেখাতে চায়, তার ফল যে কী হতে পারে—’
‘গঙ্গাদা!’ রোহিণীর গম্ভীর কঠিন গলার স্বরে গঙ্গাপ্রসাদের হাতটা দরজার হাতল থেকে নেমে হল।
‘আপনি আমাকে অচল করার ব্যবস্থাই করুন। বস্তাপচা কথা শুনে শুনেই আমি বাচ্চচা বয়স থেকে বড়ো হয়ে উঠেছি। এখনও বিশ্বাস করি, জীবন তো একটাই, তাই সেটা খুব দামি জিনিস। কোনোভাবেই অচল করা উচিত নয়, সেটাকে পরিপূর্ণভাবে ভোগ করাই উচিত। আর ভোগ করতে হলে একটা শক্ত মেরুদণ্ড থাকা দরকার। তাই না?’
গঙ্গাপ্রসাদ জবাব না দিয়ে ভ্রূ তুলে শুধু তাকিয়ে রইলেন। রোহিণী উত্তেজনায়, আবেগে এবং রাগে থরথর করে কাঁপছে।
‘আপনি জানেন কি না জানি না, আমার মেরুদণ্ডটা কিন্তু বেশ শক্তই। আর জীবনকে পরিপূর্ণভাবে পাওয়ার ইচ্ছাটাও প্রচুর। দোষেগুণেই মানুষ, আমি তার ব্যতিক্রম নই। আমার একটা বড়ো দোষ, আমি ভীতু নই। …এবার বেরিয়ে যান।’
রোহিণী তর্জনী তুলে দরজাটা দেখাল। গঙ্গাপ্রসাদ আঙুলটার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সারামুখে বিষাদ ছড়িয়ে বললেন, ‘হাততালিই দেওয়া উচিত, কিন্তু তোমার জন্য এত বেশি দুঃখ হচ্ছে যে—এই শরীর, এর ধ্বংস আমি চাই না। কিন্তু তুমি নিজেই তা ডেকে নিলে।’ মাথা নাড়লেন খেদ জানাতে। ‘সাহসী হওয়া তো ভালোই। তোমার সঙ্গে আর আমার দেখা হবে না, এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। যাই হোক, সুখ দুঃখ নিয়েই তো মানুষের জীবন, তাই না?’
গঙ্গাপ্রসাদ দরজা খুলে বেরিয়ে সন্তর্পণে, শব্দ না করে তা বন্ধ করে দিলেন। রোহিণী রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাস নিভিয়ে ফুটে ফুটে জল উবে যাওয়া শুকনো কেটলিটা নামিয়ে রেখে ফিরে এল। কুন্তী শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার চোখে মুখে দিশেহারা ভাব।
‘রুনিদি, লোকটা কে? এই কি সেই গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি?’
‘হ্যাঁ।’ রোহিণী ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে একদৃষ্টে টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘কী যেন বলছিল, অচল টচল করে দেবে! মানে কী কথাটার?’
‘খুব সোজাই মানেটা। হার্ট বিট বন্ধ করে দেবে…ডেথ!’
‘অ্যাঁ!’ কুন্তীর হাত আপনা থেকেই মুখে উঠে এল। ‘আর আপনি ওইভাবে জবাব দিলেন?’
রোহিণী মুখ তুলে কিছুক্ষণ কুন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ দিলাম। তুমি তো সবই শুনেছ, কী মনে হচ্ছে এখন আমাকে? বোকা?’
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কুন্তীর মুখের ভাব তিন—চারবার বদলাল। আপন মনে সে বলল, ‘আমি কীরকম যেন কনফিউজড হয়ে যাচ্ছি রুনিদি। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনাকে। জীবন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই।’
‘নেই তো কী হয়েছে, আস্তে আস্তে হবে।’ মৃদ নরম স্বরে রোহিণী বলল। ‘অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই জীবনকে বুঝতে পারা যায়। কখনো পালাবে না, ভয় যখন হাত বাড়াবে, তখন তেড়ে যাবে। হাতটা ধরে ভেঙে দেবে। আর যদি পালাও, তাহলে সারাজীবনই পালাতে হবে। সেই জীবনটা কি খুব কাম্য?’
কুন্তী চুপ করে রইল। রোহিণী উঠে দাঁড়িয়ে ওর পিঠে একটা থাবড়া কষিয়ে বলল, ‘ভাবনাচিন্তা পরে করবে, এখন আত্মরক্ষার ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। আমার কাছে ঝাঁটা ছাড়া তো আর কোনো অস্ত্রই নেই। তোমাদের কাছে কিছু আছে কি? লাঠি, রড বা ওই ধরনের কিছু?’
