‘আপনি মুখ বন্ধ করেছিলেন? কিছু বলা বারণ ছিল কি?’
‘ছিল না? দাদা যখন সিগারেট কিনতে বাড়ি থেকে বেরুল, আমি তখন ফাঁক বুঝে ঘরে ঢুকে সে মাগিকে বললুম, ‘অ্যাই তোর পেটে বাচ্চচা আছে কিনা দেখব…দাদার বাচ্চচা,…পাগলের বাচ্চচা, ওটাও পাগল হবে। দেখি তোর পেটটা। সে মাগি যা ভয় পেল না। কী বলব! দাদার প্রথম বউটাও অমন ভয় পেয়ে জানলার দিকে ছুটে গেছিল চেঁচিয়ে লোক ডাকতে। এ মাগিও ঠিক তাই করল। সেবার যা করেছিলুম, এবারও তাই করলুম। দৌড়ে গিয়ে ঠ্যাং দুটো ধরে উলটে দিলুম আর টুক করে জানলা দিয়ে নীচে পড়ল। আর বাবা পাগলের ঝাড় বাড়তে পারবে না, কী বলো, ঠিক করেছি কিনা?’
‘বীণা তাহলে আপনিই ফেলে দিয়েছিলেন?’
‘তা না হলে পড়বে কেন? ও এলেই আমি লুকিয়ে লুকিয়ে ওর—।’
কুন্তী রিড টিপে টেপ বন্ধ করে, ফরোয়ার্ড লেখা রিডটা টিপল। খর খর শব্দে দ্রুত টেপ ঘুরে যেতে লাগল কিচির মিচির শব্দ করে। রোহিণী জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল কুন্তীর দিকে।
‘এই জায়গাটা আর শুনতে হবে না। বুড়োটা বীণার অ্যানাটমি নিয়ে খুব ভালগার ফিলদি ওয়ার্ডস ইউজ করেছে।’ স্কুলের দিদিমণির মতো গম্ভীর স্বরে কুন্তী বলল।
‘আমার সম্পর্কেও বলেছে নাকি?’
‘না। বললে তো এই রেকর্ডারটা ওর মাথায় ভাঙতাম। আচ্ছা, এবার শুনুন।’
পরমেশের গলা আবার ফিরে এল টেপে।
‘দু—জনে খালি ঝগড়াই করে গেল, আমি বসে আছি কখন দাদা ছবি আঁকা শুরু করবে বলে। শুরুই আর হয় না। তারপর হঠাৎ বীণা চিৎকার করে উঠল।’
‘কী বলল?’
‘তোমায় তা বলব কেন?’
‘বলুন না।’
‘না বলব না। তুমি ধাপ্পা দিয়ে সব শুনে নিচ্ছ। ওই গঙ্গা ব্যাটাও আমার কাছ থেকে শুনেছিল। বলল আমার জন্য মেয়ে দেখবে…হুঁ হুঁ বাবা, আর আমি ভুলছি না। আগে মেয়ে দেখাও, তবে মুখ খুলব। এই মুখে চাবি দিলুম।’
কুন্তী টেপ বন্ধ করে হতাশ চোখে তাকাল।
‘বুড়ো আর মুখ খুলল না। কত করে বললুম, কিন্তু চাবি আর ঘোরাল না।’
‘মাথা খারাপ হয়েছে বটে, কিন্তু বদ্ধ উন্মাদ এখনও হয়নি। তবে মাঝে মাঝে হয়ে যায়। তখন দানবের আত্মা যেন ভর করে, অন্য সময় খুবই স্বাভাবিক। দুই ভাই পরস্পরকে খুব ভালোবাসত। পাগল হয়ে যাবার ভয়ে দু—জনেই সিঁটিয়ে থাকত। পরমেশকে বিয়ে করতে দেয়নি শোভনেশ, কারণ পাগলের বংশ সে এই জেনারেশনেই শেষ করে দিতে চেয়েছে।’
‘তাহলে উনি আপনাকে আবার বিয়ে করলেন কেন? আপনাদের মধ্যে কী—?’
রোহিণী কুন্তীর আড়ষ্ট কৌতূহল ভেঙে দেবার জন্যই বলল, ‘সেকসুয়াল সম্পর্ক? হ্যাঁ ছিল, আই টুক প্রিকশনস। আর এই বিষয়ে কথা নয়।’
‘রুনিদি চায়ের জল কিন্তু অনেকক্ষণ চড়িয়ে এসেছেন।’
‘ওমা, তাই তো!’ রোহিণী ধড়মড়িয়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই কলিং বেল বেজে উঠল। দরজায় গিয়ে আই হোলে চোখ রেখেই সে প্রচণ্ড অবাক হল। গঙ্গাপ্রসাদ দাঁড়িয়ে। পিছন ফিরে হাত নেড়ে সে কুন্তীকে ইশারা করল, রেকর্ডারটা শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখার জন্য। কুন্তী বিস্মিত চোখে তাকিয়েই তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে গেল রেকর্ডারটা হাতে নিয়ে।
‘আরে গঙ্গাদা, আপনি?’ রোহিণী দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বলল। ‘আসুন।’
‘গেছলুম লেকটাউনে একটা কাজে। ফেরার সময় মনে হল, যাই তোমাকে দেখে আসি।’
‘বসুন। চায়ের জল চড়িয়েছি।’
‘না না, চা—টা এখন খাব না।’ গঙ্গাপ্রসাদ ভিতরে এসে কুন্তী যে চেয়ারে বসেছিল, সেটিতেই বসলেন। কৌতূহলী চোখে চারধারে তাকাতে তাকাতে বললেন, ‘কত্ত বছর পর যে এলাম। চুনকাম করা দরকার। দরজাগুলোতেও রং করতে হবে।’ কথাটা বলেই খোলা দরজা দিয়ে রোহিণীর শোবার ঘরের ভিতরে তাকালেন। কুন্তীকে দেখা যাচ্ছে না।
‘আমি আগে চলে যাই, তারপর করাবেন।’
‘তুমি কি সত্যি সত্যিই মহারানিকে ছেড়ে দিলে?’ মৃদুস্বরে গঙ্গাপ্রসাদ জানতে চাইলেন।
‘সত্যি নয়তো কী? শোভনেশ সংক্রান্ত এইসব ব্যাপার—স্যাপার একদমই ভালো লাগছে না। ঠিক করেছি দিদির কাছেই চলে যাব।’
‘কিন্তু তুমি কাল যা বললে, তাতে তো আবার তোমাকে কোর্টে হাজির হওয়ার জন্য যে দরকার হবে। সুজাতা গুপ্ত যদি রি—ট্রায়ালের জন্য পিটিশ্যন করে, আর কোর্ট যদি তা অ্যাডমিট করে, তাহলে তো—’ কথা অসম্পূর্ণ রেখে তিনি উৎকণ্ঠা নিয়ে রোহিণীর মুখের দিকে তাকালেন।
‘করুক না পিটিশ্যন, তাতে আপনার কী?’
‘আমার কিছুই না, তবে শোভুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে আমাকে আবার ডাকতে পারে। তাহলে বুঝতেই পারছ, এই নিয়ে খবরের কাগজগুলো কী শুরু করবে। আমার কথা ছেড়ে দাও, তোমার বিয়েরও তো একটা ব্যাপার আছে, সেটা ভেস্তে যেতে পারে।’
রোহিণীর মনে পড়ে গেল রাজেনের বাড়ির লোকেদের কথা। ওর মা দাদা বউদি, সবাই রক্ষণশীল। নিজেদের বনেদিয়ানা সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ। এইরকম কেলেঙ্কারির খুনের মামলার সঙ্গে জড়িয়ে গেলে রাজেনদের বাড়িতে বউ হয়ে ঢোকা বোধ হয় যাবে না।
‘গঙ্গাদা, আমি তো কালই আপনাকে বললাম, সুজাতা গুপ্তকে থামাতে হবে। ওর আর শোভনেশের মধ্যে যে সম্পর্কের কথা আপনার কাছে শুনেছি, তাতে উনিও একটা অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়বেন।’
‘পড়বেনই তো। উকিল জেরা শুরু করলে কতদূর পর্যন্ত যাবে, তার কি কোনো সীমা আছে?’
‘আপনি ওকে থামাবার ব্যবস্থা করুন।’ স্বর নামিয়ে চক্রান্তকারীর মতো একটা ভঙ্গি গলায় এনে রোহিণী বলল।
