‘তোমার মনে আছে সেদিনের কথা?’
‘মনে থাকবে না? উঠোনে কাপড় শুকোতে দিচ্ছিলুম। দুপুরবেলা। দেখি বড়দা হনহনিয়ে বেরিয়ে গেটের দিকে যাচ্ছে। ওই পর্যন্ত, ওই যে ইটটা পড়ে রয়েছে, ওই পর্যন্ত গেছে, আর তখন দোতলার জানলা দিয়ে কে যেন চেঁচিয়ে কী বলল। মনে হল যে, দাঁড়াতে বলল। বড়দা দাঁড়াল না, আর তখনই ধপ করে শব্দ হল। আমি চমকে উঠে এগিয়ে গেলুম। বড়দাও ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে গেল। আমি দূর থেকে দেখলুম, বীণা হাত—পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছিল একটুও নড়ছে না। ভয়ে আমি একেবারে ঘরের মধ্যে ছুটে এসে বিছানায় উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লুম। বাব্বা, এমন মিত্যু জীবনে কখনো দেখিনি।’
‘আমি তো শুনেছি, তোমার বড়দাই নাকি বীণাকে জানলা গলিয়ে নীচে ফেলে দিয়েছিল।’
‘তাই কখনো সম্ভব নাকি? বড়দা তো তখন ঘরেই ছিল না।’
‘বীণা নিজেই ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিল?’
টেপ রেকর্ডার থেকে কয়েক সেকেন্ড কথা বেরোল না।
‘রুনিদি, গীতা হেজিটেট করছে।’
‘না দিদিমণি, আমি নিজের চক্ষে যখন ঝাঁপ দিতে দেখিনি, তখন কী করে তা বলি। আমি তো পড়ার শব্দ শোনার পর তাকালুম।
‘বড়দা যে ফেলে দেয়নি, এটা তো তুমি জানো?’
‘হ্যাঁ বড়দা তখন তো গেটের কাছে।’
‘বড়দার বউ ছিল না তখন?
‘না। কোথায় একটা নেমন্তন্ন ছিল, সকালেই বেরিয়ে গেছিল।’
‘তারপর তুমি কী করলে?’
‘আমার সোয়ামি, নারানের বাপ, বলল: পুলিশ টুলিশ আসবে, তোকে আর এখন এখানে থাকতে হবে না, বাপের বাড়ি চলে যা। আমি তক্ষনি নারানকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলুম। সাতদিন পর ফিরলুম। বড়দাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল, তার বউ একা রইল।’
‘কোনো আত্মীয়স্বজন কী বন্ধুবান্ধব তখন আসত না?’
‘কই কাউকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। তবে বড়দার এক বন্ধু আসত।’
‘কী নাম?’
‘নাম জানি না, নারানের বাপ বলতে পারবে। ওর সঙ্গে বড়দার বন্ধুটার আলাপ হয়েছিল।’
‘কী কথা হত ওদের?’
‘আমাকে সেসব কিছু বলত না। শুধু একদিন বলেছিল লোকটার মতলব আছে, খুব চালাক। বড়দাকে জেলে ভরে রাখতে চায়। তা নারানের বাপও খুব স্যায়না। লোকটাকে বলল, মাসে মাসে দুশো করে টাকা দাও তাহলে আমার বউ মুখে চাবি দিয়ে থাকবে। লোকটা রাজি হল। কিন্তু যেই বড়দা জেলে ঢুকল, অমনি টাকা দেওয়া বন্ধ করে বলল, কাজ চুকে গেছে, আবার কীসের টাকা? কী নেমকহারাম খচ্চচর লোক দেখেছেন? নারানের বাপ আমাকে বলেছিল, তুই একদম কারোর কাছে মুখ খুলিস না, তা হলে পুলিশে ধরবে। আমিও বাপু কারোকে কিছু বলিনি। এই তোমাকেই …একটা বুড়ি এসেছিল, তার কাছেই, আর তোমার কাছেই শুধু অ্যাদ্দিন বাদে মুখ খুললুম।’
‘বুড়িটা কে?’
‘বলল তো এককালে নাকি এখানে ভাড়া থাকত।’
‘তোমার স্বামী কখন আসবে?’
‘এখন ক—টা বাজে? একটার সময় খেতে আসবে।’
‘ঠিক আছে, আমি তখন আবার আসব। ওর সঙ্গেও আলাপ করতে ইচ্ছে করছে। তোমরা সব পুরোনো লোক, কত পুরোনো পুরোনো গল্প জানো এই বাড়ি সম্পর্কে।’
‘আপনি ছোড়দার সঙ্গে দেখা করুন, তবে ভালো করে তো কথা বলতে পারে না। মাথার ঠিক নেই। বোধ হয় বেশিদিন আর বাঁচবে না। ওর কাছে পুরোনো কথা জানতে পারবেন।’
‘এখন গেলে দেখা হবে? ঘুমোচ্ছেন না তো?’
‘না না উনি দুপুরে ঘুমোন না।’
কুন্তী রেকর্ডার বন্ধ করল। রোহিণী এই কথাগুলো সুজাতা গুপ্তর কাছ থেকে আগেই শোনায়, খুব রোমাঞ্চিত হল না। শুধু বলল, ‘গঙ্গাদা সম্পর্কে গীতার স্বামী বিশ্বনাথ যে কথাগুলো বলেছে, সেটা খুব ইন্টারেস্টিং।’
‘হ্যাঁ, তাই আমি পরমেশ সেনগুপ্তর সঙ্গে কথা বলেই নীচে নেমে আসি বিশ্বনাথের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু সেদিন ও খেতে আসেনি। তাই পরের দিন আবার যেতে হয়।’
‘পরমেশের সঙ্গে কী কথা হল?’
‘ওর সঙ্গে কথা বলা আর একটা চার বছরের বাচ্চচার সঙ্গে কথা বলা প্রায় একই ব্যাপার। আপনি এবার টেপটা শুনুন।’
কুন্তী টেপ রেকর্ডারের রিড টিপল। ‘রোহিণী! কে রোহিণী?’
পরমেশের ঘড়ঘড়ে সরু মেয়েলি গলা। তার কথা মাঝখান থেকে টেপে রেকর্ড করা হয়েছে। কুন্তী ফিসফিস করে বলল, ‘মিনিট কুড়ি এর আগে কথা বলেছি। টেপ করার মতো কিছু পাইনি।’
‘দাদার বউয়ের নাম ছিল রোহিণী। কিন্তু ওকে তো পাগল করে দিয়েছে!’
‘কে?’
‘আমার দাদা। দেয়নি?…তাহলে কে পাগল হল?’
‘কেউ হয়নি। আপনি ভুল করছেন, কেউ পাগল হয়নি।’
‘হ অ্যা অ্যা, বললেই হল। দাদা হয়নি? একদিন আমি নিজে দেখেছি, দাদা টেনে টেনে বউদির কাপড় ছিঁড়ছিল। বউদি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে তিনতলায় গেল। আমি তখনই বুঝে গেছলুম, হা হা হা হা,…বুঝে গেছলুম আমি বেঁচে গেছি, বুঝলে আমি বেঁচে গেছি।’
‘কী বেঁচে গেছেন?’
‘আমি আর তাহলে পাগল হচ্ছি না। একজনের পাগল হওয়ার কথা তো! পাওয়া হয়ে গেছে সেই একজনকে । তুমি জেলে গিয়ে দেখে এসো শোভনেশ সেনগুপ্ত পাগল হয়ে রয়েছে। …বুঝলে, আমার এবার একটা বিয়ে করতে হবে। …কত লোককে বলেছি, আমার বিয়ে দিয়ে দাও, কেউ আমার কথা শুনল না।’
‘সে কী! আপনার মতো লোকের বিয়ে হবে না, তাই কখনো হয়! আমি আপনার বিয়ে দিয়ে দোব। কীরকম মেয়ে আপনার পছন্দ বলুন তো?’
‘হে হে হে, ঠিক বলছ তো, নাকি ধাপ্পা দিচ্ছ?’
‘কেন, কেউ কী আপনাকে ধাপ্পা দিয়েছে নাকি?’
‘দেয়নি আবার! ওই মোটা বেঁটে গঙ্গা হারামজাদা! আমায় বলল, মুখবন্ধ করে থাকো, কাউকে কিচ্ছু বলবে না, তাহলেই তোমার জন্য মেয়ে দেখে বিয়ে দোব। তা আমি দু—বছর মুখ বন্ধ করে বসে রইলুম। ফোক্কা…দাদার যাবজ্জীবন জেল হল, আর গঙ্গাব্যাটা আমায় কলা দেখাল। আর এলই না এ বাড়িতে!’
