রোহিণী থমথমে মুখে দরজার দিকে এগোল।
‘আন্টি, আপনার ছানার ডালনা।’
‘থাক, এখন খাবার ইচ্ছে নেই।’
মুখ না ফিরিয়েই কথাগুলো বলে সে দরজা বন্ধ করে দিল। সামনেই গুপ্তদের ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজা। সিঁড়িটা ফাঁকা। কোথাও কোনো শব্দ নেই। রোহিণীর মনে হল, মীনার মতো তার ফ্ল্যাটেও তো গঙ্গাদা খুনি পাঠাতে পারেন।
.
নয়
কলিং বেল বাজল।
রোহিণী আই—হোলে চোখ রেখেই দরজা খুলে দিল।
‘এসো।’
‘টেপটা আমি এনেছি। অবশ্য সব কথা এতে নেই। কী করব বলুন, পল্টু অর্ধেকটাই দখল করে রেখেছে ডি জি গিলেসপির জ্যাজ দিয়ে। রুনিদি, কী অসাধারণ যে গিলেসপি ট্রাম্পেট কী, বলব! সত্তর বছরের বুড়ো, কিন্তু বাজায় কী! …বাহ ডুডল ইবহা ডিবহা ডিডল বু ডাহ ডী বাহ ডিব বু …রুনিদি আমেরিকান জ্যাজ আপনার ভালো লাগে? আমার লাগে …গিলেসপির বিবপ স্টাইলের জ্যাজ যদি শোনেন …বিপ বপ বাহ ডীডী ডীডী ডাহ বাহ ডিডল বু ডি বো…’
‘কুন্তী, তোমার নাচ আর গান এবার থামাও।’
‘আপনি একটু শুনে দেখুন, পল্টু যা একখানা জোগাড় করেছে না!’
‘এখন তুমি আমায় আবদুল করিম খাঁ সাহেবের ‘যমুনা কী তীর’ শোনাতে চাইলেও শুনব না। আমার মেজাজ খুব খারাপ, সারারাত ঘুমোতে পারিনি।’
‘কেন?’
‘সে অনেক কথা, পরে বলব। তুমি দিগম্বর বর্ধন লেনে গিয়ে কী দেখলে শুনলে বুঝলে কী ছবি তুললে, টেপ করলে, নোটস নিলে সব আমাকে জানাবে বলেছিলে, এবার সেটা জানাও। তার আগে চায়ের জলটা চড়িয়ে আসি।’
রোহিণী রান্নাঘরে গেল। কুন্তী রেকর্ডারে ক্যাসেট ঢুকিয়ে শুরু করার জন্য টেপটা ঠিক জায়গায় রাখা আছে কী না পরখ করতে লাগল খাবার টেবিলে বসে। রোহিণী ফিরে এসে বলল, ‘আমি বরং প্রথমে তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করি।’ সুজাতা গুপ্ত চারদিন আগে তাকে যা বলেছিলেন, সেইগুলোই সে মনে মনে ঝালিয়ে নিল।
‘ওখানে পরমেশ সেনগুপ্ত যে অংশে থাকে, সেটা ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে, তাই তো?’
‘কারেক্ট।’
‘তার পাশে শোভনেশের অংশটা একজন কিনেছে। নতুন মালিক সারিয়ে মেরামত করে এখন খালি অবস্থায় তালা দিয়ে রেখেছে?’
‘রাইট। আমি ছবি তুলে এনেছি।’
‘পরমেশের একতলায় পুরোনো চাকর বিশ্বনাথ আর তার বউ গীতা থাকে।’
‘ওয়েট রুনিদি, ওয়েট। আমি ওখানে গিয়ে প্রথমে গীতার সঙ্গে কথা বলি। প্রথমে বললাম, আমি জন্মেছি এই বাড়িতে। শোভনেশ সেনগুপ্তর ঠাকুর্দার ভাইয়ের নাতির মেয়ে আমি। বুঝলে না, আমি কেন কৌতূহলী, সেটা তো আগে ওকে বোঝাতে হবে! তা গীতা তো খাতির করে ওর ঘরের সামনে রকটায় একটা টুলে বসতে দিল। নিজেই বলতে শুরু করল, ‘আর দিদিমণি, এখন আর কী দেখতে এয়েছেন। এখন তো ভূতের বাড়ি। এক ভাই ওপরে মাথা খারাপ অবস্থায়, আর এক ভাই জেলে।’ আমি বললাম, ‘জেলে কেন, চুরি করেছিল? গীতা ফিসফিস করে বলল, চুরি নয় গো…।’
কুন্তী টেপ—রেকর্ডারের রিড টিপল। রেকর্ডারটা সে রোহিণীর দিকে এগিয়ে দিল।
‘চুরি নয় গো, খুন করেছিল।’
‘খুউন! বলো কী, কাকে?’
‘একটা মেয়েমানুষকে। বড়দা তো ছবি আঁকত। ওই মেয়েমানুষটা, বীণা নাম, আসত। কাপড়—চোপড় খুলে শুয়ে বসে থাকত আর বড়দা তার ছবি আঁকত।’
‘এ ম্যাগো, ওইভাবে কেউ পুরুষ মানুষের সামনে—।’
‘টাকা পেত সেজন্য। কী করবে, গরিব মানুষকে পেটের জন্য অনেক কিছুই করতে হয়। তবে খারাপ কিছু ছিল না ওদের মধ্যে।’
‘তুমি জানলে কী করে? দেখেছ কী?’
‘না, না আমি দেখব কেন। লুকিয়ে লুকিয়ে তো দেখত ছোড়দা, ওই যার নাম পরমেশ, ওপরে থাকে। একদিন আমি দেখে ফেলেছিলুম, ছোড়দা খড়খড়ি তুলে দেখছে।’
‘তুমি একদিনও দ্যাখোনি?’
টেপ রেকর্ডারে শব্দ নেই। রোহিণী মুখ টিপে হাসল।
‘একদিন একটুখানি দেখেছি। ওই খড়খড়ি তুলে। বড়দা খুব রাগী মানুষ ছিল তো। জানতে পারলে বাড়ি থেকে বার করে দেবে।’
‘কেমন দেখলে বীণাকে?’
‘ওহ দিদিমণি, সে কী শরীর, কী গড়ন। দুগগা ঠাকুরকে কাপড় পরাবার আগে দেখেছ কখনো? কী কোমর! কী বুক! কী পাছা! হাত পায়ের গড়নই বা কী!
‘হবে না কেন? বড়দার বউ, যাকে বিয়ে করে আনল, তারও তো অমন শরীর ছিল!’
‘কী নাম তার?’
‘নামটাম বাপু অত জানি না। তবে হ্যাঁ, ওরও একটা দেখার মতো শরীর ছিল। যেমন লম্বা তেমনি মানানসই বুক পেট পাছা—’
চট করে রেকর্ডার বন্ধ করে রোহিণী বলল, ‘হাসছ কেন?’
কুন্তী নিঃশব্দে হাসতে হাসতে কুঁজো হয়ে গেছিল। সোজা হয়ে বলল, ‘ওহ রুনিদি, হাসব না? পল্টু যা বলে, গীতাও তাই বলল, আমিও তাই বলি। আপনার ফিগার যে একবার দেখেছে…এত…মানে কী বলব, প্রোভোকেটিভ যে…’
‘হয়েছে হয়েছে, এবার হাসি থামাও, বড়োদের নিয়ে ঠাট্টা করতে হবে না।’ রোহিণী দস্তুরমতো রাগ দেখাল।
‘ঠাট্টা! আপনি আমার কী ক্ষতি যে করেছেন পল্টুর সোফিয়া লোরেন হয়ে—’
‘আচ্ছা আচ্ছা, বলেছি তো, এইসব ঝামেলা চুকে যাক, তারপর তোমাকে নিয়ে পড়ব। হপ্তায় এক কেজি করে ওজন বাড়িয়ে দেব।’
‘ছাই করবেন।’ ঠোঁট ফুলিয়ে কথাটা বলেই কুন্তী রেকর্ডারের রিড টিপল।
‘দিদিমণি কী বলব, দু—জনের মধ্যে কিন্তু একদমই মনের মিল ছিল না। কেমন যেন ছাড়াছাড়া ভাব। হয়তো বয়সের পার্থক্যের জন্য।’
‘তা বড়দার বিয়ের পর সেই বীণা আর আসত?’
‘না। একদমই না। প্রথম এল সেইদিনই, যেদিন ওই জানালা দিয়ে নীচে পড়ে মরল।’
