‘কী করে পেলেন?’
‘গঙ্গাপ্রসাদবাবু নকল ছবি বিক্রি করার জন্য সুভাষদার ব্যবসার পার্টনার হতে চান। কিন্তু সুভাষদা তাতে রাজি না হয়ে ওঁকে এজেন্ট করেছিলেন, একটা কমিশন দিতেন। মিসেস সেনগুপ্ত, আপনি কী জানেন, এই গঙ্গাপ্রসাদ লোকটির কাছে আপনার স্বামীর আঁকা কত লক্ষ টাকার ছবি জমা আছে? আসল ছবিগুলো কালেক্ট করার জন্য উনি এখন উঠে পড়ে লেগেছেন। ওগুলো জমিয়ে রাখছেন পরে বেশি দামে বিক্রি করবেন বলে। আর নকলগুলো এখন বিক্রি করছেন। লোক বুঝে বুঝে নকল ছবি বেচছেন। আপনি যে কীভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা জানেন না।’
‘না, জানি না, জানতে চাইও না। আমি শুধু একটা পরিচ্ছন্ন, সভ্য জীবন চাই।’
‘গঙ্গাপ্রসাদবাবু আর কী বললেন?’
‘বললেন ওই ছবিটা ওনার চাই। শোভনেশ ওকে বলেছে, সব নকল ছবি ধ্বংস করে ফেলতে হবে। তাই যেখানে যত আছে, উনি খোঁজ পেলেই টাকা দিয়ে কিনে নেবেন ঠিক করেছেন।’
‘বাজারে নকলের ছড়াছড়ি থাকলে আসল কিনতেও খদ্দেররা ভরসা পাবে না বলেই ওনার এই ব্যস্ততা। কিন্তু জেনে রাখুন, আমার কাছে আসলটাই রয়েছে।’
রোহিণী ফোনের মধ্যে কলিং বেল বাজার শব্দ পেল। মীনার সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছে।
‘এত রাতে কে আবার! এক মিনিট, কেউ নেই, আমাকেই দরজা খুলতে হবে, প্লিজ একটু ধরুন …আরও কিছু কথা আপনাকে বলব।’
রোহিণী রিসিভারটা শক্ত কোনো জায়গায় রেখে দেওয়ার শব্দ পেল। ফোনটা মীনার শোবার ঘরে। রোহিণী ফোন কানের কাছে ধরে পিছনে তাকাল। দত্ত পরিবার খাওয়ায় ব্যস্ত, কিন্তু কানগুলো নিশ্চয় তার কথাবার্তার দিকে। স্বাভাবিকই। খুন, মার্ডার ভয় ভয় করছে, বোম্বাইয়ে চলে যাব, কোর্ট, কনফেস, নতুন করে মামলা,—এইসব কানে গেলে, দাঁত দিয়ে খাবার চিবোনোর বদলে কান দিয়ে শব্দ গেলার কাজ বেড়ে যাবেই। বাটি ভরা ছানার ডালনা টেবিলে রাখা। কড়াইশুঁটির সবুজ দানাগুলোর দিকে তাকিয়ে রোহিণী ভাবল, মীনা বড্ড দেরি করছে।
হঠাৎ সে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে রিসিভারটা কানে চেপে ধরল। তার ঘাড়, বাহু শক্ত হয়ে উঠেছে! ক্ষীণভাবে হলেও স্পষ্টই কথাগুলো শোনা যাচ্ছে।
‘না, ঘরে ঢুকতে দেব না। বেরোও বলছি, নইলে চেঁচিয়ে লোক ডাকব।’
‘তা হলে জান খতম করে দেব। ওই তো ছবিটা, তুলে নে। চুপ করে থাক, নইলে—।’
‘না, না, আমি কিছুতেই—’ একটা ভারি কিছুতে ধাক্কার বা পড়ে যাবার মতো শব্দ রোহিণী পেল। মীনা বিপন্ন। ওর ঘরে একাধিক অবাঞ্ছিত লোক, তার ছবি নিতে এসেছে, মীনা বাধা দিচ্ছে। বোধহয় ওকে মারল।
‘ডাকাত, ডাকাত, বাঁচা—।’
কথাটা শেষ হবার আগেই থেমে গেল। রোহিণী থর থর কেঁপে উঠল। সর্বনাশ! ‘ওই তো ছবিটা’ বলল কেন? গঙ্গাদার লোক!
‘মুখটা বাঁধ। হাত আর পা দুটোও।’
ফোনের খুব কাছ থেকে লোকটা বলল। দ্রুত, তীক্ষ্ন, উত্তেজিত স্বর। উচ্চচারণ জড়ানো, অমার্জিত।
‘আর ছবি আছে? …সোনা দ্যাখ তো ভেতরের ঘরগুলো। …আরে গাধা, ফোটো নয় ফোটো নয়, হাতে আঁকা ছবি! এইরকম রং দিয়ে কাপড়ে আঁকা, দ্যাখ সব জায়গায়…বাথরুমটাও দেখবি।’
লোকগুলো জানে না, তাদের এই কীর্তিটা বহুদূর থেকে একজন জানতে পারছে। রিসিভারটা যে ক্রেডল থেকে নামিয়ে রাখা, চালু অবস্থায় রয়েছে এটা ওরা নজর করেনি। হুঁশিয়ার, পাকা গুন্ডা নয়। কিন্তু সে এই মুহূর্তে কী করতে পারে? রোহিণী অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল। কিচ্ছু না, কিচ্ছু না। শুধু শুনে যাওয়া ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই। দুঃখিত মীনা চ্যাটার্জি, আমি দুঃখিত হওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারছি না।
‘আর নেই? ভালো করে দেখেছিস? ছবিটা আমি নিচ্ছি, তুই ওকে উপুড় করে খাটে শুইয়ে দে। …আরে ফোনটা যে নামিয়ে রাখা দেখছি…হ্যাল্লো।’
রোহিণী কিছু না ভেবেই বলল, ‘সব শুনেছি। কার হয়ে কীজন্য কাজ করছ, তাও জানি।’
খটাস। সঙ্গে সঙ্গে রিসিভার রাখার শব্দ হল। রোহিণীর মনে হল, তার চুপ করে থাকাই উচিত ছিল। কথা বলে সে নিজের বিপদ ডেকে আনল না তো! গঙ্গাদাকে এটা ওরা সম্ভবত বলবে। যখন শুনবেন একটা মেয়ের গলায় বলল, ‘কার হয়ে কী জন্য কাজ করছ তাও জানি’, তখন প্রথমেই ওর মনে হবে, রোহিণী ছাড়া আর কেউ নয়। আর কোনো মেয়ে শোভনেশের ছবি সম্পর্কে গঙ্গাপ্রসাদের আগ্রহের কথা জানে না।
মীনাকে ওরা খুন করেনি। মনে হল, ধাক্কাটাই শুধু দিয়েছে। বড়ো ধরনের চোটও সম্ভবত পায়নি। তা হলেও একা একটা মেয়েকে পেয়ে এইভাবে হাত পা মুখ বেঁধে তার ঘর থেকে জিনিস চুরি করা—গঙ্গাদার এই কাজটা রোহিণীকে রাগিয়ে দিল এমনই যে, চোখ বন্ধ করে সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
মনে মনে সে নিজেকে বলল, কুল ডাউন রোহিণী, কুল ডাউন…ঠান্ডা হও। রেগে উঠছ কেন? মীনা চ্যাটার্জি তোমার কে? ওর ঘর থেকে যদি গুন্ডারা ছবি চুরিও করে, তাতে তোমার কী? মীনাও কম জাঁহাবাজ নয়। তাকে যদি গুন্ডারা দু—চারটে চড়চাপড় মারে, তাতেই বা তোমার কী? কয়েক ঘণ্টা আগেই তো তুমি ওর হাতের চড় খেয়েছ, মনে নেই?
কিন্তু একটা দুর্বল অসহায় মেয়ের ওপর এইভাবে গুন্ডা লেলিয়ে গঙ্গাদা যে—কাজটা করলেন, এটা ক্ষমার অযোগ্য নয় কী? রোহিণী নিজেকে ঠান্ডা করার বদলে আরও অশান্ত উত্তেজিত হয়ে উঠল। মীনা তার কেউ নয় ঠিকই, কিন্তু তার মতোই একটা মেয়ে তো। তার মতোই একা, তার মতোই বুদ্ধি আর গতর খাটিয়ে অন্নবস্ত্রের সংস্থান করে।
