‘কী বলল শুনে?’
‘রাজি আছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলল, যাব।’
রোহিণী মাথাটা ঝাঁকিয়ে বুদ্ধির উপর জমে ওঠা সন্দেহের ধুলো ঝাড়ার চেষ্টা করল। নতুন কী চাল আবার চালতে চলেছে?
‘ভালোই হবে গঙ্গাদা। অতবড়ো একজন আর্টিস্ট তাকে আবার কাজের মধ্যে ফিরিয়ে আনা তো মহৎ ব্যাপার। এই সেদিন ওর একটা ছবি দেখে আমি তো থ’ হয়ে গেলাম। আগে আমি কখনো এটা দেখিনি। কী ড্রয়িং, কী কালার, কী রিয়্যাল যে মনে হচ্ছিল!’
‘কোথায় দেখলে?’
‘মীনা চ্যাটার্জির ভিতরের ঘরে। যেদিন ওকে ইন্টারভিউ করতে গেলাম, ও দেখাল একটা ন্যুড। মীনা বলল, ওটা বীণা।’
‘তুমি ঠিক বলছ?’ গম্ভীর থমথমে গঙ্গাপ্রসাদের স্বর। ‘নট ফেক, বাট রিয়্যাল।’
‘আসল কী নকল অত বুঝি না, তবে দারুণ লাগল। আপনি গিয়ে দেখে আসতে পারেন। মীনা বলল, ছবিটার নাম উওম্যান ইন সলিচ্যুড। এটা নাকি শোভনেশের সেরা কাজগুলোর একটা। অন্তত লাখ দুই টাকা এখন তো বটেই। গঙ্গাদা, এমন ছবি যে আঁকতে পারে, তাকে নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয়। ওকে আপনি বাসুদেবপুরেই ধরে রাখুন। না না, আমার সঙ্গে দেখাটেখা না হওয়াই ভালো। আমি কোনোদিনই ওর জীবনে আর ছায়া ফেলব না।’
‘তুমি কি একটাই ছবি দেখেছ, নাকি আরও আছে? আমার সন্দেহ হচ্ছে, আরও আছে আর আমি অলরেডি খোঁজ নেবার জন্য লোক পাঠিয়েও দিয়েছি, হয়তো পৌঁছেও গেছে।’
রোহিণীর মনে হল, এতক্ষণ যেসব কথা সে বলল, তার কিছুই গঙ্গাদার কানে ঢোকেনি। গঙ্গাদা এবার মুখোমুখি হবে মীনার। লক্ষ লক্ষ টাকার বেওয়ারিশ ছবির দখল নেবার লড়াইটা এবার ভালো করেই শুরু হয়ে যাক। মীনার আকুলতা ছবির থেকেও বেশি শোভনেশের জন্য। আর গঙ্গাদা নিশ্চয় সেটা বুঝতে পেরে, ‘শোভনেশকে তোমার কাছে এনে দেব’ এই টোপটা দিয়ে ওকে খেলাচ্ছে, যদি কিছু ছবি, মীনার কাছে থেকে থাকে সেগুলো হাতাবার জন্য।
”আরও ছবি আছে কিনা জানি না, আমি তো একটাই দেখেছি। গঙ্গাদা, হ্যালো, …আমার ওপরে থাকেন সেই সুজাতা গুপ্ত, তিনি একটা অদ্ভুত কথা কাল বললেন। আহ লাইনটা বড়ো ডিস্টার্ব করছে, হ্যালো, …উনি বললেন, শোভনেশ নাকি বীণাকে খুন করেনি। তার সাক্ষী নাকি একজন এখনও আছে দিগম্বর বর্ধন লেনের বাড়িতে। কী কাণ্ড দেখুনতো!’
‘কে সাক্ষী?’
‘সেটা উনি বলতে চাইলেন না।’ রোহিণী মনে মনে বলল, গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি, এইবার তোমাকে আমি খেলাব। কে সেই সাক্ষী জানার জন্য এইবার তুমি হন্যে হয়ে ওঠো।
‘কীভাবে উনি জানলেন? শোভনেশ নিজে কোর্টে কনফেস করেছে, সে নিজের হাতে খুন করেছে। আর এখন—’
‘আরে আমিও তো তাই বললাম। কিন্তু উনি রি—ট্রায়ালের জন্য এখন উকিলের কাছে যাবেন ঠিক করেছেন। নতুন করে কেসটা আবার ওপেন করালে, ভাবতে পারেন, আবার অনেককে কোর্টে দাঁড়াতে হবে। আমাকেও। উহফ, আমার আর এসব ভালো লাগছে না গঙ্গাদা। আবার কাগজে কাগজে কেচ্ছা বেরোবে ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। কী করে এটা বন্ধ করা যায় বলুন তো? পুলিশ তো তখন শোভনেশকে ধরার জন্য উঠে পড়ে লাগবে।’ রোহিণী উদবেগে উৎকণ্ঠায় ভেঙে পড়তে পড়তে ভাবল, মীনা চ্যাটার্জি কী আমার মতো অভিনয় করতে পারবে? ফুঃ।
‘রোহিণী, কালই তুমি আমার সঙ্গে অফিসে দেখা করো। সত্যিই এটা বিশ্রী ব্যাপার হবে যদি কেসটা আবার তোলা হয়। যেভাবেই হোক বন্ধ করা দরকার।’
গঙ্গাপ্রসাদের স্বরে কিছুটা যেন ভয়ের আভাস পেল রোহিণী। সে ঠিক করে ফেলল, সুজাতা গুপ্তকে উকিলের বাড়িতে পাঠাতেই হবে। শান্ত গলায় সে গঙ্গাপ্রসাদকে বলল, ‘হ্যাঁ, বন্ধ তো করতেই হবে।’
ফোন রেখে দিয়ে রোহিণী কঠিন চোখে রিসিভারটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। চোয়াল শক্ত। কী যেন ভাবছে। রিসিভার তুলে আবার সে ডায়াল করতে শুরু করল।
‘হ্যালো, মিস চ্যাটার্জি?’
‘স্পিকিং।’
‘এইমাত্র গঙ্গাপ্রসাদবাবু ফোন করেছিলেন। উনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আপনার ঘরে শোভনেশের আঁকা যে ছবিটা রয়েছে, হ্যাঁ হ্যাঁ বেডরুমে যেটা রেখেছেন…।’
‘উনি জানলেন কী করে, আমার বেডরুমে ছবি রয়েছে?’ উত্তেজিত স্বর মীনার এবং বিব্রতও।
‘আমি তো আপনার সাক্ষাৎকারে ওটা মেনশ্যন করেছি। ওটা তো একটা প্লাস পয়েন্ট আপনার শিল্পবোধ, শিল্প চেতনা মানে আর্ট লাভার হিসেবে আপনি—’
‘চুলোয় যাক আর্ট লাভার। আপনি এসব লিখতে গেলেন কেন?’
‘আপনাকে উজ্জ্বল করতে আর আমার লেখাটাকে একটা পারসপেকটিভ থেকে—’ রোহিণী যেন দেখতে পেল মীনার শ্বদন্ত বেরিয়ে এল, হয়তো রিসিভারটাকেই কামড়ে ধরবে।’
‘ছবির কথা লিখেছি বলে কি আপনি বিরক্ত হলেন?’ কাঁচুমাচু স্বরে রোহিণী বলল, ‘আমি কালকেই প্রুফ আনিয়ে ওই অংশটা বাদ দিয়ে দেব।’
‘আর বাদ দেওয়া! যা ক্ষতি হবার তা তো হয়েই গেছে। গঙ্গাপ্রসাদবাবু আপনার কাছে কী জানতে চাইলেন?’
‘বললেন,’ রোহিণী ঢোঁক গিলল। তাই তো, কী বলা যায়! ‘বললেন, ছবিটা তো নকল। ওটাকে অত যত্ন করে রাখার কারণ কী?’
‘কে বলল ওটা নকল?’ মীনার স্বর তীব্র। ‘সুভাষদা আমায় দিয়েছিলেন।’
‘আপনি যে আমায় বললেন, কোন এক প্রোডিউসার ছবিটা আপনাকে উপহার দিয়েছেন?’
‘ভুল করে বলেছি। ছবিটা আসলই, এর নকলটা গঙ্গাপ্রসাদবাবু পেয়েছেন, বোধ হয় সুভাষদার কাছ থেকেই পেয়েছেন। আর পেয়ে সেটা কাকে যেন বিক্রিও করে দিয়েছেন।’
