‘হ্যাঁ বলেছি। মনে হল, ও যেন সেটাই চায়।’
‘ভালো, খুব ভালো। এটাই আমি শুনতে চেয়েছি। ধন্যবাদ, আমাকে এটা জানানোর জন্য।’
‘গঙ্গাবাবু, আমি কিন্তু শোভনকাকার জন্য অপেক্ষা করছি। আপনি বলেছিলেন…’
‘আঃ, আবার সেই এক কথা।’ প্রবল বিরক্তি আর ধমক মিশিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ বলে উঠলেন, ‘তুমিও কেন বিয়ে—থা করে ঘরসংসার সাজিয়ে বসলে না? টাকাওয়ালা লোক ধরে বেড়াব আবার শোভনকাকার জন্যও হেদিয়ে মরবে। এসব না করে…।’
‘গঙ্গাবাবু!’
রোহিণীর কান থেকে ফোনটা ইঞ্চি চারেক ছিটকে গেল। মেয়েদের মধ্যে গলা থেকে এমন শব্দ সিংহী বা বাঘিনিরাই বার করতে পারে।
‘আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কোনোরকম কমেন্টস আমি বরদাস্ত করব না। মনে রাখবেন, মীনা চ্যাটার্জিরও এই শহরে কিছু খারাপ লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে।’
সাব্বাস। রোহিণী তারিফ জানাল। এমন গলার স্বর অভিনয়ের সময় যদি মীনা বার করতে পারে, তাহলে বড়ো অভিনেত্রী অবশ্যই হতে পারবে।
‘আই অ্যাম সরি।’ বিনীত স্বর এবং ফোন রেখে দেবার শব্দ হল।
রোহিণীও রিসিভার রেখে দিয়ে মনে মনে ধন্যবাদ জানাল কলকাতার টেলিফোনকে। ভাগ্যিস ওরা যন্ত্রপাতিতে বাসা বাঁধা ভূতকে খোঁচাখুঁচি করে চটায় না!
নন্দ আর বুবুল খেতে বসেছে। আরতি পরিবেশনে ব্যস্ত। অতক্ষণ ধরে ফোন কানে লাগিয়ে আন্টি চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল কেন, সেটা জানার জন্য ভাইবোনকে খুবই কৌতূহলী মনে হচ্ছে। রোহিণী একটা চেয়ার টেনে টেবিলে বসল।
আরতি একটা প্লেট হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘একটু কিছু মুখে দেবেন নাকি?’
‘আরে না না।’ রোহিণী আঁতকে ওঠার ভান করল। ‘ইয়া বড়ো বড়ো দু—খানা জয়নগরের মোয়া, বুঝলে নন্দা, নারকেলের মতো সাইজ আর চারখানা পার্শে মাছ ভাজা খেয়ে এখন আমার পেটে আর একদানা ভাত রাখারও…ওটা কী রেঁধেছেন বলুন তো?’ রোহিণী টেবিলের প্রান্তে একটা বড়ো বাটির দিকে গলা উঁচিয়ে তাকাল।
‘কাকা আর কাকিমা এসেছিলেন। ছানার ডালনা খেতে কাকা খুব ভালোবাসেন, তাই করেছি।’
‘অ।’ রোহিণী দ্রুত ভেবে যাচ্ছে, মোয়া, পার্শে মাছের পর ছানাটা খাওয়া ঠিক হবে? ছেড়ে দেওয়াই ভালো। বড্ড ফ্যাট আজ শরীরে ঢুকেছে। কিন্তু ছানার ডালনা! গাওয়া ঘি আর গরম মশলার গন্ধটা যে জিভের অবস্থা এমন করে দেবে, কে জানত। সন্দেহ নেই, দারুণ রেঁধেছে। ভীমের মতো লোকের বউ, রন্ধনে দ্রৌপদী তো হবেই হবে। বহুদিন জিভে এমন জিনিস ঠেকাইনি। কিন্তু মুটিয়ে যাওয়া, আনফিট হওয়া, এসব ভয়ই কী এখন করা ঠিক হবে? নিজেকে সে বলল, রোহিণী অকুতোভয় হও। তোমার নাকি মার্ডার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে? তাহলে জলে ভরে যাওয়া জিভ নিয়ে অন্তত মরো না।
‘দিন একটু চেপে দেখি। তবে খুব বেশি নয়, শুধু ওই বাটিটায়, যঅৎ সামান্য—’
ফোন বেজে উঠতেই, কথা শেষ না করে রোহিণী লাফিয়ে ছুটে গেল।
‘হ্যালো, কে গঙ্গাদা নাকি?’
‘হ্যাঁ। তোমাকে আগে ফোন করেছিলাম।’
‘আমিও ভাবছিলাম, তাই তো, কে আবার ফোন করছে! মীনা চ্যাটার্জির কাছে সন্ধ্যাবেলায় গেছিলাম। ভাবলাম, সেই আবার ফোন করল নাকি!’
‘ওহ মীনার কাছে গেছলে বুঝি? স্যাড, খুবই স্যাড ব্যাপারটা। সুভাষ গায়েন ওর ফ্রেন্ড, ফিলজফার অ্যান্ড গাইড বলতে যা বোঝায় তাই ছিল। খুব বুদ্ধিমান লোক। তুমি তো ওকে মিট করেছ।’
‘হ্যাঁ, বুদ্ধিমান ছিলেন।’
‘মীনা কী বলল তোমায়?’
‘কী আর বলবে, খুবই শোকাহত মনে হল।’ রোহিণী দু—সেকেন্ড থেমে, ভেবে, আবার বলল, ‘মনে হল মাথার ঠিক নেই, আবোল—তাবোল বকছে। কী বলল জানেন, আপনি নাকি ওকে মৃতুভয় দেখিয়ে দুটো চিঠি, মানে অনামা চিঠি দিয়েছেন। মনে হচ্ছে, মাথাটা ওর গেছে। বলল, সুভাষ গায়েনকে কে ঠেলে ফেলে দিয়েছে, সেটা নাকি আপনি জানেন। আচ্ছা বলুন তো, ওকে এবার রাঁচিতে না পাঠিয়ে আর উপায় আছে?’
রোহিণী থামল ওধার থেকে প্রতিক্রিয়া আসার জন্য। আলতো করে দুটো বোমা সে ঠেলে দিয়েছে। ফাটবে কীভাবে, সেটাই টেলিফোনে দেখতে চায় সে।
খিলখিল হাসি ভেসে এল। রোহিণীর মনে হল, বোমার ফিউজ পোড়ার মতো শব্দটা।
”বলো কী! মৃত্যুভয় দেখানো চিঠি, তারপর ঠেলে ফেলে দিয়েছে যে, তাকেও আমি জানি?’
‘আমাকে আবার বলল, এসব কথা যেন কাউকে না বলি, তাহলে আমাকেও নাকি ভয় দেখানো চিঠি দেবে। তা, আমি তো এখনও কোনো চিঠি পেলাম না। দু—তিনটে ফ্ল্যাটে খোঁজ নিলাম, কেউ বলতে পারল না আমার দরজায় কোনো চিঠি আঁটা দেখেছে কিনা। যাক গে এসব বাজে কথা, বলুন কেন ফোন করছেন।’
ওধারে চুপ। মনে হচ্ছে দ্রুত ভাবনাচিন্তা চলছে। গোলমালে পড়ারই কথা। নিশ্চয় ভাবছে, চিঠি সেঁটে যাবার কাজটা যাকে দিয়েছে, সে নিশ্চয়ই ফাঁকি মেরেছে।
‘হ্যালো, গঙ্গাদা?’
‘হ্যাঁ, শোভু ফোন করেছিল।’
আবার চুপ। রোহিণী বুঝল, এবার তার প্রতিক্রিয়া গঙ্গাদা শুনতে চায়।
‘প্লিজ গঙ্গাদা, আমার কিন্তু এখন যেন কেমন ভয় ভয় করছে। আমি ঠিক করেছি, বোম্বাইয়ে দিদির কাছে চলে যাব।’
‘আরে না না, ভয়ের কিছু নেই। চলে যাবে কেন? চাকরি ছেড়ে দিয়েছ তো কী হয়েছে। তোমার মতো মেয়ের জন্য অনেক চাকরি আছে, ইচ্ছে করলেই পাবে। শোভু বলল, একটা ছোটো জেলখানা থেকে এখন সে একটা বড়ো জেলখানায় এসে পড়েছে। এভাবে পলাতক, ফেরার জীবন অসহ্য লাগছে। সে ঠিক করেছে আবার বহরমপুরেই ফিরে যাবে, মানে জেলে যাবে। আমি বললাম, তা কেন করবি। তুই দূরে কোথাও চলে যা। টাকা আমি দোব। তোকে ধরার জন্য পুলিশের কোনো মাথাব্যথা নেই। তুই নকশাল নোস, স্মাগলার নোস, ফরেন এক্সচেঞ্জ রুলস ভেঙে বিদেশে টাকা জমাসনি। হঠাৎ একটা খুন করে ফেলেছিস, তাও একটা তুচ্ছ মেয়েমানুষকে। দেশের বা সমাজের তোকে নিয়ে ভয় পাওয়ার বা ক্ষতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তুই দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়া। আমি বললাম, আমার বাসুদেবপুরের বাড়িতে গিয়ে থাক, ছবি আঁক। ওখানেই জীবনটা কাটিয়ে দে।’
