‘এখান থেকে একটু আগে ফোন করেছিল। বলল, আপনি ফিরেই যেন এই নম্বরে ফোন করেন।’
নম্বরটা গঙ্গাদার বাড়ির ফোনের। রোহিণী ব্যস্ত হল না। চাবিটা হাতে নিয়ে সে মন্থর পায়ে উঠে এল।
গঙ্গাপ্রসাদের বাড়ির ফোন নম্বর ডায়াল করে দু—তিন সেকেন্ড পরই রোহিণীর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ‘হ্যালো’ বলে ফেলেছিল প্রায়! শব্দটা জিভের ডগা থেকে ফিরিয়ে এনে সে রিসিভারটা কানে চেপে ধরল। শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও যেন শুনতে না পায়, এই ভেবে সে নিশ্বাসও বন্ধ করে রইল।
‘রোহিণী এসেছিল আমার কাছে।’
‘অ। তা কীজন্য? কী বলল?’
‘সুভাষদার জন্য শোক সমবেদনা জানাতে। ওর সন্দেহ : আমিই ছাদ থেকে সুভাষদাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছি।’
রোহিণী বন্ধ করে রাখা শ্বাস ফেলতে গিয়ে থমকে গেল। মীনা রিপোর্ট করছে গঙ্গাদাকে।
‘ভালো, এই ধারণাটাই করুক।’
তার মানে? রোহিণী বিভ্রান্ত হল। এই ধারণাটা করুক মানে কী? তাহলে মীনা নয়, অন্য কেউ ঠেলেছিল!
‘আপনাকে ও দেখেছে আমার কাছে আসতে।’
‘সে কী? কখন, কীভাবে দেখল?’
‘হয়তো আপনাকে এই বাড়িতে ঢুকতে বা বেরোতে দেখেছে। আপনি চলে যাবার পরপরই ও এল। ওর ধারণা, শোভনকাকা এখানে লুকিয়ে আছে কি না জানতেই আপনি এসেছিলেন।’
‘ভালো, এই ধারণাটাই যেন ওর থাকে। আর কিছু?’
আবার ওই ধারণা! রোহিণীর মনে হল, এদের দু—জনের মধ্যে যেন কোনো একটা চুক্তি হয়েছে কোনো এক ব্যাপারে। তার মনে ভুল ধারণা থাকুক এটা ওরা চায়।
‘ওকে চিঠি দুটো দেখালাম।’
‘কী বলল দেখে?’
‘ওর বিশ্বাস: চিঠি দুটো আমিই কাউকে দিয়ে… আমার কাজের মেয়েটাকেই সন্দেহ করছে, তাকে দিয়েই লিখিয়েছি ধরে নিয়েছে।’
‘আরও ভালো।’
রোহিণী বুঝল, চিঠিটা তাহলে অন্য কারোকে দিয়ে লেখানো। অবশ্য তাতে কিছু আসে যায় না। শুধু একটা জিনিস জানা গেল, মীনাকে জানিয়েই চিঠিটা তাকে দেওয়া হয়েছে। ওটা একেবারেই ভেজিটেবল মার্কা হুমকি!
‘আমি বলেছি, চিঠি দুটো আপনাকে দেখিয়েছি। দেখে আপনি বললেন, শোভনেশের কাজ।’
‘হুম।’
‘কিন্তু রোহিণী তা বিশ্বাস করেনি।’
‘করেনি?’ কিছুক্ষণ চিন্তাগর্ভ নীরবতা। ‘কেন? অবিশ্বাসের কারণ?’
‘শোভনকাকার পক্ষে এভাবে চিঠি লিখে দরজায় আটকে দিয়ে যাওয়াটা, ওর মতে অসম্ভব। এটা আমার নিজেরই কাজ বলে সন্দেহ করেছে।’
‘এখন আর তা করছে না। বাড়ি ফিরেই রোহিণী ইতিমধ্যে এইরকম একটা চিঠি পেয়ে গেছে।’
যাক, ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। কাজটা তাহলে গঙ্গাদারই। রোহিণী মুখটা রিসিভার থেকে পাশে ঘুরিয়ে নিশ্বাস ছাড়ল। আমাকে ভয় পাওয়াতে চেয়ে এত কাণ্ড!
‘গঙ্গাবাবু, চারদিন ধরে আমি অপেক্ষা করছি। আপনি বললেন, সুভাষদা যেখানে আছে শোভনকাকা সেখানে আসবেন না। কিন্তু সুভাষদা তো আর…।’
‘আহহা এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন। শোভু আর তো ফোন করেনি, করলেই তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব। তোমার কাছে ওর আঁকা কতগুলো ছবি রয়েছে, সেটা কিন্তু আজও আমায় তুমি বললে না।’
‘বিশ্বাস করুন, একখানা ছবিও আমার কাছে নেই।’
মিথ্যে কথা। রোহিণী ভাবল, একখানা তো আমি নিজেই দেখেছি। যার নকলটা কিনেছে ঘোষালরা। মীনা দিব্যি মিথ্যে বলে দিল!
‘সুভাষের কাছে কিছু ছিল। তা ছাড়া তোমার নিজের কালেকশানেও নাকি একটা দুটো আছে বলে শুনেছি।’
‘আপনাকে তো তখন বললামই, সুভাষদার কাছে একখানাও জাল বা আসল থাকলে আমি ঠিক জানতে পারতাম। আমার কাছে কোনো ছবি আছে কী নেই, এটা কী করে যে আপনাকে বোঝাব—আপনার কথামতো তো আমি সব কাজই করেছি,…নরকেও আমার স্থান হবে না, শুধু একটা আশা নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে হাত মিলিয়েছি, কো—অপারেট করছি অথচ…।’
‘এইবার চুপ করো তো। শোভুর ‘উওম্যান ইন সলিচ্যুড’ নামের বিখ্যাত ছবিটা তোমার কাছে আছে, এই খোঁজ আমি পেয়েছি। ওটা আমার চাই।’
‘আমি তো আপনাকে বার বার বলেছি…’
‘আচ্ছা আচ্ছা, আমি খুঁজে নেব ছবিটা কোথায় আছে। এবার বলো, রোহিণী আর কী বলল?’
‘বলল, শোভনকাকা ওকে টেলিফোন করতে পারে।’
‘আর তাই শুনে তুমিও বললে, যেন সে তোমার শোভনকাকাকে তোমার কাছে আসতে বলে দেয়, কি ঠিক বলেছি?’
‘না না আমি এরকম কথা ওকে বলতে যাব কেন? বরং রোহিণীই বলল, আপনার কথা থেকে তার নাকি ধারণা হয়েছে, শোভনকাকা খুন করতে পারেন।’
আবার মিথ্যে কথা। রোহিণীর বলতে ইচ্ছে করছে, ওহে মীনা, তুমিই তো বাপু বললে, তোমার শোভনকাকা আমার গায়ে আঁচড়টিও দেবে না।
‘রোহিণীকে?’
‘হ্যাঁ।’ একটু ইতস্তত করে, ‘ওর মনে হচ্ছে শোভনকাকা নয়, অন্য কেউ একজন তাকে মার্ডার করতে পারে।’
বহুত আচ্ছা মীনা চ্যাটার্জি। রোহিণী মনে মনে বলল, চালিয়ে যাও। তোমার কথাগুলো আমার বলে চালাচ্ছ! আর আমিও যদি সুযোগ কখনো পাই তাহলে আমার কথাও তোমার বলে চালাব।
‘কে সেই অন্য কেউ? রোহিণী নাম বলল?’
‘না। আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানতে চেয়েও ওর পেট থেকে নামটা বার করতে পারিনি। আর একটা কথাও রোহিণী বলল,… শোভনকাকাই সম্ভবত মার্ডারড হতে পারেন।’
সর্বনাশ! এটাও নাকি আমি বলেছি? রোহিণী বলল, টুক করে এবার সে তার গলাটা ঢুকিয়ে বলবে নাকি—গঙ্গাদা, এটা ও বলেছে, আমি নয়।
‘ননসেন্স! রোহিণী এসব কী রটাচ্ছে? শোভনেশ তো অলরেডি মরা মানুষই। ওকে কে মারতে যাবে? কেনই বা মারতে যাবে? শুধু পুলিশের হাতে তুলে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। তুমি কি ওকে বলেছ, বিয়ে—টিয়ে করে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে, এইসব ব্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে?’
