‘যাচ্ছিলাম মিস্ট্রি সলভ করতে দিগম্বর বর্ধন লেনে।’
‘অ্যাঁ!’ রোহিণী বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
‘যা একখানা জিনিস আমায় গছিয়েছেন। ওসব কী বাড়িতে বসে ভেবে ভেবে সলভ করা সম্ভব? আপনার কাছে যতটুকু শুনেছি আর লেখাটা থেকে যতটুকু পেয়েছি, তাতে মনে হল ব্যাপারটা শুধুই মাথার নয়, গতরেরও। তাই চলে গেলাম বাড়িটা দেখতে।’
‘বলো কী! তুমি ওই বাড়িতে গ্যাছো?’
‘আস্তে, আস্তে।’ ভিতরের ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে কুন্তী বলল, ‘এখন টিভি দেখছেন। ওহ আপনার কী প্রশংসা আজ। ঠাকুর—দেবতায় ভক্তি তো দেশ থেকে উঠেই গেছে। তবু দু—একজনের মধ্যে এখনও আছে, তার মধ্যে আপনি একজন। প্রথমে আপনাকে দেখে যা ভেবেছিলেন, এখন দেখছেন মোটেই তা নন। বিশ্বনাথের প্রসাদী ফুল নিতে ছুটেছে, কত লক্ষ্মী মেয়ে! ব্যাপার কী রুনিদি? জপালেন কীসে?’
‘জপতপ পরে হবে, আগে বলো সেখানে কী হল? কী দেখলে?’
‘দেখলুম, শুনলুম, বুঝলুমও। আমি ছবি তুলেছি, টেপও করেছি। কিছু কিছু নোটস করে রেখেছি। সাজিয়ে লিখে আপনাকে দোব। ছাপিয়ে দেবেন তো?’
‘আগে দেখি তো লেখাটা, তারপর ছাপানোর কথা ভাবা যাবে। সেখানে কী শুনলে, দেখলে?’
‘এখন এখানে দাঁড়িয়ে অতসব তো বলা যাবে না। আপনাকে কাল গিয়ে বলব। তা ছাড়া আরও দু—একদিন যেতে হবে। আচ্ছা, গঙ্গাপ্রসাদ আর তার বউ তো মোমিনপুরে থাকে, তাই না? বাসুদেবপুর বলে একটা গ্রামে ওদের তো একটা বাড়িও আছে? সেখানে কখনো গেছেন?’
‘না।’
‘শোভনেশ সেনগুপ্ত ওখানে কিছুদিন ছিলেন, তাই না?’
‘হ্যাঁ, বিয়ের আগে।’
‘ওঁর ভাই পরমেশ থাকে বউবাজারের বাড়িতে। তাকে শেষ কবে দেখেছেন?’
‘বছর ছয়েক আগে।’
‘তারপর আর ওখানকার কোনো খবরটবর রাখেন না।’
‘একদমই নয়।’
‘দিন তিনেক আগে একজন সুন্দরী প্রৌঢ়া সন্ধেবেলা ঘোমটায় মুখ ঢেকে এসেছিল মোটরে, পরমেশের সঙ্গে কথা বলে গেছে। কে এসেছিল সেটা জানতে হবে।’
‘শুনেছি, পরমেশ নাকি এখন পাগল হবার মতো অবস্থায়। চোখে ভালো দেখতে পায় না, কঙ্কালের মতো চেহারা, মাথায় চুল নেই, গায়ে চুলকুনি।’
‘এই তো দেখছি খবর রাখেন।’
‘এটা কি রাখার মতো একটা খবর নাকি! কানে এল, তাই মনে আছে।’
‘কে আপনার কানে খবরটা দিল, জানতে পারি কী তার নাম?’
‘বললে কী চিনতে পারবে? তার নাম সুজাতা গুপ্ত।’
কুন্তী ঠোঁট কামড়ে সেকেন্ড পাঁচেক ভেবে বলল, ‘নাহ, চিনি না।’
খুব মেলামেশা না থাকলে এইরকম ফ্ল্যাট বাড়িতে প্রৌঢ়া বা বৃদ্ধাদের নাম জানা সম্ভব নয়। মাসিমা কাকিমা হয়েই তারা রয়ে যান। রোহিণী নিজেও কী আগে জানত, ওনার নাম সুজাতা!
‘এর কথা তোমায় আগে বলিনি। তবে বলব। একটা সায়কোলজিক্যাল কেস, তেমনি মীনা চ্যাটার্জিও। ইনি ফিল্ম অ্যাকট্রেস। দুজনেই শোভনেশকে চেনে জানে। ওর জীবনের প্রথম ন্যুড মডেল সুজাতা। আর মীনা হল বীণার বোন।’
‘এদের কথা আগে আমায় বলেননি!’ কুন্তী আক্ষেপ করল। তাহলে দেখা করে কথা বলতাম। ওহহ ফিল্ম অ্যাকট্রেসের সঙ্গে আমার কথা বলার ইচ্ছে যে কতদিনের!
‘তুমি এই ক—দিন ধরে মিস্ট্রি সলভ করতে আদাজল খেয়ে সিরিয়াসলি নেমে পড়েছ, ভাবতেই পারছি না!’
‘আমাকে কী ভেবেছেন আপনি! অপদার্থ, অকর্মা, আদুরে, ছেলেমানুষ, বোকা…।’
‘থাক থাক তালিকাটা আর লম্বা কোরো না। তোমাকে আমি ওই কথাগুলোর ঠিক উলটোটাই ভাবি, তার সঙ্গে আরও একটা—পাগলি। রহস্য উদঘাটন যদি করতে পারো, প্রমিস করছি, তাহলে আমি তোমার দশ কেজি ওজন বাড়াবার ব্যবস্থা করবই। এখন চলি, কাল তাহলে আসছ, আমি সারাদিনই থাকব।’
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রোহিণী ভাবল, কে আবার ফোন করল? গঙ্গাদা ছাড়া আর আছে রাজেন। জয়পুরে আজ খেলার শেষ দিন। সেখান থেকে ফোন করতে পারে, না—ও পারে।
নিজের ফ্ল্যাটের দরজার দিকে তাকিয়েই সে থমকে গেল। পাল্লার নীচের দিকে একটা সাদা কাগজ সেলোটেপ দিয়ে আটকানো।
কাগজ নয়, চারভাঁজ করা একটা চিঠি। টেপের আঠা থেকে চিঠিটা ছাড়িয়ে নিয়ে সে ভাঁজ খুলল। কোনো সম্বোধন নেই। শুধু লেখা: ‘এক নম্বর সুভাষ গায়েন, দু নম্বরে তুমি, তিন নম্বরে মীনা চ্যাটার্জি। তোমরা আবর্জনা। সব সাফ করব। আমি আসছি।’
ভ্রূ কুঁচকে রোহিণী চিঠিটা আবার ভাঁজ করে চাবি দিয়ে দরজা খুলল। আলো জ্বেলে ঘরের চারধারে চট করে চোখ বোলাল। একটু যে গা ছমছম করছে না, এটা সে অস্বীকার করবে না। যেকোনো সময় এমন একটা হুমকি পেলে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠবেই। অবশ্য প্রথম ধাক্কাটা মীনার ওখানেই লেগেছিল। তবে মীনার মতো কাগজটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলার ইচ্ছা তার হল না। হাতের লেখা দেখেই তো সে বুঝে গেছে, একই হাতে তাকে আর মীনাকে লেখা।
ঝোলার মধ্যে কাগজটা রেখে সে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল পা ঝুলিয়ে। এখন মাথার মধ্যেটা একদম সাদা। অন্ধকার সিনেমা হলে ছবি শুরু হবার জন্য প্রতীক্ষারত উন্মুখ দর্শকদের মতো তার অবস্থা। কে একজন ফোন করেছে, কে একজন চিঠি দিয়েছে—কিছুই তার করার নেই। শুধু অপেক্ষায় থাকতে হবে। প্রোজেক্টর থেকে মাথার উপর দিয়ে তীব্র আলোক রশ্মি গিয়ে সাদা পর্দায় না ফেলা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে জাগবে না।
বেল বাজল। রোহিণীর মনে হল, এইবার বোধ হয় শো শুরু হতে যাচ্ছে। দরজা খুলতেই বুবুল। হাতে একটা ফোন নম্বর লেখা চিরকুট।
